সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষায় মিজানুর রহমান

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

জলবায়ু প্রতিনিয়ত পরিবর্তনে পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ও দেশগুলো সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি অন্যতম প্রধান দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি দুর্যোগ কবলিত। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় স্থানীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ উপযোগি বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো সর্বোপরি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এই পরিবেশ উপযোগী বনায়ন দারুণ অবদান রাখতে পারে।

মূলত পরিবেশ উপযোগী বনায়নের গুরুত্ব অনুধাবন করে উপকূলীয় এলাকায় সরকারি ও বেসরকারী সমন্বিত উদ্যোগে সবুজ বেস্টনী গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে সামাজিক বন বিভাগ, বিশেষ করে এই বন বিভাগের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। শ্যামনগর উপজেলায় গড়ে ওঠা বনায়নকে সমন্বয় করেছেন এই বনবিভাগের কর্মকর্তা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বন পরিবেশ মন্ত্রণালয় এর অধীনে সামাজিক বনবিভাগ ১৯৯০ সাল থেকে উপকূলীয় শ্যামনগর এলাকায় কার্যক্রম শুরু করে। উপজেলা সামাজিক বন বিভাগ এর শ্যামনগর উপজেলায় একজন কর্তব্যনিষ্ঠ ও দায়িত্ব পরায়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফরেষ্টার এমএম মিজানূর রহমান। ২০১০ সালে শ্যামনগর উপজেলার সামাজিক বনায়ন কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করার পর তিনি এলাকা উপযোগি বনায়ন সৃষ্টি ও সুরক্ষায় বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। উপজেলাব্যাপী বনায়নে বিশেষ অবদান রাখায় শ্যামনগর উপজেলা সামাজিক বনবিভাগের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জাতীয়ভাবেও পুরষ্কৃত হয়েছেন।
P (1)-1
সামাজিক বনবিভাগের বনায়নের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাজেট অনুযায়ী সরকারি প্রশাসন, বেসরকারকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট জনকে অর্ন্তভুক্ত করে মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে বনায়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়। শ্যামনগর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে “উপকূলীয় এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ও বাঁধ সংলগ্ন চর বনায়ন শীর্ষক প্রকল্প” এর আওতায় নদীর চর ও বাঁধের উভয় পাশে বনায়ন করা হয়। নদীর চরে ম্যানগ্রাভ প্রজাতির চারা কেওড়া, গোলপাতা, হরখোজা, বাইন, কাঁকড়া ও গরান প্রভৃতি লাগানো হয়। বাঁধের পাশে স্থানীয় প্রতিবেশ উপযোগী বাবলা, নিম, খদি, খেঁজুর, ধনচে, আকাশমনি, কড়ই, রেইনট্রি, মেহগনি, তেতুল, শিরিষ, পরেশ পেপুল, পেয়ারা, নারকেল প্রভৃতি চারা ও বীজ এর মাধ্যমে নদীর চর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, খালপাড় ও বসতভিটায় প্রতিবেশীয় বনায়ন গড়ে তোলা হয়।

এভাবে শ্যামনগর উপজেলা সামাজিক বনবিভাগ স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে এ পর্যন্ত যেসব বনায়ন গড়ে উঠেছে  সেগুলো হলো: আটুলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়ীয়া, মাগুরাকুনী, গাইন পাড়া, গ্রামের চুনা নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, বিড়ালক্ষ্মী গ্রামের খোলপেটুয়া নদীর প্রায় আধা কিলোমিটার চরে ম্যানগোভ বনায়ন, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা ও পদ্মপুকুর গ্রামের খোলপেটুয়া নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের মালঞ্চ নদীর প্রায় আধা কিলোমিটার চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্প ও পানখালী আশ্রয়ন প্রকল্পের প্রায় দুই কিলোমিটার নদীর চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, রাস্তা এবং বসতবাড়ির আঙিনায় ফলজ ও বনজ গাছের বনায়ন, আড়পাংগাশিয়া খাল পাড় প্রায় আধা কিলোমিটার বনজ বৃক্ষের বনায়ন, দূর্গাবাটি গ্রামের খোলপেটুয়া নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার নদীর চরে ও পানখালী এবং আবাদচন্ডিপুর গ্রামের চুনা নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার চরে ম্যানগোভ বনায়ন। এছাড়াও শ্যামনগর সদর ইউনিয়নের হায়বাতপুর, ইসমাইলপুর, বাদঘাটা, যাদবপুর, চন্ডিপুর, নকিপুর গ্রামে পারিবারিক পর্যায়ে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ এবং কল্যাণপুর গ্রামের মাদার নদীর প্রায় আধা কিলোমিটার চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে পারিবারিক পর্যায়ে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা ও বীজ বিতরণ এবং প্রায় দুই কিলোমিটার খালপাড়ের রাস্তা বনায়ন গড়ে তোলা হয় উপজেলা সামাজিক বনবিভাগের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
P (2)-1
উপজেলায় গড়ে ওঠা প্রতিবেশ উপযোগী বনায়ন সম্পর্কে এমএম মিজানূর রহমান বলেন,“ছোট থেকেই গাছকে ভালোবাসতাম। সামাজিক বনবিভাগের সাথে যুক্ত হওয়ার পরই আমি বনায়নের প্রতি বেশি করে নজর দিতে থাকি। চাকরির সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছি। উপকূলীয় ভোলা জেলাতে ও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। শ্যামনগরে যোগদানের পর কাজের ব্যাপকতা বাড়ে।” তিনি আরও বলেন, “উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আমি এলাকা উপযোগি বনায়ন করতে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় ছিল বলেই এ কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। ” তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি, উপজেলা সামাজিক বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সমন্বয় ও অর্ন্তভুক্ত করে এলাকা উপযোগি, ফলজ, বনজ, ভেষজ, কাঠ জাতীয় এবং শোভাবর্ধনকারী গাছের বনায়ন গড়ে তোলা যেমন সম্ভব তেমনিভাবে এগুলো রক্ষা ও পরিচর্যা করাও সহজ হবে। আশা করছি গড়ে ওঠা বনায়নকে পরিচর্যা করতে নিরলসভাবে সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করবে।”
উল্লেখ্য যে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত উপজেলা সামাজিক বনবিভাগ ৩১৪ হেক্টর জায়গাজুড়ে বনায়ন গড়ে তুলেছে। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে প্রায় ৫০ হেক্টর জায়গাতে বনায়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। উপকুলীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে পর্যায়ক্রমে উপজেলার সকল নদীর চর ও উপযুক্ত স্থান বনায়নের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে উপজেলা সামাজিক বনবিভাগের। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষা, নদী ভাঙন রোধ, জ্বালানি সংকট নিরসন ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ তথা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশের উপকূলীয় নদীর চর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, খালপাড় ও বসতভিটায় প্রতিবেশীয় বনায়ন করে শ্যামনগর উপজেলা সামাজিক বনায়ন কর্মকর্তা যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সকলের জন্য অনুসরণীয়।

happy wheels 2
%d bloggers like this: