সাম্প্রতিক পোস্ট

মাহাম পাগলার জীবন সংগ্রাম

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম
কাঙ্গাল মাহাম পাগলার উক্তি দিয়েই শুরু করছি- ‘নাই আমার ঘর আর বাড়ি তবুও আমি আশা করি, বাবার উরশ যেন করতে পারি। কি হবে মোর ধন সম্পদে আজ মরলে কাল দুইদিন হবে,তাই সবাই মোরে কইরেন দোয়া, আমি করতে পারি যেন এই মানুষ সেবা।’ দীর্ঘদিন ধরে দেখছি মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন পশ্চিম দাশরার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে একজন পাগল থাকেন। ঝাকড়া ও জটাচুলের বাধনে লালপোশাক পরিহিত মানুষটি কখনো একা খালি পায়ে হাটেন আবার কখনো তার জীবন সঙ্গীনিকে সাথে নিয়ে মানবসেবার গাড়ি চালান। চা, পান, চটপটি, ফুসকাসহ হরেক জিনিস নিয়ে হকার শ্রমিক হয়েও সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁকে জানতে ইচ্ছে হলো গভীরভাবে। তাই দফায় দফায় আসি পাগলের কাছে।


জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যমতে, পাগলের নাম মাহাম বেপারী (৬২)। পিতা মৃত আলেফ বেপারী, মাতা আমিরজান বেগম ও স্ত্রী আছিয়া বেগম। পিতামহের নিবাস ছিলো ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার বারুয়াখালী গ্রামে। নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তার পিতাবাড়ি করেন মানিকগঞ্জ জেলাধীন সিংগাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের জামশা ধলেশ^রী নদীর তীরে। গ্রামীণ যৌথ প্রান্তিক ও ক্ষেতমজুরভিত্তিক পরিবারে বেড়ে ওঠা মাহাম পাগলার জীবনে রয়েছে অনেক সংগ্রামের অধ্যায়।


ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন বাউন্ডেলে স্বভাবের। তাই মানুষের পছন্দ অপছন্দের ভিড়ে পরিবার ও সমাজে বাস করার আগ্রহ কমতে থাকে। গান বাজনা ও বিভিন্ন যাত্রার দলে ঘুরে বেড়াতেন বলে বাড়ির কেউ তাঁর খোঁজ রাখতো না। প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের প্রতি তার আগ্রহ ছিলো কম। তবে পীর মুরশিদের স্কুলের প্রতি ঝোক ছিলো বেশি। ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত হয়ে তিনি চরমভাবে আহত হন এবং তার হৃদয়ে দাগ কাটে যে ‘আমরা কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম কোথায় যাব।’ এই ভাবনায় তিনি নিজের ভিতর পরম ঈশ^রের খোঁজে তথা মওলার খোজে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের চেতনা নিয়ে আশেকান পীর মুরশিদের দরবার ও মাজার শরিফে ঘুরে বেড়ান দেশ বিদেশের প্রান্ত থেকে প্রান্তে।


মওলার পাগল হয়ে কাঙ্গাল মাহাম পাগলার জীবনের একটি বড় অধ্যায় কাটে ঢাকার মীরপুরে হযরত বাবা শাহ আলীর দরবার শরিফে। তারপর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাগেরহাট জেলার প্রতাপশালী আউলিয়া হযরত বাবা শাহ খানজাহান আলীর মাজার শরিফে এসে হযরত বাবা নূর মুহাম্মদ চিশতির নিকট তিনি দিক্ষা গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গুরু তার প্রতি খুশি হয়ে খেলাফত প্রদান করেন এবং বিয়ে করে সংসার করার মন্ত্রণা দিয়ে দেন। মাহাম পাগল রাজি না হলেও তার গুরু তাকে বলেন ‘সংসার সাগর পারি না দিয়ে মওলাকে পাওয়া যাবে না।’ সংসার মায়াজাল থেকে তাকে সিদ্ধ করেই পরধামের জন্য মুক্তি নিতে হবে। এই মন্ত্রণা নিয়ে তিনি তরিকার ভাইদের সহযোগিতা নিয়ে মহাদেবপুর গ্রামের আছিয়া বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরই জীবন সারথীকে সাথে নিয়ে শুরু হয় জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। তরিকার ভাই সালাম পাগলাসহ আশেকানদের টানে ছুটে আসেন মানিকগঞ্জ শহরে। তরিকার ভাইদের বাড়িতে কিছুদিন আশ্রয় নিয়ে কাজ শুরু করেন পথে পথে হকারি করে। আরিচা ফেরি ঘাটে দীর্ঘদিন চলে তার এই জীবন সংগ্রাম। আরিচা ঘাট পাটুরিয়া যাওয়াতে তিনি চরমভাবে আহত হন এবং ফেরিঘাটের হকারি বাদ দিয়ে ক্ষোভে দুঃখে নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে একেবারেই মানিকগঞ্জ শহরে চলে আসেন।


তারপর বিভিন্ন বাসায় ভাড়া থেকে এখন মোটামুটি স্থির আছেন পশ্চিম দাশরার চার রাস্তার মোরে সুলতান মিয়ার বাড়িতে। পরিত্যক্ত এই বাড়িতে থাকলেও বাসাভাড়া, গ্যাস, পানি, বিদ্যুতসহ তাকে স্থায়ী খরচা হিসেবে গুণতে হয় প্রতি মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। পোশাক চিকিৎসা খাওয়াসহ কম হলেও আরো দরকার নয় থেকে দশ হাজার টাকা। মোট কথা প্রতিদিন তার অন্তত পাচশত টাকা রোজগার দরকার হলেও স্বামী স্ত্রী মিলে পুরি, ছোলা, পিয়াজও বানিয়ে দুইশত থেকে আড়াইশত টাকার বেশি রোজগার করতে পারে না। তারপর ঝড়বাদল তো আছেই, প্রতিদিন কাজ সম্ভব নয়। বৈশি^ক মহামারী করোনাকালের কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্যেও পাগল না খেয়ে হলেও ঘরভাড়া নিয়মিত দিতেন। কিন্তু বর্তমানে মহামারী করোনাকালসহ নানাবিধ প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে না পারায় তিনিও ঋণের দুষ্টচক্রে পড়তে বাধ্য হয়েছেন। পাগল মাহাম বলেন, ‘একদল বকধার্মিক আমার পাক-পবিত্রতা নিয়ে গোপনে কুৎসা রটায় এবং অন্যেরা যাতে আমার হাতের পুরি না খায় সেই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে বেচাবিক্রি একটু কম হয়। তারপরও সাম্প্রদায়িক এই পশুত্বের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই।’

পাগল আরো বলেন-, ‘রাত জেগে গান গাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারি নাই। কাজের ফাকে রাতে গান করলে আবার দিনে কাজ করা মুশকিল হয়। আয় রোজগার যা হয় সেগুলো নিয়ে আবার ছুটে যাই বাবার মাজারসহ বিভিন্ন দরবার শরিফে। ভারতের আজমির শরিফে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (র.) দরবার শরিফে একাধিকবার ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতায় আমি ধন্য হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ইতেমধ্যে আমার জীবনের বেলা শেষে সংসার বড় হয়। অসময়েই মেয়েদের পরের বাড়িতে বিয়ে দিয়ে এবং ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ না করতে পারার বেদনা আমাকে আরো আহত করে। তারপরও আমার প্রতি স্ত্রী, দুই কন্যা ও পুত্র তারা খুশি থাকলে আমি মহাখুশি। তারপরও সংসারের সবাইকে রেখে বিভিন্ন দরবারে ঘুরলেও আমার স্ত্রী আছিয়া বেগমের কোন অভিযোগ নেই। শুধু তাই নয় আমার অনুপস্থিতিতে আমার প্রাণপ্রিয় সহধর্মিনী পশ্চিম দাশরা মোরে চিতই পিঠা, ছোলা ও পুরি বিক্রি করে সংসার সামাল দেন।’ সংসারে ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাদের প্রয়োজন বাড়তে থাকে তাই পাগল মাথায় হাত দেন এবং চিন্তা করেন যে সংসারের বাসনা মনে ছিলো না বলেই তিনি সঞ্চয় করেননি! তিনি মানুষের দেওয়া ভালোবাসা ও টাকা পয়সা যা পেয়েছেন তার সবই যে ঘাট দিয়ে এসেছেন সেই ঘাটেই ব্যয় করেছেন।


ক্ষমতাসীন সরকার এর গত টার্মেই তিনি মানিকগঞ্জ পৌরসভার মাধ্যমে ডিসি অফিস ও ভূমি অফিসে ভূমিহীনদের নামে খাসজমি বন্দবস্তের ফরমে আবেদন করেন। তাঁর কাছে কয়েক দফায় তদন্তে আসে এবং কর্তাব্যক্তিরা তাঁর ছবি তুলে নিয়ে যান। তারা আশান্বিত করেন যে ২০২১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকীতে সরকার কাউকে গৃহহীন রাখবে না বলে ভূমিহীনদের জন্য খাস জমি ঘরসহ ররাদ্দের ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে তিনি প্রায় দিনই ভূমি অফিসে খোজ খবর রাখেন কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা তাকে বলেন ‘বালিরটেক বা দূরে দিলে তো আপনি থাকতে পারবেনা না দেখি শহরেই রাখতে পারি কিনা।’ এই বলে শান্তনা দিলেও চুড়ান্ত তালিকায় তাঁর খুঁজে পাননি! এভাবেই অতিদরিদ্র হয়েও বঞ্চিত হলেন। তবে তিনি আবার পৌরসভা থেকে ভূমিহীন সনদ নিয়ে খাস জমি বন্দেবস্তের জন্য আবেদন করলেন।

পাগল মাহাম বলেন, ‘আমি এতটুক বুঝতে পারলাম যে আমার মত দেশে যারা সুবিধাবঞ্চিত ভূমিহীন তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার অধিকার আদায়ের জন্য। আমার প্রাপ্য হক ও ন্যায্য অধিকার থেকে আমাদেরকে যারা বঞ্চিত করলো তাদের বিরুদ্ধে একা কথা বলার শক্তি আমার নেই। তবে একটি ভূমিহীন সমিতি থাকলে আমি তাদের সদস্য হয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামিল হতাম। যাহোক আমি সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। সমাজের এই অভেদ পাহাড় সমান বৈষম্যের অবসান ঘটাতেই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু একটি সামাজিক ন্যায্যতার সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলেন স্বাধীনতা বিরোধীরা সেটি করতে দেয়নি। তারপরও আমরা বিশ^াস করি দারিদ্র্য বিমোচন হ্রাসসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিকে শক্তিশালী করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আশা করি সরকার এ বিষয়ে আরও আন্তরিক হবে। সুবিধাবঞ্চিত ও ভূমিহীনদের পাশে থাকবে।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: