Posted in

বনে ছুটবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল টিয়াটি

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি খাঁচাটির চারপাশ পুরাতন একটা লুঙ্গি দিয়ে ঢাকা। ভিতরে কি আছে সহসা বুঝবার উপায় নেই। কাঁধে আনুমানিক দশ ফিটের মতো লম্বা সাত খন্ড বড় বড় পোড় বিশিষ্ট চিকন মসৃন বাঁশের টুকরো বা ললা। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় সাত ললা। ললাগুলোর গোড়ার দিকটা ফেটে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে টেপ দিয়ে মোড়ানো। কাঁধের বাঁশের আটি (সাত ললা)র পেছনে ঝুলছিল আবৃত খাঁচা ও প্লাস্টিকের একটি ব্যাগ। হাতে মাথায় আল বিশিষ্ট লোহার চিকন শিক। সাত ললাবাহী শ্যাম বর্ণের এই মানুষটির নাম গোপন চন্দ্র বেদ (৪৫)। পিতার নাম কংস বেদ। বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার খন্দক বাড়িয়া গুচ্ছ গ্রামে বলে জানান। বন বাদারে ঘুরে ঘুরে টিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মারা তার নেশা ও পেশা। পাখির অবস্থান নিশ্চিত করে মাথায় লোহার আল লাগিয়ে একটি ললার সাথে গোড়ার ফাঁকা অংশের ভিতর আরেকটি ললা জোড়া দিয়ে প্রয়োজনে ছয় সাতটি ললা জোড়া দিয়ে ষাট সত্তর ফুট উপরের পাখি ও মাটি থেকে বিদ্ধ করে পাখি শিকার করেন তিনি।

tia pic 1
পাবনার চর ভাঙ্গুড়া এলাকায় কথা হয় গোপন বেদ এর সাথে। প্রথমে তাকে নার্ভাস লাগছিল। কিছুক্ষণ গল্প করতেই সহজ হয়ে যান তিনি। কথায় কথায় বেরিয়ে আসে জীবনের গল্প। যে জীবন ঘিরে আছে সুখ দুঃখ। একই বৃত্তের মাঝে ঘুরপাক খাওয়া। রশ্মি নয় রেখাংশে আবদ্ধ যেন এ জীবন। তবে কখনো সরল কখনো বক্র। বৃত্তের মাঝে জ্যা যেমন আবদ্ধ তেমনি সংসার নামক সীমাবদ্ধতা গোপন বেদ দের যেন রেখেছে আবদ্ধ করে ।

গোপন বেদ জানান, “জাতিতে বাঁশফোর আমরা। আগে বাড়ি ছিল চাটমোহর রেল বাজার এলাকায়। অমুতকুন্ডা হাটের পাশে। এখন কুষ্টিয়ায় বসবাস করেন। মন চাইলে চলে আসেন এ এলাকায়। অন্য এলাকায়ও যান। দু’ এক সপ্তাহ করে থাকেন। আবার বাড়ি চলে আসেন। নাইটগার্ডদের বলে কয়ে রাতে বাজার ঘাটে থাকেন। স্ত্রী ময়না (৩৫) খন্দকবাড়িয়ার গুচ্ছ গ্রামে থাকেন। দুই ছেলে দুই মেয়ে আমাদের। বড় ছেলে সাগর বেদ (২৫)। পাঁচ ছয় ক্লাস পড়েই বিয়ে করেছে। পৃথক সংসার। বাঁশ দিয়ে কুলো চালুন বানায়। বিক্রি করে। কখনো কখনো সেলুনের কাজও করে। ছোট ছেলে নিপেন বেদও চার পাঁচ ক্লাস পড়েছে। তিনি বলেন, “আমার শালীর মেয়ে সুবর্ণাকে বিয়ে করেছিল। দুজনের মন এক নাই। দুজনা পৃথক আছে। বড় মেয়ে ময়ুরীকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে সোহেল বেদ এর সাথে বিয়ে দিয়েছি। মেয়ে বাঁশের কাজ করে। ছোট মেয়ে অর্পণা বেদ তিন ক্লাসে পরে। ছেলেরা চার আনাও দেয় না। আমার কাছ থেকে পেলে আরো খুশি হয়। নিজেদের বাড়ি ঘর নাই। আমি সকাল থেকে সন্ধা পাখির সন্ধানে বন বাঁদারে ঘুড়ি”।

tia pic-3

বন বাদারে পাখি ধরে বিক্রি করে প্রতিদিন আয় কেমন হয় আপনার এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “কোন দিন পাই কোন দিন পাই না। টিয়া, ঘুঘু এসব পাখি তো পাওয়া যায় না বললেই চলে। গত চারদিন ধরে চেষ্টা করে একটা টিয়া পাইছি। চাটমোহরের সমাজ বাজারের পাশে পেয়েছি এটি।” এ কথা বলে পুরাতন লুঙ্গি দিয়ে ঢেকে রাখা বাঁশের চাটাই দ্বারা নির্মিত খাঁচা থেকে সতর্কতার সাথে টিয়া পাখিটি বের করে দেখান তিনি। টিয়াটি বনে ছুটবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল তখন। তিনি আরো বলেন, “কুষ্টিয়ার মিরপুরের গো হাটের পাশে কবুতর হাটায় টিয়া বিক্রি করি। সৌখিন মানুষেরা কিনে নিয়ে পালে। পাখির দোকানদাররাও কিনে খাঁচায় ভড়ে বিক্রি করে। একটা বড় টিয়ার দাম এক হাজার টাকা। ছোটগুলো দুইশ থেকে তিনশ টাকায় বেচি। রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনির হাটসহ উত্তরাঞ্চলে বেশি যাই। যশোর ও খুলনার দিকে ও যাই। তবে বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় যাই না। ফরেস্টাররা ঢুকতে দেয় না বনে। দৈনিক তিনশ টাকা সংসার খরচ। সপ্তায় এক হাজার টাকা কিস্তি। খেয়ে না খেয়ে দিন যায় আমাদের”।

আগে বাঁশের কাজ করতেন গোপন বেদ। খেলনা চালুন কুলা ডালি তৈরি করে বিক্রি করতেন। বাজারে প্লাস্টিক সামগ্রী আসায় বাঁশের এসকল জিনিষের কদর কমেছে বলে জানান তিনি। ঘরে খাবার না থাকলে স্ত্রী তাড়া দেন কোথাও কিছু পাও যায় কি না তার সন্ধানে। তখন ঘর থেকে বেড়িয়ে পরেন তিনি শিকারের সন্ধানে।

পাখি শিকার করা অপরাধ এবং এটি যে একটি খারাপ কাজ তা জানা সত্ত্বেও অভাব এবং পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতন গোপন বেদসহ অনেক বাঁশফোড় এখনো পাখি শিকারে লিপ্ত রয়েছেন। স্বচ্ছল সৌখিন পাখি শিকারীরাও পাখির মাংসের স্বাদ গ্রহণ করতে ও মনের খোরাক মেটাতে পাখি শিকার করে থাকেন যা মোটেও কাম্য নয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এবং পাখি সংরক্ষণে পর্যাপ্ত অভয়ারণ্য না থাকায় দিনকে দিন প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে টিয়া, ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পরিচিত সুদর্শন পাখি।

চাটমোহর ডিগ্রী অনার্স কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান পরিবেশবিদ ড. মুক্তি মাহমুদ জানান, টিয়া ধান গম ভুট্রা আপেল কলা বড়ই কামরাঙাসহ অন্যান্য ফল ফলাদি খায়। এতে মানুষের সামান্য ক্ষতি হলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে টিয়াসহ অন্যান্য পাখি। গাছে গর্ত খুড়ে বাসা বানিয়ে বসবাস করে। বড় বড় গাছের সংখ্যা কমে আসায় এবং শিকারীদের হাত থেকে মুক্তি না মেলায় আমাদের দেশে টিয়ার সংখ্যা কমে আসছে। শুধু টিয়া নয়; অন্যান্য পাখি ও যেহেতু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সেহেতু এসকল পাখি রক্ষায় আমাদের সবার সচেতন থাকা প্রয়োজন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.