সাম্প্রতিক পোস্ট

REDD ও REDD প্লাস কি?

সিলভানুস লামিন

ভূমিকা
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় (অভিযোজন ও প্রশমন) বিশ্বব্যাপী নানান কৌশল ও পদ্ধতি রয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকগণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এবং এ পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানী হ্রাস করার জন্য নানান কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে। REDD ও REDD+ তার মধ্যে অন্যতম। কিছু কারিগরি ও পদ্ধতিগত প্রশ্নের কারণে কিয়োটো প্রটোকল ও UNFCCC-তে বনাঞ্চল উজাড় হ্রাস ও বনভূমি ধ্বংস কমানোর মাধ্যমে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়টি অর্ন্তভূক্ত করা হয়নি। তবে REDD (Reducing Emissions from Deforestation and Forest Degradation) ও REDD+ প্রস্তাবকরা সম্প্রতি এই ইস্যুকে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় উত্থাপন এবং কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় এই ইস্যুকে অর্ন্তভুক্ত করার ক্ষেত্রে নিরন্তরভাবে কাজ করেছে। একইসাথে বন উজাড় হ্রাস ও বনভূমি ধ্বংস কমানোর মাধ্যমে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস বা REDD+ বাস্তবায়নে জড়িত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলভূক্ত দেশগুলো যারা বিভিন্ন পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছে তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থ অনুদান দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

REDD কি?
REDD যা ভাঙলে দাঁড়ায় Reducing Emissions from Deforestation and Forest Degradation, হচ্ছে একটি কর্মসূচি বা প্রক্রিয়া যেখানে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলো, কোম্পানি বা বনাঞ্চলের মালিককে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কার্বন সমৃদ্ধ বনাঞ্চল উজাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংস না করার জন্য প্রণোদন বা উৎসাহিত করা হয়।

২০০৭ সালে আইপিসিসির চতুর্থ এসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয় (IPCC AR4) বনাঞ্চল উজাড় ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন থেকে ১৭% গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় যা সারা বিশ্বের পরিবহন খাত থেকে নিঃসৃত গ্রীনহাউস গ্যাস অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মোট নিঃসরণের চেয়ে বেশি। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর ৯ থেকে ১৩ মিলিয়ন হেক্টর সমপরিমাণ বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়। এই তথ্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কর্তব্যরত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস বন্ধ করার জন্য দ্রুতভাবে কার্বন সমৃদ্ধ বনাঞ্চল আছে এমন দেশগুলোকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেয়।
বলা হয়, যদি REDD কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে বনাঞ্চল সংরক্ষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫ থেকে ২ দিগ্রী সেলসিয়াস মধ্যে রাখা সম্ভব হবে যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অন্যতম লক্ষ্য। সালোক-সংশ্লেষণ এবং বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড অক্সিজেনে রূপান্তরের মাধ্যমে বনাঞ্চল বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে থাকে। আইপিসিসির চতুর্থ এসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনাঞ্চল ও টেরিস্টেরিয়াল বছরে ২.৬ গিগা টন কার্বন শোষণ করে। এভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস ও উজাড় করা হলে বনাঞ্চলে সংরক্ষিত এসব কার্বন বায়ুমণ্ডলে চলে আসে।

REDD প্লাস কি?
REDD+ হচ্ছে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস রোধের জন্য এর সংরক্ষণ, মজুদ বৃদ্ধি এবং বনাঞ্চলের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাকে জোরদারের জন্য REDD এর সাথে নতুন সংযোজিত উদ্যোগ। ২০০৭ সালে বালিতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে নতুন সংযোজিত এই উদ্যোগটি সমর্থিত হয়।
REDD এর সাথে (+) যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস হ্রাসের নামে যাতে অযৌক্তিভাবে অপাত্রে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করা না হয় বরং যেসব রাষ্ট্র সবচে’ বেশি বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস হওয়ার পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল তারাই যেন এই আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে পারে তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে যেসব রাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণ বনাঞ্চল রয়েছে এবং ওই রাষ্ট্রগুলোতে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংসের পরিস্থিতি খুব বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে না তারা এই আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা পাবে না। এই ‘প্লাস’ (+) কর্মসূচি ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত Bonn Climate আলোচনায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস বন্ধ করার জন্য কর্মসূচি পরিচালনায় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের পাশাপাশি বনাঞ্চল সংরক্ষণ, এর পরিধি বৃদ্ধি এবং স্থায়িত্বশীল উপায়ে বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিমালা এবং ইতিবাচক আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া। এভাবে যেসব কর্মসূচি কার্বন সঞ্চয় ও শোষণ করে, মাটির উর্বরাশক্তি নিশ্চিত করে, বৃষ্টিপাত ঘটায়, সুন্দর আবহাওয়া নিশ্চিত করে এবং প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করে সেসব কর্মসূচি আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভে অগ্রাধিকার পাবে।

যেখানে বনাঞ্চল উজাড় ও ধ্বংস প্রতিবছর বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণ গ্রীনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি করে সেখানে বনাঞ্চল উজাড়, ধ্বংস রোধ, বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও এর স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে নিম্নলিখিত ইতিবাচক ফলাফলগুলো লাভের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে:

ক) বিদ্যমান বনাঞ্চল সংরক্ষণের মাধ্যমে বনাঞ্চল উজাড় থেকে যে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসৃত হয় সেগুলো আর হবে না,
খ) গাছ রোপণ অথবা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বিভিন্ন গাছপালার বৃদ্ধিকে সহায়তার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে বনাঞ্চল কর্তৃক শোষিত কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং সেগুলো বনাঞ্চলের বায়োমাসে সঞ্চিত থাকবে এবং
গ) বনাঞ্চলের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা তথা বনাঞ্চলের ওপর চাপ কমানো এবং রাস্তাঘাট নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত নির্মাণে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বনাঞ্চল ধ্বংস থেকে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার কমানো সম্ভব হবে।

উপসংহার
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন বলতে সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশ কিংবা মানুষের মধ্যে সংঘটিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেওয়াকে নির্দেশ করে। এই প্রক্রিয়ায় বাস্তবিক কিংবা অনুমিত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস এবং এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে লাগানো হয়। বিভিন্ন দেশের আদিবাসীসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা জলবায়ু পরিবর্তনে ন্যুনতম অবদান রাখলেও এই পরিবর্তনের প্রভাবে তারাই সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয়। ভয়াবহ খরা পরিস্থিতি, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, হারিকেন, হিমবাহ গলন, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক ও ছোঁয়াছে রোগবালাইয়ের প্রাদূর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এগুলো আদিবাসীসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, জীবনপদ্ধতি, স্বাস্থ্য, ভূমি ও ভূমি ব্যবহার, সম্পদ ও ভূখণ্ডে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনে মোকাবিলায় REDDREDD প্লাস (+) প্লাস বাস্তবসম্মত উপায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু পরিবর্তনের হার কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: