সাম্প্রতিক পোস্ট

শাকের মধ্যে আছে অনেক গোপন গুনাগুণ

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে চম্পা মল্লিক

সরমা রানী মন্ডল (৪২)। স্বামী : বিমল মন্ডল (৪৬)। তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়েই মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে বসবাস করতেন তারা। মেয়ে তিনজনকেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, ছেলেটিকে অনেক কষ্ট করে একমাত্র আয়ের উৎস কৃষিকাজের উপর দিয়েই পড়াচ্ছেন। স্বামী –- স্ত্রী দুজনেই অনেক পরিশ্রমী। তারা বাড়িটিকে সবজি দিয়ে সাজিয়ে রাখেন সবসময়।


সরমার ভাই বোনেরা ও কৃষি কাজ করেন, তবে তাদের সবার থেকে সরমা বেশি সুন্দরভাবে, নতুন নতুন পদ্ধতি ফলো করে সবজি চাষ করেন। তাঁর বাড়িতে অচাষকৃত সবজি, ঔষধি গাছ সহ রয়েছে নানা ধরনের শাক সবজি। এর মধ্যে একটি সবজি হলো কুলেখাড়া। এই সবজিটি তিনি বাড়িতে লাগিয়ে রেখেছেন প্রায় ১২ বছর ধরে। সবজিটিকে ব্যবহার করেন তিনি বিভিন্নভাবে। কখনো সবজি আকারে, কখনো চপ, কখনো তেতো, কখনো ভর্তা, কখনোবা ঝোল আবার কখনো রস বের করে আখো চিনি দিয়ে মিশিয়ে ঔষধি হিসেবে। সরমা রানী এই শাকটির বহু গুণাবলী জানেন। বিশেষ করে রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে এটি খুবই উপকারী। তিনি মনে করতেন অধিকাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। তাই তিনি স্থানীয় নারীদেরকে এই শাকের উপকারীতা জানান এবং নিজ বাড়ি থেকে এই শাক সবাইকে দেন।


তবে এটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যখন তার মেজো মেয়ে ঝখঊ নামক একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। টানা তিনটি বছর আক্রান্ত ছিলেন তার মেয়েটি। এ সময় তিনি শ্যামনগর, সাতক্ষীরা, খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। অবস্থার বিশেষ কোন উন্নতি না দেখে একসময় সন্তানের প্রতি প্রায় ভরসা হারিয়ে ফেলছিলেন। মাসে প্রায় দুই থেকে তিনবার রক্ত দেওয়া লাগতো তার মেয়েকে। কোথায় পাবে এত টাকা, আবার সন্তানকে বাঁচানোর দৃঢ় প্রচেষ্টা ছিলো তার। খেয়ে না খেয়ে মেয়ের চিকিৎসার খরচ যোগাড় করতেন তারা। সর্বশেষ যখন সরমা রানীর মেয়েকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয়, তখন ডাক্তার তাদেরকে জানান, রোগী প্রচুর পরিমানে রক্ত স্বল্পতায় ভুগছেন। তাই বাড়িতে নিয়ে বেশি পরিমাণে জল ও শাকসবজি খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। বাড়িতে ফিরেই সরমা রানী ভাবলেন, ডাক্তারের ঔষধ তো চলছে কিন্তু মেয়ের শরীরের কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা। এভাবে রক্ত দিয়ে কতদিন পারবো!


এরপর তার মাথায় কুলেখাড়া শাকের কথা আসে। মনে করলেন, একসময় আমার বোন ও রক্তস্বল্পতা থেকে বেঁচে ফিরেছেন এই শাকের গুণে। আমিও চেষ্টা করবো। এক কথায় তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, যে শাকটির উপকারের কথা আমি রক্তস্বল্পতার রোগী ও গর্ভবতী মা সহ এলাকার সমস্ত মানুষকে জানাচ্ছি, চিনতে শেখাচ্ছি, আজ থেকে নিয়ম করেই আমি তা আমার মেয়েকে খাওয়াবো। এরপর থেকে তিনি টানা তিনমাস এই শাক প্রতিদিন সকালে ও দুপুরে ভর্তা, ঝোল যেভাবেই খেতে পারে সেভাবেই খাইয়েছেন। টানা তিন মাস পরে রোগীর শরীর স্বাভাবিক হতে থাকে। বিছানা থেকে উঠতে না পারা মেয়েটি আবার নিজে নিজে উঠতে পারলো, শুধু তাই নয় স্বামীর বাড়ি থেকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং কতটা অবহেলার পাত্রী হয়ে গড়ে উঠা সেই মেয়েটি আবার ফিরে পেলো তার স্বামী, সন্তান ও সংসার। সেখান থেকে আজ ও তার মেয়েটিকে রক্ত দেওয়া লাগেনি। বাস্তব শিক্ষা থেকে তাই সরমা রানী বলেন, সঠিকভাবে যদি প্রতিটি শাকের গুনাগুণ জানা যায় এবং সঠিক নিয়মে পালন করা যায় তাহলে অবশ্যই কঠিন রোগ থেকে ও মুক্তি পাওয়া যায়।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: