সাম্প্রতিক পোস্ট

পান বিক্রি করেই চলে মিনু রানীর সংসার

পান বিক্রি করেই চলে মিনু রানীর সংসার

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

নিজের কষ্ট বুকে চেপে, কান্না লুকিয়ে রেখে দিন কাটছে। তীব্র যন্ত্রণায় দুটো স্বান্তনার কথা বলার মতো পাশে কেউ নেই। তিনি এবং তাঁর এক প্রতিবন্ধী ছেলে এই দুজনের সংসার। স্বামী মারা গেছেন প্রায় ৭ বছর আগে। মাথায় টিউমার হয়েছিল, অনেক টাকা খরচ করে চিকিৎসা করালেও সুস্থ হয়নি। সেই থেকে মিনু রানী সাহা একলা পথ চলছেন। নেত্রকোনা শহরের বড়বাজার এলাকার জনতা ব্যাংক এর উল্টো দিকে, হোটেল উত্তরা ও একটি চালের আড়তের মাঝামাঝি জায়গায় দোকানটি অবস্থিত। দোকান বলতে খুব সাজানো গোছানো উপকরণ দিয়ে ভরা এরকম কিছু নয়। বিক্রি করার মতো তেমন কিছুই নেই দোকানটিতে। আছে শুধু ভাঙা একটি কাঠের আলমারি, একটি চেয়ার। একটি বড় থালায় সাজানো কয়েকটি পান, ছোট্ট বাটিতে কেটে রাখা সুপারি আর কয়েক প্যাকেট সিগারেট। মূলধনের অভাবে দোকানে কোনো মালপত্র উঠাতে পারছেন না। তাছাড়া দোকানের আসবাব পত্রও ভেঙে গেছে। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। মেরামত করতে পারেননি।

স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট পানের দোকানে পান বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন। থাকেন ভাড়া বাড়িতে। বাড়ি বলতে এক চিলতে একটি ঘর। প্রতি মাসে ৯০০ (নয়শত) টাকা ভাড়া দিতে হয়। সব সময় পুরো টাকা দিতেও পারেননা। কোনো কোনো মাসে কিছু বকেয়া থেকে যায়। তখন কোন দিন আধপেটা খেয়ে টাকা জমা করে তারপর ভাড়া দেন। তাছাড়া এই দোকানের ভাড়া দিতে হয় প্রতি মাসে ১০০০ (এক হাজার) টাকা। সংসার খরচ, ছেলের পড়ালেখা সব কিছুই করতে হয় এই দোকানের আয় দিয়ে।

IMG_20180117_130050
নেত্রকোন জেলার পুরা কান্দুলিয়া নামক জায়গায় ছিল স্বামীর বাড়ি। বিয়ে হয়েছিল প্রায় ১৫ বছর আগে। তখন তাঁর স্বামী কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। একবার অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পরিশ্রমের কাজ করতে পারেননি বলে সেই কাজ ছেড়ে দেন। অনেক কষ্ট করে এই দোকানটি শুরু করেছিলেন। স্বামী যখন দোকান চালাতেন তখন প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে রাত প্রায় ২টা নাগাদ দোকান চালাতেন। কিন্তু তিনি এখন এত রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে পারেন না। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত দোকানে থাকেন তিনি। নারী হওয়ার কারণে রাত পর্যন্ত থাকতে পারেননা। একদিকে সংসারের কাজ অন্যদিকে সমাজের ভয়। আছে নিরাপত্তার ভাবনা। কারণ স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুর বাড়ির কেউ খোঁজ নেয় না; এমনকি কেউ দেখতেও আসেননা। সেই পরিবারের অনেকেই চায়নি মিনু রানী দোকানে বসুক। ঘরের বউ বাইরে কাজ করবে, সারাদিন বাজারে থাকবে এটা তারা মানতে পারেনি!
তবুও তিনি ছেলে এবং তাঁর বেঁচে থাকার জন্য এই কাজ বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “সারাদিন না খাইয়া থাকলেও কেউ খবর লয়না। ঘরে বইয়া থাকলে আমার চলবো? মাইনষে তো কইবই। আমার কি? আমি খাইট্টা খাই, চুরি করিনা, ভিক্ষাও করিনা”।

ছেলের বয়স ১৩ বছর। সে স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩য় শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে দেড় বছর বয়সেও হাঁটতে পারতোনা। পায়ে কোনো শক্তি ছিলনা। সবাই বলতো পঙ্গু হয়ে যাবে। তখনো মিনু রানীর স্বামী জীবিত ছিলেন। ছেলের এই অবস্থায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেকের পরামর্শে স্থানীয় বেসরকারী হাসপাতালে প্রায় দুই মাস ছেলের পায়ের চিকিৎসা করান। এখন হাঁটতে পারে। তবে অতোটা স্বাভাবিক নয়। কথায়ও জড়তা আছে। আবার খুব বেশি কথা বলে, মাঝে মাঝে কথা আটকে যায়।

এই ছেলের জন্মের পর মিনু রানীর জমজ দুটি সন্তানের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তারা বাঁচেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন,“ভালা অইছে এরা মইরা গেছে। না অইলে এত পোলাপান আমি পালতাম কেমনে? দুইজনেই চলতে পারিনা।” তাঁর মা বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। বাবার বাড়িতেও নেই। নেত্রকোনা শহরে এক বোন থাকেন। মাঝে মাঝে তিনি দেখতে আসেন।

মা ও ছেলের সংসার। ছেলে বাজার করে নিয়ে আসে। ছেলে যখন স্কুলে থাকে তখন দোকানের পান, সংসারের কোনো জিনিস ফুরিয়ে গেলে তিনিই কিনে আনেন। প্রতিদিন মাছ খেতে পারেননা। নিরামিশ, সব্জী আর ভর্তা ভাজি খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করেন। রান্না করেন কেরোসিন এর চুলায়। এক লিটার তেলের দাম ৭০ টাকা, যা দিয়ে তিনি চার দিন রান্না করতে পারেন। কোনো দিন রান্না শেষ হওয়ার আগেই যদি চুলার তেল ফুরিয়ে যায় তবে না খেয়েই ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

ছেলের একটি প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য প্রায় দুই বছর যাবৎ পৌরসভায় যোগাযোগ করছেন। কার্ডটি এখনো হয়নি। তিনি বলেন, “এই কার্ড দিয়া কিছু টাকা পাইলে অন্তত ছেলের পড়ার খরচটা চালাইতে পারতাম। পান বেচা সবসময় এক রকম থাকেনা। এখন দিন ছোড, তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা অইয়া যায়। তাই বেচা বিক্রি কম। রাইতে বাজারে মানুষ বেশি অয়। কিন্তু আমি তো রাইতে দোকান খোলা রাখিনা। তাই বেচাও অয়না।” তিনি আরও বলেন, “তবে ঈদ বা পূজার সময় বেচা কেনা ভালই অয়। আবার গরমের দিনে সন্ধ্যা অয় দেরিতে। যে কারণে দোকান খোলা রাখার সময় বেশি পাওয়া যায়। এই দোকানই আমার ভরসা। যেইদিন বেশি বেচা অয় সেইদিন একটু ভালা বাজার করি। ছেলেডারে ভালো মন্দ রাইন্ধ্যা খাওয়াই। পৌষ সংক্রান্তির আগে বেচা বিক্রি কম অইছে। ছেলেডারে দুইডা পিডা (পিঠা) বানাইয়াও খাওয়াইতে পারিনাই।”

মিনু রানীর স্বামী যখন মারা যান তখন ছেলের বয়স ছিল ৬ বছর। বাবার কথা রাতুলের খুব বেশি মনে নেই। ঘরে টানানো বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সে তার কষ্টের, অভিমানের কথা বলে। বাবা না থাকায় পূজার সময় তার নতুন জামা কেনা হয় না। বাবার কাঁধে চড়ে পূজা দেখতেও যাওয়া হয়না। বাবা থাকলে তো তাদের এত কষ্ট হতোনা। নিজের অনেক কষ্ট হলেও মিনু রানী কাঁদতে পারেননা, পাছে ছেলে কান্না শুরু করে।

সহায় সম্বলহীন একজন নারী অনেক সংগ্রাম করে টিকে আছেন। কেউ সহযোগিতা না করলেও তাঁরা চলতে পারবেন। কারণ তাঁদের আছে দৃঢ় মনোবল আর নিজেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা।

এখানে উল্লেখ্য যে, বারসিক’র পক্ষ থেকে নেত্রকোনা পৌরসভায় যোগাযোগ করা হয়েছে, যাতে করে ছেলেটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডটির অনুমোদন হয়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: