চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও প্রাণ-প্রকৃতির আহাজারি

নেত্রকোনা থেকে রনি খান
উৎপাদনে মানুষের সম্পর্কের ইতিহাসকে পাল্টে দিয়ে সংঘটিত হয় দুনিয়ার প্রথম শিল্প বিপ্লব। মানুষের ‘রাশি রাশি’ উৎপাদন, উৎপাদনের সাথে ভোক্তার সর্ম্পক, উৎপাদনের সাথে উৎপাদকের সম্পর্ক, মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সবকিছুকেই খোলনলচে পাল্টে ফেলে সে বিপ্লব। একই রকমভাবে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে দুনিয়ার চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। মানুষের নজরে নয়া চাকচিক্য নিয়ে হাজির হয় তার নিত্যদিনের দুনিয়া। প্রতিটি বিপ্লবের সময়েই আশা করে হয়েছিলো, দুনিয়া পাল্টে যাবে। যেহেতু উৎপাদন বাড়বে সুতরাং মানুষের বৈষম্য কমবে। মানুষের জীবন হবে সহজ থেকে সহজতর। কিন্তু দুনিয়াতে তিনটি শিল্প বিপ্লবের নিদারুণ ইতিহাস থেকেই আমরা দেখতে পাই, এখনো দুনিয়ার ৯০০ মিলিয়ন শিশু ঘুমাতে যায় অভুক্ত পেটে। খোদ জাতিসংঘের দলিলই আমাদের সামনে হাজির করে বৈষম্যের নিমর্ম চিত্র। দুনিয়াজুড়ে ঘটে যাওয়া তিনটি শিল্প বিপ্লব দুনিয়া থেকে দূর করতে পারেনি ক্ষুধার সমস্যা। বরং মধ্য আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশ, বিশ^ দক্ষিণের প্রত্যেকটি ভূখন্ডে ছড়িয়েছে- ক্ষুধা, মহামারী আর লড়াইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। আমরা দেখতে পাই, শিল্প বিপ্লবের ফসল-রেলগাড়ি আকাশ কালো করে ছুটে যায় জারিয়ায় কিন্তু পূর্বধলা-দূর্গাপুর থেকে উধাও হয়ে যায় বন, পাহাড় আর জলাভূমি, মাছ-গাছ-ধান-গান। তিনটি শিল্প বিপ্লব পার হয়েও পৃথিবীবাসীর জন্য বড়ো সংকট বৈশি^ক উষ্ণতা। কুয়াশাচ্ছন্ন বৈশাখ আর স্টেনগানের অবিরত গুলির মতো বজ্রপাতের নিচে দাঁড়িয়ে এখন আমরা অপেক্ষা করছি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের। আমাদের কাছে তাই প্রশ্ন জাগে এই শিল্প বিপ্লব কি আমাদের?


ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের চেয়ারম্যান ক্লাউস সোয়াব ২০১৩ সালে যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধারণাটি দেন তখন রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। বিষয়টি আরো জোরালো হয় যখন ২০১৬ সালে তিনি একই নামে একটি বই লিখেন। জার্মানের একদল গবেষক তাদের সরকারের জন্য একই বিষয়ের উপর কাজ করে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। শিল্প বিপ্লব এবং প্রযুক্তির নামে অর্থ উপার্জনের এই মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগাতে দুনিয়ার নানান দেশের পুঁজিপতিরা উঠেপড়ে লেগে যান। স্পেসেক্স এবং টেসলার স্বত্ত্বাধিকারী ইলন মাস্ক অন্যান্য পুঁজিপতিদের নিয়ে এই শিল্পবিপ্লবকে কাজে লাগাতে উঠে পড়ে লাগেন। তাদের সেই চেষ্টা আর শ্রমের অনেকগুলো ফসল এখন আমাদের হাতের নাগালেই। যাদের একটাকে আমরা চিনি চ্যাট জিপিটি নামে। বলা হচ্ছে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), ন্যানো টেকনোলজি, থ্রিডি প্রিন্টিং, ইন্টারনেট অব থিংস ইত্যাদি নানান নামের প্রযুক্তি আগামীর দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই প্রযুক্তি দিয়ে মূলত কি করা হবে? উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করা হবে। উৎপাদন ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণকেই মূলত বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পব। এই শিল্প বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি, উৎপাদন ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণ কি মানুষের বৈষম্য দূর করতে পারবে? নাকি তাকে আরো প্রকট করে তুলবে? এই শিল্প বিপ্লব কি আমাদের হাওর-নদী-সাগর-পাহাড়, বন-প্রাণী’র অস্তিত্বকে স্বীকার করবে?


গত তিনটি শিল্প বিপ্লবের ফলাফল আমাদের হাতের নাগালেই। প্রথম শিল্পবিপ্লব ধনী দরিদ্রের ব্যবধানকে এতোটাই প্রকট করে তুলে যে, খোদ ইংল্যান্ড সরকারকেই দরিদ্রদের জন্য রীতিমতো ‘দরিদ্র আইন’ পাশ করতে হয়। আজকের দুনিয়ায় ‘সমাজকর্ম’ নামে যে একটা পেশার জন্ম হয়েছে সেটাও শুরু হয় সেই ‘দরিদ্র’ আইনের হাত ধরেই। গত তিনটি শিল্প বিপ্লবের আমলনামা হাতে নিলে আমরা দেখবো উৎপাদনের নামে ভূমি দখল, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস, উন্নত জীবনের নামে দুনিয়াতে প্রান্তিক মানুষকে করেছে আরো প্রান্তিক। ভূমিকে কেন্দ্র করেই যাদের জীবন সংসার তাদেরকেই আমরা করেছি ভূমিচ্যুত। কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো আইন করে। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘চাষাভূষার কাব্য’তে যেমন বলেছেন, “খোদার জমিন ধনীর দখলে/ গেছে আইনের জোরে/ আমাগো জমিন অইবো/ যেদিন আইনের চাকা ঘোরে।”


বিলাসী জীবনের আয়োজন করতে গিয়ে দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের জীবন বিনাশ করে যে বিপ্লব করা হয়েছে সে বিপ্লব আমরা চাইনি। বরং আমরা বলতে চেয়েছি, এই দুনিয়াটা শুধু মানুষের নয়। এই দুনিয়া গাছের-মাছের, সর্বপ্রাণের। ধনীর দুনিয়ার আরোপিত শিল্প বিপ্লব দুনিয়াতে বেকারত্ব বাড়িয়েছে, মানুষকে ভূমিহীন করেছে, বন উজাড় করেছে নির্বিচারে, দুনিয়াতে তাদের নিয়ন্ত্রণকে করেছে পাকাপোক্ত। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যেখানে বলা হচ্ছে, উৎপাদন ব্যবস্থা হবে স্বয়ংক্রিয়, সেখানে সে সংকট হবে আরো তীব্রতর। দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ যে প্রযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকবিহাল নয় সে প্রযুক্তি মানুষের বন্দিদশাকে করবে আরো প্রকট।


জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশি^ক ক্ষুধা, দারিদ্র আর অপরাধ ইত্যাদি সবকিছু মাথায় নিয়ে বলতেই হচ্ছে, এ বিপ্লব আমাদের নয়। বর্তমান দুনিয়াতে আমরা এমন এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি যেখানে উৎপাদনের চেয়ে মুখ্য বিষয়, বণ্টন। যেখানে মঙ্গলগ্রহে জায়গা খোঁজার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পৃথিবীটাকেই বসবাসের যোগ্য করে রাখা। প্রকৃতিঘনিষ্ঠ মানুষদেরকে তাদের প্রকৃতির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। দুনিয়ার এই সংকটকালে ‘স্বয়ংক্রিয়া উৎপাদন ব্যবস্থা’ কিংবা ‘থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি’ কোন দিশাই দিতে পারবে না। দিশা দিতে পারবে আমাদের প্রকৃতির ভূমিজ’রা। নদীকেন্দ্রিক মানুষেরা যারা জানে নদীকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, প্রকৃতিঘনিষ্ঠ মানুষেরা যারা জানে প্রকৃতি’র সাথে কীভাবে সহাবস্থান করতে হয়। কিন্তু আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রকৃতিঘনিষ্ঠ মানুষের আহাজারি কি তাদের কানে পৌঁছাবে? যদি না পৌঁছায় তাহলে? তাহলে ‘চাষাভূষার কাব্য’র সেই গ্রামীণ বধূটির মতোই বলতে হবে-


‘বলদে ঘোরায় গাড়ীর চাক্কা
নারীর চাক্কা স্বামী
আইনের চাক্কা আমারে দেখাও
সে চাক্কা ঘোরামু আমি’।

happy wheels 2

Comments