Posted in

উস্মান খানের কৃষিবাড়ি

নেত্রকোনা থেকে সুয়েল রানা
আগাম বন্যা, বন্যা, পাহাড়ি ঢল, আফাল, বজ্্রপাত, তীব্র তাপদাহ, শৈতপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি পণ্যের কম মূল্য, ফসলে রোগবালাইয়ের অধিক প্রার্দুভাব, ধানে চিটা, মানসম্মত বীজের অভাব, সেচের সমস্যা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য হাওরের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে জীবনধারণ করছে। হাওরবাসীদের একমাত্র ফসল ধান এবং তাও আবার মাত্র একটি মৌসুমে বোরো) হাওরে ধান হয়। হাওরে বসতভিটা বলতে শুধুমাত্র ঘরের জায়গাটুকু। গবাদি পশু-পাখি পালনের বা রাখার মত জায়গা নেই বললেই চলে। বর্ষাকালে আবার ছোট ছোট উঠানগুলোই হাটাচলার একমাত্র পথ হিসেবে ব্যবহার হয়। বসতভিটায় সবজি চাষ করার মত জায়গা থাকে না বললেই চলে। খুব কম সংখ্যক বাড়িই রয়েছে যেখানে বসতবাড়িতে সবজি চাষ করার মত কিছু জায়গা রয়েছে। তবে হাওরে এমন কিছু সংখ্যক লোকের দেখাও মেলে যারা সামান্য জমিতে বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় ফল, মূল ও সবজি চাষ করে থাকেন। তারা নিজেরা উৎপাদিত এসব ফল ও সবজি খেয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছেন এবং উদ্বৃত্ত্বগুলো বাজারে বিক্রি করে পরিবারের কাজে ব্যয় করেন।

নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার মদন সদর ইউনিয়নের একটি গ্রাম দক্ষিণ মদন। এ গ্রামেই বসবাস প্রবীণ কৃষক উসমান খান (৬৫) এর। হাওরে জন্ম ও বসবাসের ফলে তিনি ছোটবেলা থেকেই হাওরের বিভিন্ন সমস্যা দেখে এবং তা মোকাবেলা করেই বেড়ে উঠেছেন। বছরের প্রায় ছয়মাস বাড়ির চারদিকে পানি থাকায় তাকে পানির সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। ঢেউ, আফাল, ঝড়, বাতাস, খড়া, বন্যা, নদীর স্রোত ইত্যাদি তার বসতভিটার নিত্যসঙ্গী। এসব সমস্যা তিনি নিজস্ব কৌশল দিয়ে মোবাবেলা করেন। প্রবীণ কৃষক উসমান খানের বসতভিটার পারিমাণ ৬০ শতাংশ। তিনি ২০ বছর বয়স থেকেই কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। তার বাড়ির কিছু অংশ উঁচু হওয়ায় বর্ষাকালে ভাসা থাকে।

প্রাণবৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন। তাই তিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় বসতভিটার সামান্য জমিতে বৈচিত্র্যময় গাছগাছালিতে ভরে রাখার চেষ্টা করেন সর্বদা। বৈচিত্র্যময় বৃক্ষরাজি যেমন-ঔষধের চাহিদা ও পূষ্টির চাহিদা পূরণ করে, তেমনি এগুলো বিক্রি করে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা যায়। তিনি আগ্রাসী প্রজাতির গাছের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কেও সচেতন। তাই বসতভিটায় তিনি কোন আগ্রাসী প্রজাতির গাছ রোপণ করেন না। তিনি নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করে ধান, শাকসবজি, ঔষধি গাছ ও ফলদ গাছ রোপণ করেন। ছোটবেলা থেকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি ছোট ফলের বাগান করবেন। এ স্বপ্ন অন্তরে ধারণ করেই তিনি ধীরে ধীরে স্বপ্নের সেই বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন। মদন খালিয়াজুড়ি সড়কের পাশে বাড়ি তৈরি করে স্বপ্নের বাগান সৃজনের কাজ আরম্ভ করেন। যখন সামনে ভালো গাছের চারা দেখেন তখন সে চারা তিনি সংগ্রহ করে নিয়ে বাড়িতে রোপণ করেন।


প্রবীণ কৃষক উসমান খান বসতভিটায় বর্ষা ও শীতকালীন প্রায় ২১ জাতের শাকসবজি চাষ করেন। বর্ষা ও গ্রষ্মকালীন সবজির মধ্যে- বরবটি. বারমাসি বেগুন, মরিচ, কাচ কলা, ঝিংগা, আউশা লাউ, কুমড়া, ঢেড়স, নাইল্যা, ডাটা, বাংগি, ফোড়ল, মাছআলু, করলা, শশা, শিম, টমেটো, আরহর কলাই ইত্যাদি। শীতকালীন সবজির মধ্যে-দেশী লাউ, মিষ্টিকুমড়া, ডাটা, লালশাক, পালংশাক, রাইশাক, নটেশাক, মুগডাল, বোয়ালে গাদা শিম, নলডুগি শিম, জামাই পুলি শিম, কাইক্যা শিম, কৈলসা শিম, গাইডা শিম, করলা, বিলাতি ধনে, তিসি, টমেটো, বেগুন, আলু, মরিচ, মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, রসুন, গুয়ামুরি, ধনে, চিরাবাহর অন্যতম। ফলের মধ্যে- পেঁপে, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, কমলা, অরবরই, বেল, নারকেল, বড়ই, লটকন, আমড়া, লিচু, ডালিম ও সফেদা। ফুলের মধ্যে-বকুল, গোলাপ, সাদা জবা, হলুদ ও লাল জবা। ঔষধি গাছের মধ্যে- নিম, মেহগনি, মেহেদী ও থানকুনি। প্রাণবৈচিত্র্যের এই প্রাচুর্যতা তার বাড়িটিকে হাওরের অন্যান্য কৃষিবাড়ি থেকে ভিন্নতা দিয়েছে।


ছোট বসতভিটায় তিনি সবজি, ফল ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি গবাদি পশু-পাখিও পালন করেন। তার পালিত গৃহপালিত পশু-পাখির মধ্যে গরু ২টি, হাঁস ৪টি ও মুরগি ৬টি রয়েছে।

বীজ সংরক্ষণকারী
কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্র্ণ উপাদান হল বীজ। রোগমুক্ত ভালো ও উন্নত বীজ থেকেই ভালো ফসল উৎপাদন সম্ভব। তার মতে, সঠিক সময়ে বীজ বপন বা রোপণ করলেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তিনি নিজের চাষকৃত শস্য ফসলের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করেন। তিনি মোট ২ ধরণের শস্য, ২৪ ধরণের সবজি বীজ ও ৪ জাতের ধান বীজ নিজেই সংরক্ষণ করেন। এসব সংরক্ষিত বীজ তিনি নিজে রোপন করার পর উদ্বৃত্ত্ব বীজ নিজ গ্রামের ও অন্য গ্রামের কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে বিতরণ ও বিনিময় করেন। তিনি গ্রামবাসীদেরকে আগ্রাসী গাছের স্বাস্থ্যগত, পরিবেশগত ও প্রাণবৈচিত্র্যগত ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করে এগুলো রোপণে বারণ করেন। তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার জন্য অন্যদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কৃষকদের সহযোগী
কৃষক উসমান খান কিশোর বয়স থেকে কৃষি কাজ করতে করতে এখন একজন দক্ষ কৃষকে পরিণত হয়েছেন। তিনি এই দক্ষতা শুধুমাত্র নিজের উন্নয়নেই কাজে লাগাননি। তিনি নিজ গ্রামের কৃষকদেরকেও জৈব সার তৈরি ও জৈব উপায়ে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। তার চাষাবাদ পদ্ধতি দেখে হাওরের কৃষকরাও জৈব উপায়ে বসতভিটায় চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তিনি দক্ষিণ মদন গ্রামের একজন পরিবেশবান্ধব চাষী হিসবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি তার গ্রামের সকল কৃষককে পরিবেশবান্ধব কৃষি কাজে যুক্ত করে গ্রামটিকে প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন।

কৃষক উসমান খান এর বাড়িটির পেছনের অংশে উবদাখালী-গোমাই নদী। সামনে ডোবা এলাকা। বছরের প্রায় ৮ মাস বাড়ির চারদিক জলাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, ‘প্রাণবৈচিত্র্যই আমার জীবন। বাবার বাড়ির অবস্থা ভালোই আছিল। বাবা আছিল একজন বালা কৃষক, মা ছিল একজন বালা কৃষাণী। আমি মায়ের কাছ থেকে কৃষি কাজ শিখছি।’ কৃষক উসমান খানের স্ত্রী কৃষাণী নিলিমা সরকার বলেন, ‘আমারা জীবন কাটাইতাছি সবজি চাষ করে। আমার বাবার বাড়ির অবস্থা ভালোই আছিল। আমি সব শিখছি আমার মায়ের কাছ থাইক্যা। আমার মা গত হইবার আগ পর্যন্ত শাক সবজির চাষ করছেন। মরার কয়দিন আগেও আমারে বীজ দিয়া গেছেন লাগানের লেইগ্যা।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বামীর বাড়িতে সব বাজার থ্যাইক্যা কিনা খাইতে হইত। চিন্তা করে দেখি সব বাজার থেকে কিনলে সংসারের কোন উন্নতি করা যাইব না। প্রথম যে বাড়িতে আছিলাম সেই বাড়িডা মেলা সমস্যার লাইগ্যা বেইচ্যা দেই। এরপর ভাড়া বাড়িত থাইক্যা অল্প জায়গায় টবে, ঘরের দাইরে (বারান্দায়) গাছ, শাক, সবজি রোপন করে এবং পানির উপরে গুড়ি দিয়া সবজি চাষ করছি। নিজেগো দরকার মিটাইয়াও বাজারে বেইচ্যা পুলাপানের পড়া লেখার খরচ চালাইছি। মইধ্যে মইধ্যে সবজি বেইচ্যা চাইল, ডাইল, কেরোসিন, নুন যা উৎপাদন করতে পারিনাই এমন সব জিনিসপত্র বাজার থাইক্যা কিনছি। কিছু টাকা আবার সঞ্চয়ও করছি। বর্তমানে যে বাড়িতে আছি সেই বাড়ি কিনার সময় স্বামীকে সবজি বেচার থাইক্যা জমাইনা টাকা দিছি।’


কৃষক উসমান খান এর গৃহীত উদ্যোগ
উসমান খান নিজস্ব ও স্থানীয় পদ্ধতিতে কৃষি ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবেলা ও অভিযোজন করেন। বন্যার জন্যে জমিতে শাকসবজির বীজ বপন করতে না পারলে তিনি পলিথিনে বা ভাংগা বালতি বা ভাঙ্গা ডাহিতে বীজ রোপণ করে ছিকায় টানিয়ে রাখেন। পানি নেমে যাওয়ার পর চারাগুলো ছিকা থেকে নামিয়ে মাটিতে রোপণ করে দেন। তার বাড়িতে ৯৪ জাতের প্রাণবৈচিত্র্য আছে। এছাড়াও বাড়ির আশেপাশের অনেক শাকসবজি আছে যেগুলো আপনা আপনি জন্মায়। বাড়ি রক্ষা করার জন্যে তিনি ভিটার চারপাশে ধৈঞ্চা রোপণ করেন। তিনি ফোড়ল সবজি (ধুন্দল) নিয়ে একটা গবেষণা করেছেন। ফোড়ল বা ধুন্দল গাছ অতিবৃষ্টি, খরা ও পানি সহনশীল কিনা তা তিনি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও খড়ায় ফোড়ল গাছ নষ্ট হয় না। ১৫ দিন ধরে কোমর পানির নিচে ফোড়ল গাছের গোড়া ডুবে থাকলেও ফোড়ল গাছ মরেনা বরং গাছের আরও বৃদ্ধি ঘটে।

উসমান গনির স্ত্রী কৃষাণী নিলিমা সরকার বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের নারীরা যদি অবসর সময়টা হাত পা গুটায়ে না রাইখ্যা যদি পতিত জায়গা গুলায় সবজি চাষ করে তাইলে খাওনের অভাব হইবোনা। হাওরের মানুষরারে অন্য এলাকার সবজির জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়তোনা। অর্থনৈতিকভাবে হাওরবাসীরা অনেক লাভজনক হইতে পারত। আমিও এইভাবেই উঠছি। আমি রাসায়নিক সার ক্ষেতে দেইনা, আমি সব সময় জৈব সার দেই। আমি গোবর, ছাই, সবজির খোসা, মাছের আইশ, হাঁস-মুরগির লেদা পঁচাইয়া জৈবসার তৈরি করি। কৃষক উসমান খান ও কৃষাণী নিলিমা সরকার ফসলের রোগ-বালাই দমনের জন্যে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। তিনি লোকায়ত কৃষি সংস্কার অনুসরণ করেন। কার্তিক মাসে বোলা সংক্রান্তির দিনে চুনের পানি, বাসি ছাই, চাল ধোয়া পানি, ফোকা টিপ মারা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পশ্চিমা বাতাস, উত্তরের বাতাস, টবে সবজির গাছের স্থান পরিবর্তন করে দেন। তিনি এ পর্যন্ত ১০০-১২০ জন কৃষক-কৃষাণীকে সবজি বীজ দিয়েছেন।

প্রবীণ কৃষক উসমান খান ও কৃষাণী নিলিমা সরকার এর ন্যায় হাওরাঞ্চলের সকল কৃষক ও জনগোষ্ঠী তাদের বসতভিটার প্রতিটি ইঞ্চি চাষযোগ্য জমি পতিত না রেখে সবজি ও ফলমূল চাষ করলে হাওরে সবজির সংকট দূর করা সম্ভব। সক্ষম হবে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত্ব সবজি বিক্রি করে বর্ষাকালীন সময়ে আর্থিক সংকট লাঘব করতে। হাওরের একমাত্র ফসল ধানের উপর হাওরবাসীদের নির্ভরশীলতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.