Posted in

ফুলের হাসিতে কৃষক ফারুক হোসেন

মানিকগঞ্জ সিংগাইর থেকে শিমুল বিশ্বাস

মানুষ হিসাবে একটি ফুলের চারা লাগাইনি এরকম খুব বিরল হলেও ফুলের চারা লাগিয়ে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে এমন মানুষ আমাদের সমাজে এখনোও খুব এটা দেখা যায় না। তবে ফুল চাষ করে যে সংসার চালানো সম্ভব তার প্রমাণ রেখেছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চরজামালপুর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী যুবক ফারুক হোসেন। পিতা মোতালেব হোসেন বয়সের কারণে তেমন কাজ করতে পারেন না। তাই বড় ভাইয়ের সাথে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন ফারুক হোসেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া বেশি করতে পারেননি তিনি। মাত্র নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে দর্জি কাজ শিখেছিলেন। তবে সেখানে আয় রোজগার কম হওয়ার কারণে পৈতৃক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তরুণ কৃষক ফারুক হোসেন। তিনি মনে করেন, অন্যান্য কৃষি ফসলের চেয়ে ফুল চাষ তাকে বেশি সফলতা এনে দিয়েছে। ফারুক হোসেনের বড় ভাই ১০৫ শতাংশ পৈত্রিক জমিতে মুলা, লাউ, লালশাক, পালংশাক চাষ করেন। সেখানেও লাভ হয়। তবে মা-বাবাসহ ৮ সদস্যর পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ফারুক হোসেন বিকল্প কৃষি কাজ হিসাবে নিজেকে পুরাপুরি নিয়োজিত করেছেন ফুল চাষে।

IMG_20190923_105348
মাত্র সাত মাস আগে তিনি ২৫ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচশত জারবেরা ফুলের চারা এনে ৪৫ শতাংশ বন্ধকী জমিতে রোপণ করেন। এক মাস পর থেকেই গাছে ফুল ফুটতে শুরু করে। প্রথম মাসে তিনি ৬ হাজার ফুল বিক্রি করতে পারেন। প্রতিটি ফুলের মূল্য পাঁচ থেকে সাঁত টাকা দরে বিক্রি হয় বলে তিনি জানান। সেই হিসাবে প্রথম মাসেই ৩৬ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেন। তারপর থেকে তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এর মধ্যে সার, ঔষধে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। একটি জারবেরা ফুল গাছ ৫ থেকে ৭ বছর ফুল দিয়ে থাকে বলে তিনি জানান। তিনি মনে করেন, দিন দিন ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ ফুলকে ভালোবাসেনা এমন কোন মানুষ নেই যে ফুল ভালোবাসে না। তাছাড়া বিভিন্ন বিয়েসহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফুলের বিকল নেই। তাই প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে তার কাছে ফুলের চাহিদা আসে। ফারুক হোসেন শুধু ঠিকানা মত বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে ফুলগুলো পাঠিয়ে দেন। ফুল ক্রেতা মোবাইল একাউন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে তার বাগান থেকে প্রতিদিন লাল সাদা, হলুদ, পিংক, ম্যাজেন্টা কমলা সহ ৬ রংয়ের দুইশত থেকে আড়াইশত ফুল তোলা সম্ভব হয়, যার বাজার মূল্য ১২শ’ থেকে ১৫ শ’ টাকা।

বিবাহিত জীবনে ২ বছর বয়সী একজন কন্যা সন্তানের জনক ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ‘ফুল চাষ আমার সংসারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছে। এখন আর আমাকে সংসারের ভার বহন করতে কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় না বৃদ্ধ পিতামাতার চাহিদামত সেবাযত্ন করতে। হিমশিম খেতে হয় না শিশু কন্যার আবদার মেটাতে।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি কৃষি কাজকেই পুঁজি করে কন্যা সন্তানকে আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ফারুক হোসেন কৃষকের সন্তান। পিতার কাছ থেকেই তাঁর কৃষি কাজ শেখা। তাই ভালোবাসেন কৃষিকাজকে। কৃষিকে ভালোবাসার কারণেই দর্জি কাজ ছেড়ে কৃষিপেশা বেছে নিয়েছেন তিনি। কৃষির প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ আছে বলেই তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন যে, ‘আমাগো দেশের মানুষ ট্যাকা কামাইবার জন্য বিদেশে যায়। অনেক ট্যাকা পয়সা খরচ করে বিদেশের যাওয়ার জন্য। অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে যায়। আবার বিদেশে কি কাম করে তা অনেকেই জানে। অথচ আমরা যারা যুবক পোলাপাইন আছি তারা যদি নিজেগো দ্যাশে ভালোমত কাম করি তাহলেও ভালোভাবে বাঁচবার পারি। কেডা কইছে কৃষি কামে লাভ নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ বিদেশে যাউনের বদলে দ্যাশে কৃষি কাম কইর‌্যা কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার ট্যাকা কামাইবার পারে। আসল কথাডা হইলো যেকোনো কাম ভালোভাবে বুইজ্যা শুইন্যা করুন লাগবো। সেইড্যা কৃষি কামই হোক আর ব্যবসা বাণিজ্যই হোক।”

পরিশেষে এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, আমাদের দেশের যুব সম্প্রদায় যদি শুধু চাকরির কথা না ভেবে নিজ দেশের মধ্যে এ ধরনের খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ, সাহস ও মনোবল থাকলে তরুণ কৃষক ফারুক হোসেনের মত তিনিও হাসতে পারেন আত্মতৃপ্তির হাসি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.