Posted in

অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও এক টুকরো জমিতেই সাফল্য শাহানাজের

নেত্রকোণা থেকে পার্বতী সিংহ

মানুষের জীবনের কোন পরির্তন চাইলে অদম্য ইচ্ছা শক্তিটুকুই যথেষ্ট। ইচ্ছা শক্তিই সাফল্যের পথ তৈরি করে। ইচ্ছা শক্তির জোরেই পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষের সাফল্যের শীর্ষে আরোহনের কাহিনী আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও সামান্য জমি ব্যবহার করে জীবনের বাঁক পরিবর্তনে সাফল্য অর্জনকারী এমনই এক নারী নেত্রকোনা জেলার চল্লিশা ইউনিয়নে শাহনাজ পারভীন (৩৬)।

শাহনাজ পারভীনের স্বামী মো. সেলিম মিয়া একজন কাঠ মিস্ত্রি। শাহনাজ পারভীন কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালায়। বিয়ের আগে মা-বাবার সংসারে থাকতেই মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার কাছেই কৃষি কাজে তার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে সাথে কাজ করে গাছের প্রতি তার মায়া জন্মায়। বাল্য বয়সেই মা-বাবা তার বিয়ে দেয়। বিয়ের চার বছর যেতেই তিনি ৩ সন্তানের মা হন। স্বামী অন্য জেলার বাসিন্দা ছিল বিধায় নেত্রকোনা এলাকায় আয়-রোজগারের ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। বাসা ভাড়া করে অন্যের কাঠের দোকানে মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। দোকানে কাজ করে যে উর্পাজন হত তা দিয়ে খুব কষ্টে ৫ জনের সংসার চলত।
শাহনাজ নিজে অনেক কাজ জানা সত্ত্বেও এত কষ্ট করে সংসার চালাতে হবে এটা তিনি মেনে নিতে পারছিল না। তাই তিনি স্বামীর পাশাপাশি পরিবারের আয় বৃদ্ধির জন্য অন্য কোন কাজ করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক পাতানো বোনের সাথে তার ইচ্ছার কথা সহভাগিতা করেন। বোনই তাকে পাশের গ্রামের সেলাই কাজে দক্ষ একজন নারীর খোঁজ দেন, যিনি আগ্রহী নারীদেরকে সেলাই এর কাজ শেখান। শাহানাজ সেই গ্রামে গিয়ে ঐ নারীর সাথে দেখা করে নিজের আগ্রহের কথা জানান এবং সম্মতি পেয়ে ১০৫০ টাকা চুক্তিতে সেলাইয়ের কাজ শেখা শুরু করেন।

New Microsoft PowerPoint Presentation
সেলাই কাজ শেখার পাশাপাশি অন্যের সামান্য জমিতে (শুধুমাত্র মাঝে মাঝে সবজি দেয়ার বিনিময়ে) শাহানাজ বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ, হাসঁ-মুরগি পালন ও লাকড়ির (জ্বালানি) ব্যবসা আরম্ভ করেন। লাকড়ি ব্যবসায় টাকা না নিয়ে সবজি বাগানের বেড়া ও মাঁচা তৈরির জন্য সমমূল্যের বাঁশ ও কঞ্চি নিয়ে আসেন। এভাবে সামান্য জমিতে সবজি চাষ করে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে তিনি হাসঁ-মুরগি কিনে লালন-পালন করতে থাকেন। সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন ও সেলাই কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কেটে যায় শাহানাজ এর। পারিবারিক অর্থ কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজে কিছু করার ইচ্ছা তাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত।

চার বছর সেলাই কাজ শেখার পর একটি কাপড়ের দোকানে বিভিন্ন ধরণের কাজ করতেন, যেমন- জামা ও প্যান্টের বোতাম সেলাই, জামার হাতা সেলাই ইত্যাদি। শাহানাজ দোকানে সেলাই কাজ করে পাওয়া টাকা, সবজি, ডিম ও হাঁস-মুরগি বিক্রির টাকা জমিয়ে নিজে একটি সেলাই মেশিন কেনেন। তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ শাহনাজ নিজেই বহন করেন। দক্ষতার সাথে সেলাই এর কাজ করায় গ্রামের অধিকাংশ নারী নিজেদের ও সন্তানদের পোষাক শাহানাজকে দিয়েই তৈরি পরমায়েশ দিতে থাকে। অন্যদিকে দোকানে রাজমিস্ত্রির দায়িত্ব পাওয়ায় স্বামী উর্পাজনও বেড়ে যায়। শাহানাজ নিজের উপার্জন ও স্বামীর আয়ে ধীরে ধীরে তাদের পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে।

23
শাহনাজ পারভীন দুই শতাংশ জমি কিনে ঘর তৈরি করেছেন এবং ৭০ শতাংশ ফসলী জমি কিনে সেখানে আবাদ করছেন। এক মেয়ে ও এক ছেলে এসএসসি পাশ করেছে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান তিনি। অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও তিনি নিজের পরিবারের জন্য বছরব্যাপী সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করেন। নিজে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন করায় বাজার থেকে খুব কম জিনিস তাকে ক্রয় করতে হয়। অন্যের উপর নির্ভরশীলতাকে তিনি খুব অপছন্দ করেন। সবজি করার মত জায়গা না থাকা সত্বেও অন্যের এক খন্ড পতিত জমি চেয়ে সেখানে তিনি বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করেন। ছোটবেলায় মায়ের কাছে বাঁশ-বেতের কাজ শেখার সুবাদে ঘরের প্রয়োজনীয় বাঁশের জিনিস তিনি নিজেই তৈরী করেন। তার ইচ্ছা তিনি কখনো কারো কাছে থেকে বা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিবেন না, ঋণ নেয়া ছাড়াই নিজে স্বাবলম্বী হবেন। গ্রামের অন্য নারীদের নিজের দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের কাজ শেখাবেন এবং সন্তানকে যতদূর সম্ভব লেখাপড়া করাবেন।

একান্ত ইচ্ছা শক্তিই শাহনাজের জীবনে পরিবর্তন ঘটিয়ে পারিবারিকভাবে আর্থিক সাফল্য ও ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনে সহায়তা করেছে। শাহানাজ গ্রামের অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। শাহনাজের মত গ্রামের অনেক দরিদ্র নারী রয়েছে, যারা পরিবারের রান্না ও সন্তানদের দেখাশুনার কাজ করার পর বাকিটা সময় অলস বসে থাকেন। এসব নারীরা যদি শাহানজের মত পরিবারের আয় বৃদ্ধির জন্য পারিবারিক গন্ডির মধ্যেই ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাহলে হয়তো গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। আর নারীরাও তাদের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি পরিবারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। নারীদেরকেও আর শুনতে হবেনা সেই কথা ‘মহিলারা কোন কাজ করেনা। তারা শুধু খায় আর ঘুমায়’।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.