Posted in

কিশোরীদের উদ্যোগে গড়ে উঠল জ্ঞানভিত্তিক গ্রামীণ পাঠাগার

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী
দশজনে মিলে কাজ করলে যে কোন কাজে সফলতা পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন অনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা যুব, কিশোর-কিশোরী ও জনসংগঠনগুলো নিজেদের ও এলাকার উন্নয়নে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন উদ্যোগ সফলতার জন্য এলাকায় বেশ জনসমাদৃত হয়েছে। এমনই একটি উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করে সফল্য পেয়েছে নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের ফচিকা গ্রামের অগ্রযাত্রা কিশোরী সংগঠন। সংগঠনটি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশগত ও শিক্ষা সমস্যা দূরীকরণে (বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদক), বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ বেশ কয়েক বছর যাবত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটি গ্রামের সকল বয়সের শিক্ষার্থী ও জ্ঞান পিপাসুদের জ্ঞার্নাজনে জ্ঞানভিত্তিক একটি গ্রামীণ পাঠাগার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাঠাগারটির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এলাকার সকল বয়সের শিশু, কিশোর, যুব ও নারী-পুরুষদের মধ্যে বই পড়া ও জ্ঞার্নাজনের অভাস গড়ে তোলা। পাঠাগারটিতে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও নেত্রকোনা ইতিহাস সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরণের বই রাখা হয়েছে। প্রতিদিন এলাকার সকল বয়সের জনগোষ্ঠী পাঠাগারটিতে উপস্থিত হয়ে এসব বই পড়ে নিজের জেলা, দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে এবং দৈনিক আড্ডায় বসে নিজেদের ও এলাকার বিভিন্ন সমস্যা পরস্পরের সাথে সহভাগিতা করতে সক্ষম হবে। ফলে এলাকার সকল বয়সের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরস্পারিক সম্পর্ক সৃষ্টি হবে এবং পারস্পারিক নির্ভরশীল সমাজ গঠন সুনিশ্চিত হবে।


এই প্রসঙ্গে সংগঠনের সভানেত্রী শেফালি আক্তার জ্ঞানভিত্তিক পাঠাগার গড়ে তোলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘বর্তমান গ্রামীণ শিক্ষার ব্যবস্থা ভালো নেই, শুধু পাঠ্য পুস্তকের মধ্যেই শিক্ষা সীমাবদ্ধ। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই সম্পর্কে অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের তেমন কোন ধারণা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূর্বের ন্যায় সাধারণ জ্ঞান অর্জনের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পাঠ্য বইয়ের বাইরের কোন ধরণের বই পড়ার আগ্রহ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা নৈতিক শিক্ষার বড়ই অভাব। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার উন্নয়নে তেমন গুরুতও¡ প্রদান করা হয় না। নৈতিক শিক্ষার অভাবে বর্তমান যুব সমাজ চলে যাচ্ছে বিপথে, তারা মাদক গ্রহণ, ইভটিজিং ও জুয়া খেলার মত সামাজিক অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে সমাজটাকে অনিরাপদ করে তুলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমাজে মানুষে মানুষে রেষারেষি, হানাহানি, মারামারি, খুনাখুনি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মত সামাজিক অশান্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বর্তমান প্রজন্মকে বই পড়ায় অভ্যস্ত করে জ্ঞানার্জনে ধাবিত করে এসব সামাজিক অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতেই আমরা এই পাঠাগারটি গড়ে তুলেছি। আমাদের গড়ে তোলা এই কিশোরী তথ্য কেন্দ্রতে কিশোরী, যুবরাসহ সকল বয়সের নারী-পুরুষরাও জ্ঞার্নাজনের সুযোগ পাবে। পাঠাগারে বিভিন্ন ধরণের লেখা বই রাখার উদ্যেগ নেয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে লাবণী আক্তার বলেন, ‘শহরে সকল বয়সের জ্ঞান পিপাসীদের জন্য পাঠাগার থাকলেও গ্রাম পর্যায়ে কোন পাঠাগার নেই, যেখানে গ্রামের কিশোর-কিশোরী, যুব ও প্রবীণ ব্যক্তিরা বসে বই বা পত্রিকা পড়ে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান চর্চা করতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে পাঠাগার না থাকায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে যুব সমাজ বই পড়ে জ্ঞার্নাজন ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই আমরা সংগঠনের উদ্যোগে একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছি। আমাদের সকলেরই বই পড়ার অভ্যাস কম, পরীক্ষায় পাশ করতে হবে বলে আমরা শুধু পাঠ্য বই পড়ি। বেশির ভাগ যুব জনগোষ্ঠী মোবাইল ফোনে ফেইসবুক ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মোবাইল আসক্তি থেকে এ প্রজম্মকে ফিয়ে আনতে আমরা প্রতিদিন বিকালে ২ঘন্টা করে পাঠাগারে এসে বই পড়ার অভ্যাস করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংগঠনের সকল সদস্য সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেরা এবং অন্যদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে পাঠাগারে রাখছি। বর্তমানে আমাদের পাঠাগারের সংরক্ষণে পাঁচ ধরণের ৩৫টি বই এবং তিন ধরণের লিফলেট রয়েছে। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক বাণী ও তথ্যসমৃদ্ধ পোস্টার ফেস্টুন রয়েছে, যা থেকে আমরা সেসব বিষয়ে জানতে পারছি। আমরা এই বাণীটি প্রতিটি গ্রামের যুব জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচার করতে চাই যাতে সকল গ্রামে তারাও এমন পাঠাগার গড়ে তুলে সকলকে সমাজের উন্নয়নে একই বন্ধনে বাঁধতে পারে। নৈতিক শিক্ষায় সকলে শিক্ষিত হয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বয়স, শ্রেণী ও পেশা নির্বিশেষে সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ, পারস্পারিক সহযোগিতাপূর্ণ ও আন্তঃনির্ভরশীল বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।’


এই সংগঠনটি শুধু পাঠাগার স্থাপন নয় পাশাপাশি এলাকার যুব সমাজকে প্রকৃতির সাথে পরিচয়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ এবং নিজ দেশ ও জেলার বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতি মাসে ‘আমার দেশ ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি, আমার জেলা নেত্রকোণার প্রাণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, বিশিষ্ট ব্যক্তি, ঐতিহ্যবাহী স্থান ও প্রত্নতত্ত্ব, নারীদের বয়োঃসন্ধিকালিন স্বাস্থ সেবা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজ করে থাকে। এছাড়াও সংগঠনটি যুব, নারী ও কিশোরীদের কৃষি কাজে যুক্ততা বৃদ্ধি এবং কিশোরীদের নেতৃত্বে আমন মৌসুমে এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনে প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা, শস্য ফসলের বীজ সংরক্ষণ, নদী রক্ষায় প্রচারণায় অংশগ্রহণ, সামাজিক সমস্যা ও সাম্প্রতিক বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
এলাকার যুবদেরকে বিশেষভাবে যুবতীদেরকে জেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরে স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী বিভিন্ন কারিগরী ট্রেডে ভর্তি করে দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে সংগঠনটি। যুবদেরকে নিয়মিত পাঠাগারে গিয়ে বই পড়া চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ ও রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ থেকে বিরত রেখে দক্ষ ও উন্নত যুবশক্তি গড়ে তুলে টেকসই পরিবার, সামাজ ও দেশ গঠনের প্রত্যয়ে উদ্দীপ্তকরণে কাজ করছে। কিশোরী সংগঠনের সদস্যদের গৃহীত এ ধরণের উন্নয়ন উদ্যোগ এলাকার সকলের নিকট বেশ প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম হয়েছে। সংগঠনটি পার্শ্ববর্তী গ্রামেগুলোতেও অনুরূপ সংগঠন গড়ে তোলার জন্য কিশোরী ও যুবদের উদ্বুদ্ধ করে ছোট ছোট বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণে সহযোগিতা করে আসছে।


প্রতিটি এাঅকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও উন্নয়নে যুব শক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন অবধারিত। অগ্রযাত্রা কিশোরী সংগঠনের ন্যায় প্রতিটি গ্রাম পর্যায়ে ব্যক্তি, সংগঠন এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে যুব সমাজকে আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ থেকে সকল অপরাধ ও সহিংসতা দূরীভূত হবে হবে বলে বিশ্বাস করি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.