তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন, সঙ্কটে জীবিকা

তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন, সঙ্কটে জীবিকা

রাজশাহী থেকে অমিত সরকার
রাজশাহী নগরীর তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশের গড় তাপমাত্রাও প্রতিবছর বেড়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দিন দিন তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নতুন নতুন রোগের উদ্ভব হচ্ছে। এছাড়াও বিদ্যমান যে রোগগুলো আছে সেগুলোও বাড়ছে। ফলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন তীব্র গরমে মানুষের হিট স্ট্রোক হচ্ছে। এর ফলে বাইরে যারা কাজ করেন তারা ঠিকমত কাজ করতে পারছেনা। এর প্রভাব তার পরিবার, অর্থনীতির ওপর পড়ছে।


টানা বৃষ্টিহীন প্রচন্ড এই তাপদাহ ও গরমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শাকসবজির গাছ। চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙা, বেগুন, করলা, টমেটো, শসা ও মরিচের মতো সবজির ওপর গরমের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। পুড়ে মরে যাচ্ছে গাছ। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন নগরে বসবাসকারী নগর দরিদ্র বস্তিতে বসবাসকারী মানুষগুলো। নগরীর বুধপাড়া, জামালপুর চৌদ্দপাই, বহরমপুর ও জামালপুর বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, তাদের ছোট পরিসরে ঘরের আঙ্গিনায় করা সবজি গাছগুলো মারা যাচ্ছে। নিজেদের পুষ্টি চাহিদা মিটানো ও বাজার নির্ভরতা কমানোর জন্য নগরীর প্রান্তিক দরিদ্র বস্তিতে বসবাসকারী মানুষগুলো ঘরের পাশে চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙা, বেগুন, করলা, টমেটো, শসা ও মরিচের মতো সবজির চাষাবাদ করে থাকেন। কিন্তু টানা তাপদাহ তাদের এই কষ্টের ফসল নষ্ট করে ফেলছে।


নগর দরিদ্র এই মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের বেলায় তীব্র রোদ। এতে চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙা, বেগুন, করলা, টমেটো, শসা, মরিচ ও লাউয়ের মতো সবজি গাছগুলো শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। কিছু কিছু গাছের পাতার রস এক ধরনের পোকা শুষে নেওয়ায় পাতা কুঁকড়ে গাছ মরে যাচ্ছে। আবার বেগুনে নলি পোকা ছিদ্র করে ঢুকছে। এসব রোগবালাই দমনে নানা চেষ্টা করেও কোন কাজ হচ্ছেনা। গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি অধিকাংশ বস্তিতেই কম বেশি আবাদ হয়েছে। ফলন আসার আগমুহূর্তে শুরু হয়েছে প্রচন্ড তাপপ্রবাহ। অধিকাংশ স্থানে গরমে বিবর্ণ হয়ে গেছে শাকসবজির গাছ। কিছু মরে গেছে। কমে গেছে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। আসছে না ফলন।


নগরীর ৩০নং ওয়ার্ডের বুধপাড়া রেল কলনীর বস্তিতে মাজেদা বেগমের (৫৫) প্রায় ২২ বছর ধরে বসবাস। তিনি সারাবছর তার ঘরের আঙ্গিনায় ঝিঙা, বেগুন, করলা, টমেটো, শসা, মরিচ ও লাউয়ের মতো সবজি আবাদ করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিক্রি করে বাড়তি আয় করে থাকেন। তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে যে গরম পড়ছে, তা শাকসবজি গাছের জন্য সহনীয় নয়। এই সময়ে সবগুলো গাছে ফলন থাকার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় কোনও গাছ বড় হয়নি। উল্টো রোদে পুড়ে করলা, জালি কুমড়া ও বেগুন গাছ মরে যাচ্ছে। বেশিরভাগ গাছই শুকিয়ে গেছে। পানি দিচ্ছি নিয়মিত, কিন্তু সকালে পানি দিলে দুপুরের আগেই শুকিয়ে যায়। বৃষ্টি না হলে কোনও গাছই বাঁচবে না।’


একই বস্তির রুবিনা বেগম (৩৭) বলেন , ”আমার জীবনে এত গরম দেখিনি ঘরের পাশে একটু জায়গায় টমেটো, শসা ও মরিচ চাষ করেছি। রোদে গাছগুলো পুড়ে যাচ্ছে। আশপাশের পানির সমস্যা। পানি নিষ্কাশন ড্রেনের পানি দিয়ে সবজি গাছে দিতাম। এবছর সেই ড্রেনের পানিও শুকিয়ে গেছে। আমাদের পাড়ায় টিউবয়েলগুলোতেও পানি উঠছেনা। দূর থেকে খাবার পানি টেনে এনে খাচ্ছি। পানির কষ্টে ঠিক মত রোজ গোছল করা হয়না। গাছে পানি দিবো কি করে। গাছগুলো তাপে মারা যাচ্ছে।’


এদিকে টানা তাপদাহ ও গরমে নগরীর নগরপ্রান্তিক মানুষগুলো বড় বিপাকে। বস্তিগুলো ঘুরে জানা যায়, টিনের ঘর হওয়ার ফলে তীব্র তাপে ঘর আরো বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে। যে সকল বস্তিতে বিদ্যুৎ নেই তাদের অবস্থা আরো খারাপ। দিনের বেলা তারা ঘরে থাকতে পারছেন না। কোন বড় গাছের নিছে বসে দিন পার করতে হচ্ছে। সন্ধ্যার পরে ঘরে ঢুকতে পারেন। তীব্র গরম ও তাপের কারনে রান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে। কমে গেছে আয় ফলে সংসার খরচ চালানোও হয়ে পরেছে বড় দায়।


চৌদ্দ পাই বস্তিতে বসবাসকারী জালাল মিয়া (৩৮) রিক্সা চালিয়ে পরিবারের তিনজন সদস্যর সংসার পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, ‘তীব্র তাপ ও গরমে মানুষ অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না। এতে আগের মতন আর ভারা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়ে দিনে রিক্সা চালিয়ে জমার টাকা বাদ দিয়েও ৫/৬ শত টাকা থেকেছে। কিন্তু এখন রিক্সা জমার টাকাই হয়না। মাঝে মাঝে ঘর থেকে টাকা নিয়ে রিক্সা মহাজনকে দিতে হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত গরমে রাস্তা গরম হওয়ার কারণে রিক্সার চাকা নষ্ট হচ্ছে। ব্যাটারি ও মোটর এর সমস্যা হচ্ছে। আমাদেরও রিক্সা চালাতে কষ্ট হচ্ছে অনেক। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটানা এমন তাপ হয়নি আগে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।


জামাল মিয়ার মতনই জামালপুর, নামোভদ্রা, বহরমপুর বস্তিতে বসবাসকারী নি¤œ আয়ের মানুষগুলোর অবস্থা। তাপদাহের তীব্রতার ফলে তাদের দৈনিক আয়ের উপর মারাক্তক প্রভাব ফেলেছে। বাড়ছে নানা ধরনের রোগ।
জামালপুর বস্তিতে বসবাসকারী চম্পা বেগম (৪৫) বলেন, ‘এই গরমে আমাদের শরীরিক সমস্যা নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ঘনঘন পিপাসা লাগে। আমরা এই গরম থেকে বাঁচতে স্যালাইন পানি ও লেবু পানি খাচ্ছি বেশি করে। দিনের বেলা ঘরে থাকা যায় না টিনের ঘর তাপে আরো বেশি গরম হয়ে পড়ছে। আমার ঘরের উপর লাউ এর গাছ ছিলো সেটাও এই তাপে মারা গেলো। সরাবছর ঘরের উপর লাউ, সীম করলা, মিষ্টিকুমড়া এই ধরনের গাছগুলো রাখি এতে ঘর ঠান্ডা থাকে। কিন্তু এবছর টানা তাপ বৃষ্টি না হওয়ার কারণে গাছ মরে গেলো। এখন দিনে ঘরে থাকা যায়না সারাদিন বাহিরে থাকি সন্ধ্যার পর ঘরে যাই।

happy wheels 2

Comments