সাম্প্রতিক পোস্ট

সবুজ গ্রাম হিসেবে গড়ে উঠছে দরুণবালি

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ দূষণ ও বিপর্যয়ে চারদিকে পরিবেশ বিপন্নতার মাঝেও নেত্রকোনার সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের দরুণ বালি গ্রামের অক্সিজেন যুব সংগঠন, রাখালবন্ধু কৃষক সংগঠন, ফুলপাখি কিশোরী সংগঠন, জৈব চাষী দল, নেত্রকোনা শিক্ষা, সংস্কৃতি পরিবেশ ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির উদ্যোগে ও বারসিক’র সহযোগিতায় দরুণবালি গ্রামকে ‘সবুজ গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করে সবুজ গ্রাম সৃজনের কার্যক্রম শুরু করে।

গ্রামকে সবুজায়নের অংশ হিসেবে গ্রামবাসী প্রত্যেকে বাড়িতে একটি করে সাজনা গাছ রোপণ, ধোঁয়াবিহীন পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার, সকলে মাটি ও পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন ব্যাগ বর্জন করে চট বা কাপড়ের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার, পাখি রক্ষায় পাখির প্রতি ভালোবাসা স্বরূপ গ্রামের বড় বড় গাছে মাটির কলসী বেঁধে দিয়ে নিরাপদ আবাসন তৈরি করে দেয়া, যেখানে পাখিরা নিরাপদে বসবাস ও বংশবৃদ্ধি করবে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের (সবজি ও ফল চাষ) জন্য কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন ও ব্যবহার করছে, বৃক্ষ প্রেমিক কবিরাজ আঃ হামিদের সহযোগিতায় কৃষক, যুব ও কিশোরী সংগঠনের মাধ্যমে গ্রামের প্রত্যেক পরিবার দু’টি করে বিভিন্ন ধরণের ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেছে। মধু চাষী গোলাম ম্ােস্তফা মধু বালি গ্রামে জনগোষ্ঠীকে মৌমাছি পালন করে ফসলের পরাগায়নের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি ও উৎকৃষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য মধু উৎপাদনের জন্য প্রচারণা করেন। গ্রামের কৃষক কালাচাঁন মিয়া গ্রামের অন্যান্য কৃষকদেরকে কেঁচো সার উৎপাদনের জন্য বিনামূল্যে কেঁচো ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।


গ্রামের অক্সিজেন যুব সংগঠন ও ফুলপাখি কিশোরী সংগঠন আগামী ৩ বছর গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি ও ফাঁকা জায়গাগুলোতে ৫০০ শত নীমের চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছে। সংগঠন দু’টি গ্রামের গাছে গাছে বাল্যবিয়েমুক্ত আমাদের গ্রাম, মাদক ছেড়ে খেলা ধর, সুস্থ সুন্দর জীবন গড়, মৌ মাছি বাঁচাও, ব্যাঙ বাঁচাও, কেঁচো বাঁচাও, পাখি বাঁচাও, গ্রামে কোনো ভিক্ষুক থাকবেনা, আমরা সবাই ভাই ভাই, রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসার ব্যবহার কর, পলিথিন বর্জন কর চট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার কর, ঔষধি গাছ লাগাও ইত্যাদি জনসচেতনতামূলক বাণী সম্বলিত লেখা ফেস্টুন ঝুলিয়ে প্রচারণা করছে। গ্রামের রাস্তার পাশে টানানো হয়েছে পরিবেশ রক্ষায় ১০টি উপদেশ সমন্বিত ব্যানার ।
পরিষ্কার পরিছন্ন খাবার তৈরির জন্য গ্রামের দু’টি পরিবারের রান্নাঘরকে মডেল রান্নাঘর হিসেবে তৈরি করে সকল পরিবারের রান্নাঘরগুলো পরিচ্ছন্ন রাখতে যুব, কিশোরী ও কৃষক সংগঠনের সদস্যরা প্রচারণা চালাচ্ছে, যাতে ধীরে ধীরে গ্রামের সকলে উদ্বূদ্ধ হয়ে ক্লিনিং কুকিং এ অভ্যস্ত হয়। গ্রামের কৃষক, যুব ও কিশোরী শিক্ষার্থীরা তাদের গ্রামকে সবুজ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাদের পরিকল্পনা সবুজ গ্রামে শিশু, প্রবীণ, নারী-পুরুষ ধীরে ধীরে বাজারের ঔষধের উপর নির্ভর না করে ভেষজ ঔষধে অভ্যস্ত হবে এবং ভেষজ ঔষধি বৃক্ষ রোপণে আগ্রহী হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুল পাখি কিশোরী সংগঠন ও অক্সিজেন যুব সংগঠনের সভায় তুলসী পাতা, ফল ও পেঁপের উপকারিতা ও ঔষধি গুণাগুণ সম্পর্কে সকল সদস্যদের ধারণা দেয়া হয় এবং প্রত্যেক বাড়িতে তুলসী গাছের ছাড়া রোপণের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠন দু’টি প্রথম ধাপে একশ’টি বাড়িতে একটি করে ১০০টি তুলসী চারা ও ১০০টি পেঁপে চারা রোপণ করেছে।


কিশোরী সংগঠনের অন্যতম সদস্য রুবী আক্তার এ সম্পর্কে বলেন, ‘প্রাচীনকাল থেকেই ঔষধি গুণের জন্য তুলসী পতার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ছোটখাট অনেক রোগের ঔষধ হিসাবে তুলসী পাতা ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশেষভাবে হাচি-কাঁশি ও ঠান্ডা লেগে গলা ব্যাথা নিরসনে তুলসী পাতার রসের কোন জুড়ি নেই। তুলসি পাতা বেটে প্রতিদিন এক চামচ করে তিন বেলা করে খেলে বা কয়েকটি তুলসী পাতা বেটে কুসুম গড়ম পানিতে মিশিয়ে কুলকুলি করলে গলা ব্যাথার উপসম হয়। তুলসী পাতা কাঁচা চিবিয়ে খেলে অনেক উপকার ঠান্ডা ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কাজ হয়। মূখে ব্রণের সমস্য সমাধানে একটি সহজলভ্য ও অন্যতম উপাদান হলো তুলসী পাতা। তাছাড়া এলার্জি সমস্য সমধানে তুলসীপাতা কার্যকারী ভুমিকা রাখে।’


সদস্য রত্না আক্তার বলেন, ‘ছোট বেলায় দেখতাম আমোদের অসুখ বিসুখ হলে মা-বাবা সহজে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন না। ঠান্ডা জ্বর হলে মা-চাচীরা তুলসী পাতা, থানকুনি পাতা ও দলকলসের পাতার রস করে খাওয়াতো, আর তাতেই আমাদের অসুখ বিসুখ ছেড়ে যেতো। আমাদের এলাকায় ঔষধী গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে তাই আমারা সকলে মিলে ঔষধি গাছ লাগিয়ে আমাদের সবুজ গ্রামকে আরো সুন্দর ও সবুজ করে সাজাবো।’
সদস্য রুনি আক্তার বলেন, ‘পেঁপে একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল। পেঁপে তরকারী হিসেবে কাঁচা ও পাকা উভয়ভাবেই খাওয়া যায়। তাই আমাদের ঘরের চারপাশে পেঁপে চারা লাগিয়ে রাখলে পেঁপে বর্ষাকালে যখন সবজি থাকেনা তখন সবজি হিসেবে এবং অন্য সময়ে পাঁকা খেতে পারব। কোষ্ঠ্যকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিরসনে কাঁচা পেঁপে খুবই উপকারী। পাকা পেঁপে খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে। ভিটামিন এ ও সি এর অভাব পূরণ করে পেঁপে। পেঁপে বিক্রি করে অভাবের সময়ে আমরা শিক্ষা উপকরণ কলম, খাতা ও বই কিনতে পারি।’


সবুজ গ্রামে শুধু বৈচিত্র্যময় গাছই থাকবেনা। সবুজ গ্রামে থাকবে বৈচিত্র্যময় ফল, সবজি, ঔষধি, চাষকৃত ও অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদ, বৈচিত্র্যময় পাখি, মাছ, গৃহপালিত ও বন্য পশু-পাখিও। যে গ্রামে থাকবে সকলের সহাবস্থান। অযথা ও সামান্য প্রয়োজনে কেউ বৃক্ষ নিধন করবে না, পরিবেশ দূষণ ও পানি দূষণ করবেনা, অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদ ও বন্য পশু-পাখি সংরক্ষণ করবে। সকলের পরস্পরের সহায়ক, সহযোগি ও পারস্পারিক আন্তঃনির্ভরশীলতায় নিরাপদে বেঁচে থাকবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: