সাম্প্রতিক পোস্ট

স্যালোর লবণাক্ত পানিতেই বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে পার্থ সারথী পাল

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর কদমতলা গ্রামের কৃষক গোপাল মন্ডল (৫৫), এলাকার অনেক কৃষকের সাথে তিনিও এবার তার নিজের তিন বিঘা জমিতে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করছেন। কৃষকদের দেয়া তথ্য মতে, এলাকায় আইলার পূর্বে বোরো মৌসুমেও তেমন ধান চাষ হতো না। অল্প কিছু কৃষক নিজস্ব পুকুরের পানি ব্যবহার করে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করতো। কিন্তু আইলা পরবর্তীতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে এলাকার বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানির উৎস খুজে বের করতে টিউবয়েল স্থাপন করে। কিছু এলাকায় খাওয়ার উপযোগি মিঠা পানি পাওয়া যায়। যেমন পদ্মপুকুর ইউনিয়নের এর গড়কুমাপুর, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি, মিরগাঙ্গ, হরিনগর, গাবুরা ইউনিয়নের জেলেখালী। এসমস্ত এলাকার গভীর নলকূপ গুলোর গড় গভীরতা প্রায় ২৪০-৪২০ ফুট। আবার কিছু এলাকার পানি কিছুটা লবণাক্ত হয়। এই পানি কৃষকগন ধান এবং সবিজ চাষে ব্যবহার শুরু করে।

Shallow Tubwell-Pumpমুন্সিগঞ্জের উত্তর কদমতলা গ্রামের প্রায় ১০০ বিঘা জমির বেশিরভাগই বিগত বোরো সময়ে পতিত পড়ে ছিল। অল্প কিছু কৃষক (৫-৭বিঘা) জমিতে বোরো মৌসুমে ধানের আবাদ করতো। কিন্তু আইলার পর থেকে যখন স্যালোর (ইঞ্জিন চালিত স্বল্প গভীর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের যন্ত্র) পানির উৎস পাওয়া গেলো; তখন কৃষক এ পানি ব্যবহার করে বোরো মৌসুমে ধান চাষে আগ্রহী হতে শুরু করে। অন্যের সফলতা দেখে ধীরে ধীরে অনেক কৃষক এ সময়ে ধান চাষ শুরু করে। এ বছর উক্ত গ্রামের প্রায় ৫০-৬০ জন কৃষক ৫০-৬০ বিঘা জমিতে স্যালোর পানি ব্যবহার করে ধান চাষ করছেন। স্থানীয় একটি এনজিও (লিডার্স) এলাকাতে দুটি স্যালো টিউবওয়েল (১৮০ফিট) স্থাপনে সহযোগিতা করেছে। কৃষকগন সংঘবদ্ধ হয়ে এগুলোর (সংস্থার বসানো) ব্যবস্থাপনা করছেন। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও কয়েকজন স্যালো টিউবওয়েল স্থাপন করেছেন।

Boro-Fieldসুকুমার মন্ডল এমনই একজন কৃষক যিনি নিজে স্যালো বসিয়েছেন চার বছর আগে। খরচ হয়েছে ১৭ হাজার টাকা। ৭ হাজার টাকা খরচ স্যালো নলকূপ বসাতে এবং দশ হাজার টাকার খরচ হয়েছে মেশিন কিনতে। তিনিও এবার ধান চাষে ব্যস্ত রয়েছেন। স্যালো মেশিন থেকে সেচ নিতে মালিক মৌসুমে বিঘাপ্রতি ১৫০০/= টাকা করে খরচ নিচ্ছেন। একটি স্যালো হতে ১৫-২০ বিঘা জমি সহজে চাষ করা সম্ভব। বীজতলা তৈরি হতে চাষের শেষ পর্যন্ত ৭-৮টি সেচের প্রয়োজন পড়ে। ধানের জাত হিসাবে বেশিরভাগ কৃষক বিআর-২৮ জাতটিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কেননা, এই ধানের বিঘাপ্রতি ফলন বিগত বছরে ১৮-২০ মণ হয়েছে। এছাড়া বিনা-১০, জামাইবাবু এবং আইটি জাতগুলোও স্বল্প পরিসরে চাষ হচ্ছে। নিয়মিত সার এবং বালাইনাশকও ব্যবহার করেন।

এই এলাকার একটি স্যালোর পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করে ২.৮ পিপিটি পাওয়া যায়। কিন্তু, এই স্যালো থেকে যে জমিগুলোতে সেচ দেয়া হয়েছে- এমন একটি জমির পানির লবণাক্ততা ৫.৫পিপিটি পাওয়া যায়। কৃষকদের মতে, মাটিতে আগে থেকেই লবণ থাকার ফলে জমির পানিতে লবণ বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু গাছ ভালোভাবে স্থায়ী শিকড় হওয়ার (লাগার) আগ পর্যন্ত ২-৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা হবে। স্যালোর পানির লবণাক্ততা কম এবং এ দিয়ে সেচ পানি ধরে রাখলে জমির লবণাক্ততা আর বাড়বে না। চারা গাছে আর কোনো সমস্যা হবে না। তারা মুলত জমি শুকাতে দিবে না এবং পানি ধরে রেখে জমির লবণাক্ততা কম রাখার চেষ্টা করবে।

এলাকার বেশিরভাগ জমি যখন পতিত পড়ে থাকে তখন কৃষকদের এ ধরনের উদ্যোগ পারিবারিক এবং সর্বোপরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আশা করা যায়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: