সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন মানুয়ারা ও চাম্পাদের হাসিমুখ

::রাজশাহী থেকে জাহিদ আলী, এনামুল হক এবং রবিউল হক::

 

চাম্পার হাসিমুখ
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের বড়শিপাড়া গ্রাম। আশপাশের গ্রামগুলোর মতোই রুক্ষ উঁচু বরেন্দ্রভূমি। ঢেউখেলানো জমিনে ফলে ধান, টমেটো ও মৌসুমি সবজি। গ্রামের কৃষিজীবী পরিবারে সবাই কাজ করেন দিনরাত। কিন্তু সব পরিবারে নেই স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন। মাঠে-ঘাটে, ঝোপে জংগলে আর খোলা কিছু পায়খানাতেই সারতে হয় প্রাকৃতিক কর্ম। ভোগান্তিটা বেশি পোহাতে হয় গ্রামের মেয়েদের। খুব ভোরে বিছানা ছাড়তে হয়। লোকজন সব ওঠে যাওয়ার আগেই সারতে হয় প্রাকৃতিক কর্ম। মাঝেমধ্যে আশেপাশের বাড়িতে যাদের ল্যাট্রিন আছে যেতে হয়। তাও নানা সামাজিক লজ্জার বিষয়। গ্রামের এক গরিব ভূমিহীন পরিবারের মেয়ে চাম্পা। মা উম্মে কুলসুম বিবি গৃহকর্মী এবং বাবা মো. জহিরুল ইসলাম দিনমজুর। টানাটানির সংসারে একটা স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ছিল না তাদের। বস্তা ঘেরাও দেয়া মাটির গর্তে পায়খানা করতে হতো। নিজেরাই মাটি গর্ত করে বাঁশ দিয়ে এ ধরণের খোলা পায়খানা তৈরি করেছে তারা। এ দুর্দশা ভোগ করেছে চাম্পার বিবাহিত পাঁচ বোন। ছোট ভাই ও চাম্পা এর ভেতরেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। চাম্পা এখন পড়ছে দশম শ্রেণিতে। কিন্তু চাম্পাদের স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনের সমস্যাটি এখন আর নেই। গর্ত পায়খানার জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন ল্যাট্রিন। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং হীনমন্যতাটিও কেটেছে। চাম্পা নিজেই তার স্কুল ও প্রতিবেশীদের সাথে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার বিষয় নিয়ে আলাপ করে।
Chapma
কীভাবে এল ল্যাট্রিন?
চাম্পাদের গ্রামে বড়শিপাড়ায় বসবাস করেন ১১০ পরিবার, কিন্তু প্রায় ৩০ পরিবারে এখনও নেই স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন। সেখানে কীভাবে কিছু গরিব পরিবার এই সহযোগিতা পেল সেই গল্পটির সাথে জড়িয়ে আছে একজন সাধারণ গ্রামীণ নারীর অসাধারণ হয়ে ওঠার কাহিনি। চাম্পাদের হাসিমুখের সাথে জড়িয়ে আছে একজন মানুয়ারা বেগমের গল্প। বড়শিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারের গৃহকর্মী। সাইফুন নেসা ও ইফনুস আলীর কন্যা মানুয়ারা গ্রামের স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তারপর বিয়ে হয়ে যায় বড়শিপাড়ার কৃষক মো. আহসান হাবীবের সাথে। পরিবারে কৃষিজমি আছে প্রায় এক বিঘা আর বসতভিটা ৮ শতাংশ। মানুয়ারা স্বামী কৃষির পাশাপাশি একটা মুদি দোকান চালান। মানুয়ারা ঘর-গেরস্থালির একটা বড় অংশই সামলাতে হয়। পাশাপাশি মানুয়ারা সেলাইয়ের কাজ করেন। স্বামী-স্ত্রীর আয় রোজগারেই পড়াশোনা করছে তাদের এক মেয়ে ও এক ছেলে। ঘর-গেরস্থালি, সেলাই সব সামলে মানুয়ারা যুক্ত হয়ে পড়েন সামাজিক কাজে। গ্রামের মানুষকে নানাভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলার কাজে। মানুষের ভেতর ভালো অভ্যাসগুলো জাগিয়ে তুলে পরিবার ও সমাজের বৈষম্য কমানো যায় এই তার চিন্তা। আর এখান থেকেই তিনি কখনো ছুটে গেছেন ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়, কখনোবা কোনো বেসরকারি সংগঠনের কোনো কার্যক্রমে। মানুয়ারাই এলাকার মানুষকে ইউনিয়ন পরিষদসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া নানা ধরণের সেবা ও সহযোগিতা প্রাপ্তিতে নিরলসভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন। এভাবেই তিনি যুক্ত হন বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক’র সাথে। বারসিক’র নানামুখী কর্মসূচির সাথে নিজেকে যুক্ত করে তার ভেতর তৈরি হতে থাকে এক শক্তিশালী নেতৃত্ব। গ্রামের অতি গরিব অধিকারহীন মানুষজন নানাকাজে তার কাছে আসে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার অভাবটি তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় আনেন। গ্রামের দশটি গরিব পরিবারকে চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ‘ওয়াস’ নামে একটি কর্মসূচি মানুয়ারাকে বড়শিপাড়া গ্রামের ল্যাট্রিন কমিটির সদস্য সচিব নির্বাচন করে। মানুয়ারা তার তালিকাটি ব্র্যাকের কাছে পেশ করেন এবং গ্রামবাসীর জন্য ৬টি ল্যাট্রিনের সামগ্রি মঞ্জুর হয়। ৬টি রিং, একটি স্লাব, ডাকনা ২টি, স্যানিটারি ল্যাট্রিন এর বেড়া উপযোগী টিনের ফ্রেম। যে সব ব্যক্তি এই ল্যাট্রিন সামগ্রি পান তারা বাকিটুকু নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছেন। চাম্পাদের পরিবার তারই একটি।

মানুয়ারা হয়ে ওঠার নেপথ্যে
বড়শিপাড়ার পাশের গ্রামের শাকিলার সাথে পরিচয় ছিল মানুয়ারার। শাকিলা বারসিক’র ইপিটিলজি প্রকল্পের একজন ওয়ার্ড ওয়াচ গ্রুপ সদস্য। শাকিলার কাছ থেকে জেনে তিনি এই কর্মসূচির সাথে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখান এবং যোগাযোগ করেন তেলিবাড়ী গ্রামের নয়ন আলীর সাথে। নয়ন আলীও একজন ওয়ার্ড ওয়াচ গ্রুপ সদস্য। তাদের সহযোগিতায় তিনি বারসিক’র সাথে যোগাযোগ করেন এবং ওয়ার্ড ওয়াচ গ্রুপের প্রতিনিধি হন। তারপর থেকেই তিনি এ প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেন। যেমন সংগঠন উন্নয়ন, জেন্ডার, মানবাধিকার ও সুশাসন এবং নেতৃত্ব ও উন্নয়ন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মশালা, বিতর্ক, বক্তৃতা, জনসংলাপ, সংবাদ সম্মেলন ও বাৎসরিক তথ্যমেলা আয়োজন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি একজন দক্ষ নেতা হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বেই ওয়ার্ড গ্রুপের নিয়মিত সভাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রশিক্ষণ পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কর নিরূপণ ও আদায় কমিটির একজন সদস্য হিসাবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ইউনিয়ন পরিষদসহ বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের সেবা ও সহযোগিতাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে।
Monuwara
মানুয়ারার অনুসরণকারীরা
মানুয়ারা পরিবার ও গ্রাম পর্যায়ে নারী-পুরুষের বৈষম্য এবং বৈষম্য নিরসনে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। পারিবারিক বিরোধ নিরসনে রাখছেন এক বলিষ্ঠ ভূমিকা। এক সাধারণ গ্রামীণ নারী থেকে তার এই নেতৃত্বদানকারী অবস্থা গ্রামের ছেলে মেয়েকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার পথ অনুরসরণ করে তারাও এগিয়ে এসেছেন। ইপিটিএলজি প্রকল্পের নানা কর্মসূচিসহ গ্রামের নানাবিধ সমাস্যা সমাধানে একত্র হয়েছেন বড়শিপাড়ার পলি, রোজিনা, গোলাম আরিফ, শাহজাহান, আসমা, শম্পা, মালেক, নাদিরা। মানুয়ারার এই অসাধারণ হয়ে ওঠার পেছনে এক বড় ভূমিকা তার স্বামীর। তিনি সার্বক্ষণিক মানুয়ারাকে সহযোগিতা করেছেন। মানুয়ারা স্বপ্ন সন্তানদের মানুষ করা এবং গ্রামের অবহেলিত নারীদের প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো কিছু করা। তার আজকের এই ভূমিকার জন্য পরিবার ও সমাজে তার সম্মান বেড়েছে এবং তৈরি হয়েছে এক অসামান্য গ্রহণযোগ্যতা।

happy wheels 2
%d bloggers like this: