সাম্প্রতিক পোস্ট

পাটাতন ঘর: উপকূলীয় জনগণের অভিযোজনের কৌশল

:: বরগুণা থেকে হরগোপাল কবিরাজ

Untitledবাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাসমূহের মধ্যে পিরোজপুর ও বরগুনা অন্যতম দু’টি জেলা। বিশখালী এবং বলেশ্বর নদীবিধৌত এই জেলা দু’টি দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা এই অঞ্চলের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে ওই দু’টি জেলার মানুষেরা তাদের নানান অভিযোজনিক কৌশল দিয়ে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে বসবাস করে আসছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা প্রভৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এলাকার মানুষেরা বংশপরম্পরায় এক ধরনের বিশেষ ঘর নির্মাণ করেন যাকে কাঠের পাটাতন ঘর বলা হয়। এই ঘরটি দোতলা বিশিষ্ট। তবে কাঠের পাটাতন করা ঘরের ভিটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাটির তৈরি। এছাড়া ইট-সিমেন্টের পাকা ভিটা এলাকার অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ঘরগুলোতে দেখা যায়। ভিটা সাধারণত সমতল ভূমি থেকে ২-২.৫ ফুট উচু হয়ে থাকে। মাটির তৈরি ভিটাগুলো এজন্য বর্ষা মৌসুমে ভিজে থাকে। এই প্রসঙ্গে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর গ্রামের কৃষক জব্বার বলেন “ভিটের উপর হতে এক ফুট নিচে পলিথিন বিছিয়ে দিলে ভেজা ভিটে দ্রুত শুকিয়ে যায়।”

সাধারণত কাঠের পাটাতন দেয়া ঘরের বেড়া হিসেবে এলাকাবাসী টিন ব্যবহার করেন। কেউ কেউ আবার কাঠের বেড়াও দিয়ে থাকেন। মাটির দেয়াল না করার কারণ হিসেবে এলাকাবাসীরা নদীর পলি দ্বারা গঠিত মাটির গাঠনিক দূর্বলতাকে দাঁড় করেছেন। এছাড়া প্রকৃতিক দুর্যোগ এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হওয়ায় মাটির দেয়াল নিরাপদ নয় বলে তারা মনে করেন। প্রবল বেগে প্রবাহিত ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে ঘর ধ্বসে পড়ে বিপদ হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। দু’তলা বিশিষ্ট পাটাতন ঘরের উপর অংশে উঠার জন্য কাঠের সিড়ি ব্যবহার করা হয়।

বর্তমান সময়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ মোকাবেলা করার লক্ষ্যে পাটাতন দেয়া ঘর উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। পূর্ব পুরুষের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদে উপকূলীয় জনগণ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঘর তৈরি করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের মাদারতলী গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “কাঠের পাটাতন করা ঘর সামাজিক আভিজাত্যের একটা ব্যাপার। বড় একটা ঘর থাকলে ছেলে-মেয়ের ভালো বংশে বিয়ে করানো যায়।” তিনি আরও বলেন “বাপ-দাদার আমল থেকে গ্রামবাসী একইভাবে কাঠের পাটাতন করে ঘর তৈরি করছেন।” এলাকাবাসীর দেয়া তথ্যমতে, পাটাতন দেয়া ঘরের সুবিধা এবং অসুবিধা দু’টিই আছে যা নিম্নরূপ:

সুবিধা
 পাটাতন ঘর অধিক মজবুত হয়; কারণ কাঠের প্রতিটি তকতায় লোহার পেরেক গেঁথে দেয়া হয়।
 নিচের ঘরের সমপরিমাণ জায়গা উপরে পাওয়া যায়; ফলে পাটাতনের উপরের অংশে ইচ্ছেমত সাজানো যায়।
 নিচের অংশের তুলনায় উপরের অংশে নিরাপত্তা অনেক বেশি থাকে; এজন্য ঘরের ব্যবহার্য সকল প্রকার মালপত্র পাটাতনের উপর রাখা হয়।
 পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হলে ঘরের উপর-নীচ ব্যবহার করা যায়;
 এক ভিটায় ঘর তুলে দুই-তিনটা পরিবার অনায়াসে বসবাস করতে পারে; ফলে ভূমির উপর বাড়তি ঘর করার চাপ কমে এবং কৃষিজমির অপচয় কম হয়।
 বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের কারণে পাটাতনের উপর স্বাচ্ছন্দে বসবাস করা যায়।

অসুবিধা
 পাটাতন দেয়া ঘরের খুঁটি মাটির নীচে পুঁতে না দিয়ে ভিটার উপর অংশের ইটের উপর স্থাপন করা হয়; ফলে প্রবল বেগে প্রবাহিত ঝড়ে ঘর ভূপাতিত হবার সম্ভাবনা থাকে।
 ঝড়ের সময় জনগণ পাটাতনের উপর অবস্থান করা নিরাপদ মনে করে না।
 কাঠের অত্যধিক ব্যবহার করা হয়; ফলে বাড়তি গাছ কাটায় এলাকায় বড় আকারের গাছ দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে।
 একটি পাটাতন দেয়া ঘর তৈরিতে কমপক্ষে ৩-৪ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয়; অর্থাৎ ব্যয়সাপেক্ষ।

এই সব সুবিধা-অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও উপকূলীয় জনগণ তাদের অতীত ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে কাঠের পাটাতন দেয়া ঘর তৈরি করে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট দূর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে অভিযোজনের এক বাস্তবমূখী স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: