সাম্প্রতিক পোস্ট

আব্দুল লতিফের পাশে সিংগাইর সমাজ সেবা অফিস

মানিকগঞ্জ সিংগাইর থেকে রিনা ও আছিয়া আক্তার
ছকবাধা নিয়মে মানুষের জীবন চলে না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না নিয়েই মানুষের জীবন। সেই রকমই এক বৈচিত্র্যময় জীবনের গল্প মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার ঘোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ খান-এর (৬২)। দাবা ও ভলিবল খেলায় একজন পারদর্শী খেলোয়াড় হিসেবেই আব্দুল লতিফকে এলাকার মানুষ জানেন ও চিনেন। ১৯৯৫ সালে দাবা খেলায় তিনি মানিকগঞ্জ জেলায় চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। কিন্তু ভূমিহীন কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া আব্দুল লতিফকে সংসারের প্রয়োজনেই এক সময় খেলা ছেড়ে উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। প্রথমে তিনি রেডিও, ঘড়ি, টেলিভিশনের মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু শিল্পমনা মানুষ আব্দুল লতিফ নির্দিষ্ট কোন কাজে নিজেকে বেধে রাখেননি। এক সময়ে তিনি দোকানটি বিক্রি করে একটি প্রায়ভেট কার কিনে স্বাধীনভাবে নিজেই চালাতেন, অবসর সময়টি ব্যয় করতে এলাকার মানুষের কল্যাণে। সেটিও তার খুব ভালো লাগেনি। অবেেশষে তিনি একটি সিএনজি অটোরিক্সা কিনে নিজ এলাকাতেই চালাতেন। সেই সাথে সেলাই কাজ শিখে অবসর সময়ে স্ত্রী শামসুন্নাহার মুন্নীর (৫০) সাথে নিজ বাড়িতে দর্জির কাজ করতেন। এসব কাজ করে পরিবারের যে আয় রোজগার হতো তা দিয়ে এক মেয়েকে নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দেই জীবন অতিবাহিত করছিলেন।


আব্দুল লতিফ সব সময় তার আশে পাশের মানুষদের সাধ্যমত সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছ থেকে জানা যায়, যখন তিনি ড্রাইভিং এর কাজ করেন তখনও তিনি বিনে পয়সায় এলাকার প্রায় ২০-২৫ যুবককে নিজ হাতে ডাইভিংয়ের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সমাজ সচেতন সমঅধিকারে বিশ^াসী আব্দুল লতিফ নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজ স্ত্রীসহ গ্রামের অবহেলিত নারীদের নিয়ে নিজ গ্রাম ঘোনাপাড়ায় ‘ঘোনাপাড়া নারী উন্নয়ন সংগঠন’ গড়ে তুলতে বিশেষ অবদান রাখেন। সব মিলিয়ে আব্দুল লতিফ এক স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনই অতিবাহিত করছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে হঠাৎ স্ট্রোক করে তার এক হাত ও এক পা প্যারালাইসিস হয়ে যায়। অসুস্থতার পর পরিবারের যা সঞ্চয় ছিল তা প্রায় সবটায় চিকিৎসা কাজে ব্যয় হয়ে যায়। পরিবারটি পড়ে এক চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায়। ধারাবাহিক চিকিৎসা সেবার কারণে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তার এই পরিস্থিতিতে তার মেয়ের সাংসারেও তৈরি হয় নানাবিধ সামাজিক সমস্যা। ভূমিহীন একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আব্দুল লতিফ অসুস্থ হওয়ায় পুরো পরিবারের জীবন-জীবিকা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।


আব্দুল লতিফের পরিবারিক অবস্থা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বারসিক সিংগাইর রিসোর্স সেন্টারের সহায়ক রিনা আক্তার ও আছিয়া আক্তার সিংগাইর উপজেলা সমাজ সেবা অফিসে যোগাযো করেন। উল্লেখ্য, বারসিক সবসময় স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করার কারণে সরকারি সেবা পরিসেবা সম্পকের্ সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং সে বিষয়গুলো জনগোষ্ঠী পর্যায়ে অবহিত করার চেষ্টা করেন। এরই অংশ হিসেবে বারসিক সহায়কগণ শামুসুন্নাহার মুন্নীকে সিংগাইর সমাজ সেবা অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। তাদের পরামর্শে আব্দুল লতিফের পক্ষ্যে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার মুন্নী সরকারি অনুদান প্রাপ্তির জন্য সমাজ সেবা অফিসার বরাবার আবেদন করেন। সিংগাইর সমাজ সেবা অফিস আব্দুল লতিফের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে প্যারালাইসিস রোগির চিকৎসা ও অসহায় পরিবারকে সরকারি সহযোগিতার অংশ হিসেবে অনুদান বাবদ মোট ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকার চেক গত ২২ মে ২০২২ আবেদনপত্রের সাথে জমা দেয়া নির্ধারিত একাউন্টে জমা হয়।


টাকার অভাবে পরিবারের সদস্যদের দুমুঠো খাবার যোগান দেওয়ায় যখন যখন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সেই সময়ে এই চরম বিপদের দিনে এই টাকাটা আব্দুল লতিফের পরিবারে সরকারের দেয়া এক অনন্য উপহার হিসেবে এসেছে। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে শামসুন্নাহার বলেন, ‘সরকারের এই আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে আমরা সত্যি আনন্দিত। পরিবারের এই কষ্টের দিনে সমাজ সেবা অফিস যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে তার জন্য সরকার ও সিংগাইর সমাজ সেবা অফিসের প্রতি আমার পরিবার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। সেই সাথে এটি পেতে বারসিক সহায়কগণ যেভাবে সহযোগিতা করেছে তাদেরও অনেক অনেক ধন্যবাদ।’


একটি অসহায় পরিবারের দুঃসময়ে সরকারি সহযোগিতা নিয়ে সিংগাইর সমাজ সেবা অফিস যেভাবে আন্তরিকতার সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। সরকারের এই ধরনের সহযোগিতা দেশের অসহায় মানুষদের আস্থা ও সাহস যোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: