সাম্প্রতিক পোস্ট

এলাকা উপযোগি নার্সারি হাওরের পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখছে

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং ও অহিদুর রহমান

পরিবেশের উপাদানগুলোর মধ্যে মাটি, পানি, বায়ু ও গাছপালা অন্যতম। যেসব এলাকায় এই চারটি উপাদান দূষণমুক্ত ও সুরক্ষিত থাকে সেসব এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশকে সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ বলা হয়। একটা সময় গোটা বাংলাদেশটাই সুস্থ, সুন্দর ও বৈচিত্র্যেময় পরিবেশে সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু কালক্রমে আধুনিক কৃষি ও উন্নয়নের নামে আমাদের দেশের প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত। কৃষির উন্নয়নের নামে অধিক ফলনের আশায় কৃষকরা হাইব্রিড ফসল চাষ করছে। হাইব্রিড ফসল চাষে ব্যবহার করছে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হরমোন, আগাছানাশক এবং জমিতে অনেক সেচের প্রয়োজন হচ্ছে। বিগত প্রায় এক দশক ধরে মুনাফা লোভি ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে কৃষি জমির মাটি কেটে ফিসারি, গাছপালা কেটে শিল্প কারখানা ও হাট-বাজার তৈরির ফলে দেশের জলাশয়, কৃষি জমি ও গাছপালা দিন দিন সংস্কুচিত হয়ে পড়ছে। আজ আমাদের দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ হুমকির সন্মূখীন।


আমাদের দেশটি মূলতঃ ৩০টি প্রতিবেশীয় অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এই ত্রিশটি প্রতিবেশীয় অঞ্চলের মধ্যে ‘বন্যা, পলি গঠিত হাওর ও সমতল ভূমি’ একটি, যা নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। এই প্রতিবেশীয় অঞ্চলের অধিকাংশই হাওর জলাভূমি। হাওরে উঁচু জমি না থাকায় হাওরাঞ্চলে গাছপালার সংখ্যা ও গাছপালার বৈচিত্র্য অতি সামান্য। হাওরের বছরের ৬-৮ মাস পানি থাকায় গাছপালার সংখ্যা ও পানি সহনশীল গাছের প্রজাতির সংখ্যাও হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। হাওরের যেসব সামান্য উঁচু জমি ও বসতভিটার সামান্য পরিমাণ জমিতে বর্ষা মৌসুমে ৩-৪ ফুট পানি থাকে এবং ৫-৬ ফুট লম্বা পানি সহনশীল গাছের চারা রোপণ করা যায়, সেসব জমিতে হাওরবাসীরা ইচ্ছা থাকলেও চারার অভাবে গাছ রোপণ করতে পারে না।


নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন (মদন, গোবিন্দশ্রী ও মাগান) মূলতঃ হাওর অধ্যুষিত। এর মধ্যে মদন ইউনিয়নের অর্ধেকটা হাওর হলেও গোবিন্দশ্রী ও মাগান ইউনিয়নের পুরোটাই হাওরবেস্টিত। বারসিক ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে জাপানভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মদন উপজেলার মদন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নে ‘পিপলস লেড ক্লাইমেট চেঞ্জ এডাপটেশন এন্ড রেজিলেন্স প্রোগ্রাম’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হল- জলবায়ু সংকটজনিত ঝুঁকি হ্রাসে জনগোষ্ঠির সক্ষমতা বাড়ানো। বারসিক মদন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কৃষি, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। হাওরে বারসিক বাস্তবায়িত কার্যক্রমগুলোর মধ্যে হাওর উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনে কৃষক নেতৃত্বে ধানের প্রায়োগিক গবেষণা। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের বিকল্প ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে হাওর এলাকা উপযোগি কৃষক নেতৃত্বে হাওর এলাকা উপযোগি শস্য ফসলের জাত নির্বাচনে কৃষক নেতৃত্বে শস্য ফসলের প্রায়োগিক গবেষণা। হাওরের কৃষকদেরকে বৈচিত্র্যময় শস্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধকরণে বিনামূল্যে হাওর এলাকা উপযোগি বৈচিত্র্যময় সবজি ও শস্য ফসলের বীজ সহযোগিতা প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সংলাপ, মতবিনিময় ও ইস্যুভিত্তিক গ্রামসভা ও প্রচারণার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও হাওর এলাকায় জৈব উপায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদনে কৃষকদের উপকরণ সহায়তা এবং হাওরের পরিবেশ উন্নয়নে যুব, শিক্ষার্থী ও কৃষকদের গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।


মদন ও গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের স্থানীয় যুব জনগোষ্ঠী ও জনসংগঠন বারসিক’র সহযোগিতায় হাওরের পরিবেশ উন্নয়নে বিগত বছর থেকে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ, ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাওরের রাস্তা, গুচ্ছগ্রাম ও বসতভিটায় এলাকা উপযোগি বনায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু পানি সহনশীল গাছের চারা (হিজল, করচ, বরুণ, তমাল) এলাকায় সহজলভ্য না হওয়ায় বনায়ন করতে গিয়ে অনেক সমস্যার সন্মূখীন হতে হয়েছে। পানি সহনশীল হিজল ও করচ গাছের চারা সুনামগঞ্জ জেলা থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে এবং সেখানেও উপযোগি চারা সহজলভ্য না হওয়ায় সঠিক সময়ে বনায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।


বারসিক হাওরের জনগোষ্ঠীর জন্য হাওর এলাকা উপযোগি (পানি সহনশীল) গাছের চারা সহজলভ্যকরণে হাওরাঞ্চলে নার্সারি স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে মদন ইউনিয়নের কুলিয়াটি গ্রামে একজন নারী উদ্যোক্তা কৃষাণী জেসমিন আক্তারকে নার্সারির উপকরণ (ছিদ্রযুক্ত বিভিন্ন আকারের পলি ব্যাগ, ঝাঁঝড়ি, নেট জাল, জিআই তার, পলিথিন শীট, বাঁশসহ বৈচিত্র্যময় কাঠ, ঔষধি, ফলদ, ফুল ও সবজি বীজ) সহায়তা প্রদান করা হয়। ২০১৯ সালে গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের একজন কৃষককে আরও একটি হাওর নার্সারি স্থাপনের জন্য উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়। কিন্তু মাঝ পথে সে উদ্যোক্তা পারিবারিক কারণে পরিবারসহ অন্যত্র চলে গেলে নার্সারির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের প্রথম দিকে মদন ইউনিয়নের হাওরঘেঁষা উচিতপুর গ্রামের কৃষক আরব আলী তালুকদারকে তার আগ্রহের ভিত্তিতে নার্সারি স্থাপনের জন্য উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়। উপকরণ সহায়তা পেয়ে কৃষক আরব আলী ও জেসমিন আক্তার বসতভিটায় বৈচিত্র্যময় সবজি, ফল ও পানি সহনশীল গাছের চারা উৎপাদন আরম্ভ করেন। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে হাওর এলাকা উপযোগি বৈচিত্র্যময় সবজি ও ফলের চারা উৎপাদনে আরও একটি নার্সারি স্থাপনের জন্য গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের শান্তিপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক ইদু মিয়াকে নার্সারির উপকরণ (পলিব্যাগ, পলিথিন শীট, ঝাঁঝড়ি, পেঁপে, মরিচ, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, বেগুন, চালকুমড়া, শসা, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি বীজ) সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।


কুলিয়াটি গ্রামের জেসমিন আক্তার বিগত দুই বছরে তার নার্সারি থেকে প্রতিবেদনকালীন সময় (১৮ মার্চ, ২০২১) পর্যন্ত এক লাখ দশ হাজার টাকার চারা বিক্রি করেছেন এবং প্রায় ১২০০টি চারা (পেঁপে, সুপারি, পেয়ারা ও সবজি চারা) গ্রামের জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন। বর্তমানে তার নার্সারিতে বিক্রির পর সুপারী, হিজল, করচ, পেঁপে, পেয়ারা, কৃষ্ণচুড়া, মরিচ, জলপাই, নিম, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়াসহ ১১ জাতের প্রায় ৭৩০০টি গাছের চারা রয়েছে। গোবিন্দশ্রী গুচ্ছগ্রামে পানি সহনশীল গাছের বনায়নের জন্য তিনি যুব সংগঠনকে ১০০টি হিজল ও করচ গাছের চারা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।
অরব আলী তালুকদার তার নার্সারিতে বিগত এক বছরে দশ ধরণের (আম, হিজল, করচ, নিম, পেয়ারা, আমরা, জলপাই, মরিচ, বেগুন, পেঁপে) প্রায় ১৩৬০০ হাজার চারা উৎপাদন করেছেন। এর মধ্যে হিজল ও করচের চারা ৭৫০০, নিম ১৫০০, পেয়ারা ১৫০০, বেগুন ৮০০, মরিচ ৫০০, আম ৫০, জলপাই ৯০০, আমড়া ২০, করমচা ২০, পেঁপে ২০০টি। ২০০টি পেঁপের চারা ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। চারা উৎপাদনের মত উচুঁ জমি না থাকায় এবং বসতভিটা খুবই ছোট হওয়ায় কৃষক আরব আলী বাঁশের দোতলা মাঁচা তৈরি করে তাতে মরিচ, বেগুন ও পেঁপে চারা উৎপাদন করেছেন। বর্তমানে তার হিজল ও করচের চারা প্রায় ১/১.৫ ফুট লম্বা হয়েছে। পাইকাররা ইতিমধ্যে গড়ে ১২ টাকা দরে চারাগুলো কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বেশি দামে বিক্রি করতে এবং আগামী মৌসুমে গ্রামের রাস্তার পাশে রোপণের জন্য তিনি চারাগুলো আরও বড় করছেন বলে তিনি জানান। মরিচ ও বেগুন চারা কিছু দিনের মধ্যে বিক্রির উপযোগি হবে। আরব আলী নার্সারিতে উৎপাদিত চারা লক্ষাধিক টাকার উপড়ে বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তিনি উৎপাদিত হিজল ও করচের চারা থেকে দুই থেকে তিনশত চারা হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে রোপণের জন্য বিনামূল্যে দিবেন বলে জানান। নার্সারিতে পানি সহনশীল গাছের চারা উৎপাদনের খবর পেয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে চারার তার নিকট চাহিদা জানিয়েছেন বলে আরব আলী জানান।


হাওর অধ্যুষিত গোবিন্দশ্রী ইউনয়নের শান্তিপাড়া গ্রামের কৃষক ও সবজি নার্সারি উদ্যোক্তা ইদু মিয়া নার্সারি উপকরণ সহায়তা পেয়ে গ্রীষ্মকালীন সবজি ও ফলের চারা (পেঁপে) উৎপাদন শুরু করেছেন। বর্তমানে তিনি নার্সারিতে উন্নত জাতের পেঁপে, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা এবং বারোমাসি মরিচ ও বেগুনের রোপণ করেছেন। পরবর্তীতে (বীজ সংগ্রহের সময় হলে) তিনি পানি সহনশীল গাছের চারা এবং লেবুসহ বৈচিত্র্যময় ফলের চারাও উৎপাদন করবেন বলে জানান ইদু মিয়া।


হাওর এলাকা উপযোগি সবজি, ফলদ ও পানি সহনশীল গাছের চারা উৎপাদনের জন্য তিনটি নার্সারি স্থাপনের ফলে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের নিকট পানি সহনশীল গাছের চারা, বৈচিত্র্যময় ফল ও সবজির চারা অনেকটা সহজলভ্য হয়েছে। হাওরের কৃষকদেরকে এখন পানি সহনশীল গাছের জন্য সুনামগঞ্জের চারার উপর এবং বৈচিত্র্যময় সবজি ও ফলের চারার জন্য বাজারের উপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়না। আগামী বছরের মধ্যে তিনটি নার্সারিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঠ, ফল ও সবজি জাতীয় চারার সহজলভ্যতা সুষ্টি হবে বলে আশা করা যায়। নার্সারিগুলো স্থাপনের পর থেকে হাওরের কৃষক-কৃষাণী, যুব ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ এবং ফল ও পানি সহনশীল গাছের চারা রোপণের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদানুযায়ী হাতের কাছে সবজি, ফল ও পানি সহনশীল গাছের চারা পেলে হাওরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে চারা রোপণের আগ্রহ আরও পুরোদমে বৃদ্ধি পাবে বলে উচিতপুর স্বেচ্ছাসেবক সমাজকল্যাণ সংগঠনের সভাপতি মো. জামাল মিয়া ও সাধারণ সম্পাদিক কাইয়ুম তালুকদার মনে করেন। পানি সহনশীল গাছের চারা নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে সহজল্য হলে সরকারি/বেসরকারি ও ব্যাক্তি উদ্যোগে বনায়নের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ যেমন সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে, তেমনি হাওরের প্রাণবৈচিত্র্যও সুরক্ষিত হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: