সাম্প্রতিক পোস্ট

সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছেন মন্জুরা বেগম

নেত্রকোনা থেকে খাদিজা আক্তার লিটা

নেত্রকোনা জেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দুরত্বে কাটাখালী গ্রাম। গ্রামের একজন কৃষাণী মনজুরা বেগম। দরিদ্র স্বামীর ভিটে বাড়িটিকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবন সংগ্রামের পথ চলা। নেত্রকোনা জেলা সদরের খুব কাজের গ্রাম বালি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, এমনকি এখন এইএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ রয়েছে গ্রামটিতে। সেই গ্রামের মেয়ে মন্জুরা বেগম পড়াশোনা করে জীবনে ভালো কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে বড় হলেও ৭ম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায়।


দরিদ্র স্বামী কৃষক কৃষিকাজ করেন। ৪ শতাংশ জমির উপর ছোট টিনের ঘর। খুব কম বয়সে বিয়ে হওয়ায় মনজুরা বেগম কম বয়সে ৩ সন্তানের জননী। নিজে পড়তে না পারলেও সন্তানদের লেখাপড়া করার প্রতিজ্ঞা করেন। যে কোনভাবেই হোক তিনি তার এই সিদ্ধান্ত সরে আসবেন না বলে জানান। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে না পারলেও সন্তানদের শিক্ষিত করার যে স্বপ্নটি আজ তিনি দেখেছেন সেটি পূরণে বদ্ধপরিকর তিনি। সব ধরনের বাধাবিপত্তিকে জয় করতে চান তিনি। তাই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করেন তিনি।


৪ শতাংশ জমিতে নিজের বাড়ির জায়গাটি বাদ দিয়ে বাকি জায়গাকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াই শুরু করেন। বাড়ির চারপাশে পেয়ারা, পেঁপে, জাম্বুরা, কামরাঙ্গা, কলা, নারকেল, জাম, লিচু লেবু ইত্যাদি ফলের গাছ রোপণ করেন। বাড়ির ছোট উঠানে এক কোনায় তৈরি করেন হাঁস, মুরগির জন্য টিনের ঘর। যেখানে সারাবছর স্থানীয় মুরগি, টারকি মুরগি, হাঁস পালন করেন তিনি। তিনি প্রতিবছর নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণ করে প্রায় ১০, থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করেন এসব প্রাণিসম্পদ বিক্রি করে। অন্যদিকে ছোট ঘরে এক কোনায় রাখেন গরু। সারাবছর ৩ থেকে ৪টি গরু পালন করে তিনি। গরু পালন থেকেও ভালো আয় হয় বলে তিনি জানান।
বাড়ির এক কোনায় লাগানো পেঁপে গাছ থেকে যে পরিমাণে পেঁপে ধরে তা পরিবারের চাহিদা পূরণ করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পেঁপে বিক্রয় করতে পারেন বলে তিনি জানান। অত্যন্ত সুস্বাধু স্থানীয় জাতের পেঁপে হওয়া এলাকাতে মন্জুরা বেগমের গাছের পাঁকা পেঁপের চাহিদা রয়েছে। পেঁপে বিক্রয়ের পাশাপাশি পেঁপে বীজ সংরক্ষণ করে নিজের প্রতিবেশীর মাঝে পেঁপের বীজ বিতরণ করেন প্রতিবছর। গ্রামে প্রায় ১০টি বাড়িতে মন্জুরা বেগমের বাড়ির পেঁপের জাত চাষ করছেন কৃষকরা।


বাড়ির সামনে এক শতাংশ জমিতে মৌসুম অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করেন তিনি। সবি জর মধ্যে বেগুন, সিম, ডাটা, টমেটু, মুলা, চিচিঙগা, মরিচ ইত্যাদি। এতে করে নিজের পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নিজের সন্তানদের পড়ার খরচ মিটান তিনি। কোন ধরনে রবিষ ও সার না দেওয়ায় বাজারে মন্জুরা বেগমে সবজির চাহিদা বেশি। এছাড়া প্রতিবেশীর সাথে যৌথ উদ্যোগে ৩০ শতাংশ জমির উপর ছোট পুকুরে স্থানীয় জাতের মাছ চাষ করেন। এ থেকে যা পান তা দিয়ে পরিবারের মাছের চাহিদা পূরণ করেন সারাবছর।


যোগাযোগ বিছিন্ন একটি গ্রামে থেকে নিজের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় দেওয়া একটি কঠিন পথ পাড়ি দেন তিনি। গ্রামে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যাল। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে হয় প্রায় ৩ কিলোমিটার দুরত্বে দেওপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। দূরত্বের কারণে গ্রামে উচ্চ শিক্ষার হার কম থাকলেও মন্জুরা বেগম নিজের ৩ ছেলেকে উচ্চ শিক্ষা দেওয়ার লড়াই করে যাচ্ছেন নিজের এক চিলতে জমির আয়ের উপর নির্ভর করে। তার স্বপ্নেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার বড় ছেলে। হিসাব বিজ্ঞানে অনার্স শেষ করে ঢাকায় থেকে বর্তমানে চাকুরির চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় ছেলে ১০ শ্রেণী, ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ছে।


৭ম শ্রেণী পাশ মন্জুরা বেগম, স্বামী পড়াশোনা খুব সামান্য। স্বামী স্ত্রী দুজনে নিজের বাড়িতে কৃষি কাজ করেন। মাঝে মাঝে অন্যের জমিতে কাজ করেন তাঁর স্বামী। এমনি অবস্থায় ভাঙা মাঠির রাস্তা, মাইলের পর মাইল হেটে স্কুলে গিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে কোন রকম খেয়ে পড়তে বসার আগ্রহ তৈরি করতে সন্তানের সাথে বহু রাত জেগে থাকতে হয়েছে মন্জুরা বেগমকে! কিন্তু মনোবল হারাননি। মন্জুরা বেগম নিজের সামান্য জমিকে কাজে লাগিয়ে নিজের লক্ষ্যে পৌছানোর লড়াই করে যাচ্ছেন।


মন্জুরা বেগমে হেটে যাওয়া পথ ধরে সামনে চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন গ্রামের অনেক নারী। যারা নিজের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন, ভর্তি করছেন কলেজে। মনজুরা বেগমের মতো তাদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেই তাদের লালিত স¦প্নকে তাড়া করছেন। মনজুরা বেগমের সাফল্য তাদের অনুপ্রাণিত করে। আসুন আমরা মনজুরা বেগমের মতো আমাদের চারপাশকে কাজে লাগাই, তৈরি করি নিরাপদ খাদ্য, কমিয়ে আনি বাজার নির্ভরশীলতা এবং রক্ষা করি প্রাণবৈচিত্র্য।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: