সাম্প্রতিক পোস্ট

সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিমের স্বপ্নযাত্রা

মারুফ হোসেন মিলন, টিম লিডার, সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিম, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা

আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। একদিন রাতে আমার মা আমাকে বলেন, ‘কাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। শ্যামনগর উপজেলায় সরকারি/বেসরকারি সংগঠনের সহযোগিতায় সকালে র‌্যালি, আলোচনা সভা হবে। বারসিক আমাকে দিবস পালনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তোর স্কুল ছুটি, চল কাল আমার সাথে তুইও দিবস পালনে অংশগ্রহণ কর।” পরের দিন আমিও গেলাম মায়ের সাথে। শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে থেকে র‌্যালি বের হয়। স্কুল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করে, আলোচনা সভা করে, প্রেসক্লাবের সামনে শত প্রকার ফসলের বীজ রেখে নারীর কৃষি অবদানকে তুলে ধরে। মায়ের হাত ধরে দিবস পালনে অংশ নিয়ে আমি অনেক তথ্য জানতে পারি, জ্ঞান অর্জন করি। সেই থেকে বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক দিবস পালনে অংশগ্রহণ করি, আমার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করি, তাদেরকে সমাজের সেবামূলক কাজের আহবান জানায়। প্রথমে সহপাঠী, প্রতিবেশি ও আমার বন্ধু আল ইমরান, রাফিজুল, গোকূল, উত্তমা, শেফালী, শিউলী, ফজলু, কেশব ও কামরুল মিলে বারসিক শ্যামনগর রিসোর্স সেন্টারের কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের স্বপ্নের কথা জানাই। বারসিক আমাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনাকে মূল্যায়ন করে। একটি যুব টিম গঠন করার পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করে। শুরু হয় সামাজিক নায্যতা প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম উদ্যোগ। উপকূলীয় শ্যামনগর অঞ্চলের কৃষক, বনজীবী, আদিবাসী, জেলে, মুন্ডা, ঋষি, কাহার, কামার, কুমার শ্রেণীর মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। প্রভাবশালীদের অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ এ অঞ্চলের মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশকে ধ্বংস করছে। ছোট ছোট কৃষি পরিবার ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে, লবণ পানির চিংড়ি চাষের কারণে এলাকা থেকে গাছ, মাছ, প্রাণী, জল, জমি, বন, জলাশয় সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের অনেক এলাকায় এখন দুধ, রক্তওয়ালা মাছ, মুরগির ডিম, ফল কিছুই পাওয়া যায় না। জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ে নানান ধরনের দুর্যোগ সহ্য করে এ জনপদের মানুষকে টিকে থাকতে হয়। আমাদের চারিদিকে পানি। কিন্তু তা লোনা। ফলে আমাদের পানির ভয়াবহ কষ্ট। পানির অভাবে হাজার হাজার কৃষিজমি ফসলশুন্য পড়ে থাকে। এতসব অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও কৃষক, বনজীবী, জেলে, আদিবাসী মানুষেরা আমাদের জনপদের সকলের সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু ওই মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর মানুষ খুবই কম। ২০০৯ সালে শুরুতে আমরা বারসিক সহায়তায় ৩০ জন সহপাঠীদের নিয়ে ‘সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম’ গঠন করে মানুষের জন্য, মানবতার জন্য তারুণ্য শক্তিকে কাজে লাগানোর শপথ গ্রহণ করি। নিয়মিত সভা, দিবস পালন, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদান, স্বেচ্ছাশ্রমে সুপেয় পানির উৎস ব্যবস্থাপনা, প্রান্তিক মানুষের পাশে থেকে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা পেতে সহযোগিতা করা, গরিব পরিবারের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার প্রয়োজনে বিনামূল্যে রক্ত দান, স্থানীয় এলাকার নদী-খাল, বন, কৃষি জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় মানুষকে সচেতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ বন্ধ, পরিবেশ উপযোগী বনায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে শুরু হয় আমাদের বিরামহীন পথচলা। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত টিমের স্বপ্নযাত্রার অভিজ্ঞতা বিনিময়ে এই লেখার প্রয়াস।

জীবনের জন্য পানি, পানির জন্য জীবন

শ্যামনগর উপজেলার সর্বত্র সুপেয় পানির সংকট। ভৌগলিক ও কৃষিপ্রতিবেশগত ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানি লোনা। মাটির নিচের পানি লোনা। উপকূলীয় এই জনপদে বন কেটে মানুষের বসবাস শুরু। এ অঞ্চলে জনবসতি স্থাপনের পর থেকেই মানুষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের নানান উৎস যেমন, কনকনা, খানা, ডোবা, মজাপুকুর ও খাল খনন করে। কিন্তু ১৯৮০ দশকে লবণ পানির চিংড়ি চাষ ও সর্বাধিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় সারাবছর উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট। দিন দিন সুপেয় পানির সংকট আরো প্রকট হচ্ছে। ২৫ মে ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে উপজেলার ৪ হাজারের বেশি সংরক্ষিত পুকুর, এক হাজারের বেশি পিএসএফ এবং ১৩ হাজারের বেশি টিউবওয়েল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫০টি পিএসএফ ও তার সন্নিবেশিত পুকুর, ৮০০টি টিউবওয়েল এবং আরও ৮০০টি পুকুরের সুপেয় পানি সম্পূর্ণ লবণাক্ত হয়ে যায়। এক কলস ত্রাণের খাবার পানির জন্য একজন নারীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্ড হাতে দাঁড়াতে হয়েছে।

প্রায় দুইশ বছর আগে সদানন্দ বাবু নামে একজন ব্যক্তি উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার যাদবপুর গ্রামে বসতি গড়ে তোলেন। তিনি এলাকার মানুষের পানি খাওয়ার জন্য এক একর ৪২ শতক জায়গায় একটি পুকুর খনন করেন। ১৮৮৮ সালে ৫ টাকার বিনিময়ে পুকুরটির ক্রয় করেন স্থানীয় শেখ বংশ। যাদবপুরসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষেরা সুপেয় পানি চাহিদা পূরণ করত ঐতিহ্যবাহী সদানন্দ বাবুর পুকুর থেকে। শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর জনসাধারণের স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করে ১৯৯২ সালে পুকুর পাশে পিএসএফ তৈরি করে দেয়। ১১ জন মালিকানাধীন এই পুকুর পাড়ে সরকারিভাবে ফিল্টারটি নির্মাণ করা হলে বেশ কিছুদিন পর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ফিল্টারটি নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে গ্রামের মানুষ আবারও সুপেয় পানির সমস্যায় পড়ে। বিগত ২০১৩ সাল থেকে সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিমের যাদবপুর ইউনিটের একদল যুবক কামরুল, আজাদ আলী, কাদের, লিটন, মাসুম, রনি, মাহবুর, আকরাম, আফজাল, আছানুর স্বেচ্ছাশ্রমে পুকুর ও পিএসএফ এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পাশাপাশি গ্রামের যুবকেরা পাশের পশ্চিম মাহমুদপুর গ্রামের দীর্ঘদিন অকেজো থাকা ফিল্টার ও এক একর আয়তনের পুকুর পুনরায় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় ২০১২ সালে পুকুরটি পুনঃখনন ও নতুন ফিল্টার তৈরি করে। যুবকেরা নিয়মিত ফিল্টার পরিস্কার, সংস্কার, পুকুরে আগাছা পরিস্কার করা, ঘিরে রাখা, বর্ষাকালে চলাচলের পথে ইট বিছানো, পুকুর পাড়ে নলকূল স্থাপন ইত্যাদি কাজ করে নিজেদের গ্রামসহ আশেপাশে ৯ (সোয়ালিয়া, দেবীপুর, ফুলবাড়ি, পঃ মাহমুদপুর, চিংড়াখালী, বাদঘাটা, আংশিক কালমেঘা ও কল্যাণপুর) গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। স্থানীয়দের তথ্য মতে, পুকুর থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার কলস পানি পুকুর থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া সুপেয় পানি ও কৃষি উপযোগি পানির যাবতীয় উৎস রক্ষা ও সৃষ্টিতে টিম নিয়মিত এডভোকেসি করছে।

কৃষির সাথে, কৃষকের পাশে

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলায় উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৯ নং বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই ইউনিয়নে আড়পাঙ্গাশিয়া বিলে ১১শ বিঘা কৃষি জমি ছাড়া আর কোন কৃষি জমি নেই। আইলায় বিলের কৃষি ও মিষ্টি পানি খাল লবণাক্ত হয়ে যায়। আড়পাঙ্গাশিয়া গ্রামের কৃষকেরা দাবি তোলেন খালের লবণ পানি অপসারণ, খাল পুনঃখনন করার। ২০১২ সালে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি খালের কিছু অংশ খনন করা শুরু করলে গ্রামের কৃষকদের মধ্যে আনন্দ/হাসিমুখ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে, কৃষকেরা তাদের কৃষিজমি রক্ষার মাধমে গ্রামের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বপ্ন আবারও ভঙ্গ হয়। লবণ পানির হাত থেকে নিজেদের কৃষিজমি রক্ষায় গ্রামের সকল কৃষকেরা আবার আন্দোলনের পথ বেঁছে নেন। কৃষকদের আন্দোলনে এবং তাদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম। প্রশাসন ও বারসিক খাল পুনঃখনন ও লবণ পানি অপসারণ করে দেয়। ফলে গ্রামের কৃষকেরা প্রতিবছর প্রায় ২৪শ মণ ধান উৎপাদন করার সুযোগ পাচ্ছে, যার বাজার মূল প্রায় ৮৮ লক্ষ টাকা। গ্রামবাসীর খাদ্যের অভাব পূরণ হচ্ছে। আবার গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করছে। একইসাথে উপজেলার খুঁটিকাটা, যাদবপুর, বাঁধঘাটা, সোনামুগারী, চন্ডিপুর গ্রামের কৃষিজমি লবণ পানির হাত থেকে রক্ষা ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির ক্ষতিপূরণে কৃষকদের সাথে পাশে থেকে আন্দোলন করেছে সুন্দরবন সলিডারিটি টিম। মূলত টিমের সদস্যরা কৃষকের পাশাপাশি বনজীবী, জেলে, আদিবাসীসহ প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

আমরা মানুষের, আমরা মানবতার

(১) উপকূলীয় শ্যামনগর জনপদের সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের যোতিন্দ্রনগর গ্রামের মো. জিয়াদ আলী গাজীর পালিত সন্তান বনজীবী রহমান গাজী। ৩ ছেলে ও ৩ মেয়েসহ তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৮ জন। পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে তিনি বনের উপর নির্ভরশীল। দরিদ্র পরিবার তাই অনেক সময় অন্যদের সাথে বনে শ্রমিক বনজীবী হিসাবে কাজ করে। তাছাড়া, অন্য পেশার কাজ করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের আর কোন সুযোগ নেই। ২০১২ সালে বনবিভাগের পাশ নিয়ে অন্যদের সাথে বনে যান কাঁকড়া সংগ্রহ করতে। হঠাৎ সুন্দরবনের লচুখালী নামক জায়গা থেকে একটি বাঘ রহমান গাজীকে আক্রমণ করে। সঙ্গীসহ আশেপাশের বনজীবীরা বাঘের মুখ থেকে রহমান গাজীকে উদ্ধার করার আগে বাঘ তার মাথার বাম পাশের মগজ পর্যন্ত বের করে ফেলেছে। প্রচন্ড রক্তক্ষরণ অবস্থায় তাকে বাড়ি এনে স্থানীয় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এভাবে ৪ দিন পর শ্যামনগর উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালের ডাক্তার তার অবস্থা আশংকাজনক মনে করে খুলনা সরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারে সে সক্ষমতা না থাকায় স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুনরায় চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।  ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন করা ঔষুধের অর্ধেক হালপাতাল কর্তৃপক্ষ দেন এবং বাকি বাইরে থেকে কিনতে হবে। বাঘে ধরা রোগীর জন্য সুপার পাইম নামক একটি বিশেষ ঔষুধ প্রয়োজন হয়, যা তাকে দৈনিক ৪ গ্রাম করে শরীরে পুশ করতে হবে। এবং প্রতি ২ গ্রাম ঔষুধের দাম ৯৬০ টাকা (কোম্পানির দামে) প্রায়। তারপরও সবসময় বাজারে পাওয়া যায় না। সাংবাদিক এবং সরকারি/বেসরকারি সংস্থার কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় শ্যামনগর হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে। প্রতিদিন ২৫০০ টাকা চিকিৎসা খরচ প্রয়োজন। সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম প্রায় ১১ হাজার ৩ শত টাকা সংগ্রহ করে সহযোগিতা করে।

(২) উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাঁধঘাটা গ্রামের শিশু ইয়াছিন আরাফাত (১০)। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে সাতক্ষীরা যাওয়ার পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়। শিশু ইয়াছিন আরাফাতের ডান পা ভেঙ্গে যায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য শ্যামনগর হাসপাতালে  প্রেরণের পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। একজন ভ্যান চালক পিতার পক্ষে উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অসুস্থ সন্তানকে বাড়িতে রেখে ইয়াছিনের পিতামাতা মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করতে থাকে। এ সময় সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম আহত ইয়াছিনের পাশে দাঁড়ায়। এই টিমের সদস্যরা শ্যামনগর থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং একটি হুইল চেয়ার সংগ্রহ করে ইয়াছিনকে সহযোগিতা করে।

(৩) ফতেমার পড়াশুনার দায়িত্ব গ্রহণ:-১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখ দৈনিক কালের চিত্র পত্রিকায় শ্যামনগরে বই কিনে না দেওয়ায় স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যার চেষ্টা শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, শ্যামনগর উপজেলার জয়াখালী গ্রামের বনজীবী আব্দুল মজিদের মেয়ে ফতেমা (১৪) অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়াশুনার ইচ্ছা থাকলেও বই কিনে দিতে পারেনি পিতা। কয়েক মাস আগে আসমা নামের এক বান্ধবীর হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার বই নিয়ে আবার পড়াশুনা শুরু করে ফাতেমা। কিছুদিন পর আসমা তার বই নিয়ে যায়। এ কথা ফতেমা তার পিতা জানায় এবং বই কিনে দেওয়ার কথা বলে। দরিদ্র পিতা মেয়ের কথায় গুরুত্ব না দেওয়ায় ফতেমা অভিমান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ সময় তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শ্যামনগর হাসপাতালে ভর্তি করে। ৪ দিন চিকিৎসার পর ফতেমা সুস্থ হয়ে যায়। ফতেমার ঘটনা জানতে পেরে সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিম ও বারসিক শ্যামনগর রিসোর্স সেন্টারের কর্মকর্তারা হাসপাতালে তাকে দেখতে যায়। ফতেমা ও তার মায়ের সাথে কথা বলে এবং ফতেমার পড়াশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বারসিকের নির্বাহী পরিচালক এই ঘটনা শুনে ফতেমার জন্য বই, স্কুল ব্যাগ ও অন্যান্য উপকরণ কিনে দিতে বলেন। পরবর্তীতে ফতেমাকে শিক্ষা উপকরণ সহযোগিতা করা হয়। বর্তমানে ফতেমা সুস্থ রয়েছে এবং পড়াশুনা করছে।

যুব জলবায়ু ক্যাম্প, তারুণ্যের বন্ধন

এসো সব তরুণ প্রাণ, গাই পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার সবুজ গান এই শ্লোগানকে সামনে রেখে সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিম ও বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক দেশে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনে ভাসমান ‘যুব জলবায়ু ক্যাম্প ২০১২’ আয়োজন করে। আমরা সবাই সেই ক্যাম্পে যোগদান করি। ক্যাম্পে যোগদান করে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবর্তনের কারণসমূহ, মানুষের নানা ধরনের অভিযোজন কৌশল এবং তরুণদের ভূমিকা সম্পর্কে আমরা জ্ঞানার্জন করি। আমাদের সাথে মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, বরগুণা, পিরোজপুর, খুলনা, গাইবান্ধা, চাপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, বরিশাল অঞ্চলের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যুব প্রতিনিধিরাও এই ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করে। এতে করে আমরা এক এলাকার বিভিন্ন বিষয় জানতে পারি। তাদের সাথে একটি যোগাযোগের নেটওয়ার্ক স্থাপন করার সুযোগ পাই। এছাড়া ক্যাম্পে সম্মানিত শিক্ষক, গবেষক, উন্নয়ন প্রতিনিধি, বনবিভাগ, সরকারি প্রশাসন, স্থানীয় সংগঠন প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকগণ সহায়ক হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আমাদের তথ্য ও শিক্ষা প্রদান করেছেন। ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীদের সমন্বয়ে দশ দফা দাবি সংবলিত যুব জলবায়ু ঘোষণা ২০১২ প্রণীত হয়। দেশের সকল জনগণের বেঁচে থাকার নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতি সমর্থন ও আস্থা রেখেই এই ঘোষণা তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যুব সমাজের এই জলবায়ু ঘোষণাও দেশের সার্বিক সুরক্ষা ও আনন্দময় ভবিষ্যতের জন্য কাজ করবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে ‘যুব জলবায়ু ক্যাম্প ২০১২’। যুব জলবায়ু ঘোষণা-২০১২ তে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ চিহ্নিত করে এসব কারণ বন্ধ করা, ধনী ও শিল্পোন্নত দেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী করে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্যোগের শিকার গরিব দেশের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা,  বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের তরুণ ও যুব সম্প্রদায়, যারা জলবায়ু সুরক্ষা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক প্রধান চালিকা শক্তি তাদের অবদানকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগসমূহকে চিহ্নিত করে এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান ও কারিগরিকে সমন্বয় করে দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করে টেকসই প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন করা, জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন বিষয়ক কর্মকৌশল, নীতিনির্ধারণী ও উদ্যোগে দেশের সকল প্রান্তের যুব সমাজের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা এবং যুব সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য নিরাপত্তাকে বিবেচনা করেই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করাসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।

আধার মুছে জ্বালাবো প্রদীপ লক্ষ হদয়জুড়ে

ছোট একটি টিম এখন অনেক বড়। ৩০ সদস্যের সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডরিটি টিম বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৩শ’ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে উপজেলা সদরে একটি সমন্বয় কমিটি ও কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এই টিমটির ইউনিট উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, আঁটুলিয়া, ভূরুলিয়া, যাদবপুর ও বাঁধঘাটায় গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ইউনিটের সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষের জন্যে কাজ করছে। নিজেদের গ্রামকে আদর্শ গ্রাম, নিজ উপজেলাকে শ্রেষ্ঠ করার মানসিকতা ও মানবতার চেতনাকে পুঁজি করে আমরা কাজ করছি। দীর্ঘ ৭ বছরে আমাদের স্বীকৃতি, সম্মান, অর্জন অনেক। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে এই টিমের ছেলেমেয়েরা এ্যাকটিভ সিটিজেন সামিটে অংশগ্রহণ করে দু’বার প্রথম পুরুষ্কার অর্জন করেছে। লন্ডন সফর করেছে। উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, উপজেলা পুলিশিং কমিটি, দুর্যোগ স্বেচ্ছাসেবক, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছে।

টিমের সদস্যরা নিয়মিত স্বেচ্ছাশ্রমে উপজেলায় সুপেয় পানির পুকুরের ফিল্টার পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা, গুণীজন সংবর্ধনা, অসহায় পরিবারে শীত বস্ত্র বিতরণ, অসুস্থ ব্যক্তিকে রক্তদান, টিকা দান, মাদকবিরোধী র‌্যালি ও আলোচনা, সৎকার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা, নদীর চর বনায়ন, মানববন্ধন, এতিম শিক্ষার্থীদের বই সহযোগিতা, এতিমখানায় ১০ হাজার ইট সহযোগিতা, মতবিনিময়, পরিবেশ রক্ষায় সংবাদ সম্মেলন করা, স্মারকলিপি প্রদান, ইভটিজিং ও কৃষিজমি রক্ষায় সংযোগ খালের লবণ পানি অপসারণ ও ইজারা বাতিলের দাবিতে মানবন্ধন করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করা, টিমের ব্যাংক একাউন্ট, ই-মেইল ও ফেসবুক আইডি খোলা, পরিষেবা পেতে সহযোগিতা, রাস্তা সংস্কার, শিশুশ্রম বন্ধের দাবিতে আলোচনা ও মতবিনিময়, দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ু জনসংলাপ আয়োজন করে চলেছে। সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিম মানুষের, মানবতার, কল্যাণের এবং স্বতন্ত্র একটি সংগঠন। এই টিমকে ধারাবাহিকভাবে সহায়তা করার জন্য বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক’র প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ। পাশাপাশি সুশীলন, উপজেলা প্রেসক্লাব, উপজেলা প্রশাসন, জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, ইউনিয়ন পরিষদ ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আমাদের টিমকে নিয়মিত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য। টিমের প্রত্যেক সদস্য পড়াশুনার পাশাপাশি নিজের, পরিবারের, সমাজের ও দেশের উন্নয়নে স্বেচ্ছাশ্রম বিনিয়োগে দায়বদ্ধ।

happy wheels 2
%d bloggers like this: