সাম্প্রতিক পোস্ট

মিনতি রানী বাসফোর চকপাড়া হরিজন পল্লীর আলোকবর্তিকা

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

সমাজের অনগ্রসর ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হরিজন জনগোষ্ঠী অন্যতম। বিশেষভাবে হিন্দু সমাজে হরিজন জনগোষ্ঠীকে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত জাতি হিসেবে দেখা হয়। এ জনগোষ্ঠীর পেশা সমাজের অন্যান্য পেশার চেয়ে নিকৃষ্ট পেশা হিসেবে পরিচিত। অথচ এ পেশা ছাড়া শহর সমাজ অচল। বিশেষভাবে শহরের পরিষ্কার পরিছন্নতা রক্ষায় এ পেশাজীবীদের অবদান সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ। নেত্রকোনা পৌর এলাকার বিভিন্ন বস্তিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে আসছে প্রায় শতাধিক হারিজন (দলিত) জনগোষ্ঠী। পৌর এলাকায় পরিষ্কার পরিছন্নতা (ঝাড়ুদাড়) কর্মী, নরসুন্দর, জুতা সেলাই ও জুতা রঙের কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব দলিত হরিজন জনগোষ্ঠী সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। হরিজন জনগোষ্ঠীর পুরুষদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। তারা তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অসচেতন। হরিজন জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার অতি নগণ্য। এ জনগোষ্ঠী সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত, তারা এসব সেবাসমূহ সম্পর্কেও অজ্ঞাত।

20190624_123643-W600

নেত্রকোনা পৌর এলাকার পূর্ব চকপাড়া গ্রামে মোট ৪৫টি হরিজন পরিবারের বসবাস। এ গ্রামেরই এক হরিজন পরিবারের বধু মিনতি রানী (৩৫)। গ্রামের অন্যান্য হরিজন পরিবারের মায়েদের ন্যায় ভাগ্যের উপর ভরসা করে বসে থাকেননি মিনতি রানী। তিনি পৌরসভার ঝাড়–দাড়ের কাজ করেন। যে সামান্য আয় করেন তার উপর ভরসা করে বসে থাকেননি। পরিবারের স্বচ্ছলতা বৃদ্ধির জন্য তিনি বিভিন্ন ধরণের আয়বৃদ্ধিমূলক কাজ করে থাকেন। পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও সন্তানদের শিক্ষা লাভে তাঁর উদ্যোগ বস্তি এলাকার অবহেলিত নারীদের জন্য অনুকরণীয়। চার সন্তানের জননী মিনতি রানীর একটা সময় ছিল যখন শহরে বাসা ভাড়া করে থাকার মত টাকা তাঁর ছিল না। টাকা না থাকায় তাদের মাথা গোজার ঠাইঁ হয় বস্তিতে। স্বামী যে টাকা উর্পাজন করতেন তা দিয়ে ক্ষুধা মেটানো দায় ছিল।

তাই নিজেও পৌরসভায় ঝাড়ুদাড়ের পাশাপাশি অন্যের বাসা বাড়িতে ঝাড়ু দেওয়া কাজ নেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের রোজগারে কোন রকমে দিন চলছিল মিনতি রানীর। প্রতিনিয়ত অভাবের জীবনের সাথে যুদ্ধরত মিনতির স্বপ্ন তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। অভাবের সংসারেও তিনি মেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। বড় মেয়ে প্রিয়া বাসফোর খুব সাহসী ও বৃদ্ধিমতী। মা মিনতি রানীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বড় মেয়ে প্রিয়া বাসফোর বিনা পানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে পিএসসি পাশ করে নেত্রকোনা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি হয়। দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের মেয়ে হওয়ায় স্কুলে তার কোন বন্ধু ছিলনা। কেউ তাকে ভালো চোখে দেখতনা, মিশতনা এবং কথাও বলতনা। এমন অবস্থায় প্রিয়া বাসফোরের পাশে দাঁড়ান স্কুলেরই এক শিক্ষিকা তমা রায়।

প্রিয়ার স্কুল জীবনে বড় ভুমিকা রাখেন শিক্ষিকা তমা রায়। অষ্টম শ্রেণীতে প্রিয়া জিপিএ ৪.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় এবং এসএসসি পাশ করে জিপিএ ৩.৬১ পেয়ে। প্রিয়া বাসফোর বর্তমানে নেত্রকোনা সরকারি কলেজে এইচএসসি পড়াশুনা করছে। মা মিনতি রানী শত কষ্টেও সন্তানদের লেখাপড়ার শেখানো থেকে পিছপা হবার পাত্রী নয়। মিনতি রানীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চকপাড়া হরিজন পল্লী থেকে চলতি বছর দু’টি মেয়ে প্রথমবারের এসএসসি পাশ করেছে। মিনতি রানী পল্লীর অন্যান্য হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের স্কুলে যেতে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। যেসব হরিজন শিশু স্কুলে যায় না তিনি তাদের তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন এবং সামর্থ অনুযায়ী তাদেরকে সহযোগিতা করেন। নিজের ঘরে খাবার না থাকলেও অন্য পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়া তার অভাসে পরিণত হয়েছে।

20190624_123646-W600
মিনতি রানী বাসফোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী হলেও শখের বশে অনেক দিন যাবত কবুতর পালন করছেন। এটি তার পরিবরের একটি আয়ের উৎস। নিজের ঘরের ছোট বারান্দায় তিনি কবুতরগুলোকে পালন করেন। সন্তানদের পড়াশুনার কিছু খরচ এখান থেকে তিনি পেয়ে থাকেন।

তার এই উদ্যোগ আরো গতিশীল করতে এবং প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি মাধ্যমে পারিবারিক আয়বৃদ্ধিতে অবদানের জন্য মিনতি রানী হরিজন পাড়ার অন্য নারীদের নিকট অনুসরণীয়। যেখানে হরিজন জনগোষ্ঠী তাদের বস্তিতে কোন ধরণে গৃহপালিত পশু-পাখি পালন করেন না, সেখানে মিনতি রানী গৃহপালিত পাখি পালন করে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করছেন। তাকে অনুকরণ করে গ্রামের আরও দু’টি পরিবারের দু’জন হরিজন নারী কবুতর পালন করছেন। তাদেরকে কবুতর পালনে উৎসাহিত করছেন মিনতি রানী বাসফোর।

মিনতি রানী বাসফোর আজ নেত্রকোনা পৌর এলাকার চকপাড়া হরিজন পল্লীর পথ প্রদর্শক। তার অনুপ্রেরণায় চকপাড়া হরিজন পল্লীর শিশুরা শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রসর হতে পারছে। হরিজন পুরুষরাও তাদের সন্তানদের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকটা সচেতন হয়েছেন। হরিজন নারীরাও স্বামীদের পাশাপাশি পারিবারিক আয় বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: