সাম্প্রতিক পোস্ট

জীবে প্রেম করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

৬ নভেম্বর ২০১৭। সোমবার। দুপুর গড়িয়ে গেছে তখন। চাটমোহর থানা সংলগ্ন কাঁচা বাজার জুড়ে হৈ চৈ। বাজারের দোকানদারদের প্রায় সবার হাতে ছোট বড় লাঠি। কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই দুগ্ধবতী একটি কুকুরকে পুরো বাজার এলাকায় ছুটোছুটি করতে চোখে পরে। পাগলের মতো এ গলি ও গলিতে ছুটছে কুকুরটি। সবার হাতে লাঠি থাকায় ভয়ে গন্তব্যে পৌছিতে না পারলেও চেষ্টার ত্রুটি করছিলনা কুকুরটি। একজন দোকানদার জানান, কুকুরটি খেঁপেছে। আরেকজন জানান, গত কয়েক দিনে কয়েকজনকে কামড়ে আহত করেছে কুকুরটি। অপর এক দোকানদার জানান, তাইজুলের কাঁচামালের দোকানের বাঁশের মাচালের নিচে কুকুরটির পাঁচটি বাচ্চা রয়ে গেছে। মা কুকুরটি বাচ্চাদের সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করছে। দুধের ওলান দুধের ভারে ফাট ফাট করছে। দুধ খাওয়াতে পারছে না।

pic-1

দৌড়ে দৌড়ে ক্লান্ত কুকুরটি যখন অপেক্ষাকৃত একটু দূরে অবস্থান করছিল এমন সময় চোখে পরে আলেফা কাউন্সিলরকে। চাটমোহর পৌরসভার ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর তিনি। বাজারের সবাই যখন ভয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন এমন সময় আলেফা কাউন্সিলর কাঁধে থাকা ব্যাগটি নামিয়ে রেখে পরনের কাপড় শক্ত করে বেঁধে হামাগুড়ি দিয়ে তাইজুলের দোকানের মাচালের নিচে গিয়ে সেখান থেকে একে এক পাঁচটি কুকুরের বাচ্চা বের করে আনেন। পরম মমতায় তিনি তাকিয়ে দেখেন বাচ্চাগুলোকে। একটি ঝুড়িতে বাচ্চাগুলো তুলে মায়ের কাছে দিতে যান। মা কুকুরটিকে কাছে ডাকেন। মা কুকুরটি তখন ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছিল আলেফাকে। ভয়ার্ত কুকুরটি তৎক্ষণাৎ আলেফার ডাকে সাড়া না দিলেও অনেক পশুই সাড়া দেন পশুপ্রেমী আলেফার ডাকে।

চাটমোহরের অলি গলি বাজার ঘাট অফিস পাড়ায় আলেফার পশু প্রেম সম্পর্কে অনেকবছর যাবত আলোচনা হয়ে আসছে। বিড়াল বেজীকে পোষ মানানোর পাশাপাশি শিয়াল ও মেছো বাঘকেও পালন করে পোষ মানানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রতিনিয়ত জীবের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এই নারী কাউন্সিলর। বর্তমানে তিনি ৪৫টি বিড়াল পালন করে আসছেন। কাউন্সিলর ভাতার টাকার পুরোটাই তিনি খরচ করেন বিড়ালের পেছনে। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না হওয়ায় এখনো নিরক্ষর তিনি। জীবে সেবা করে যে জন সেই জনে সেবিছে ঈশ্বর এ লাইন কখনো পড়ার সুযোগ না হলেও আজীবন জীবের সেবা করে আসছেন এ মহিয়সী নারী।

pic-2

১৯৭১ সালে চাটমোহরের বালুচর মহল্লায় জন্মগ্রহন করেন তিনি। বর্তমানে বসবাস করছেন কাজীপাড়া মহল্লায়। স্বামী মৃত্যূবরণ করেছেন। ছেলে মহরম হোসেন (২৫) রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। ছেলে বৌমাসহ তিনজনের পরিবার তার। নেই কোন জমা জমি দালান কোঠা। মায়ের দেওয়া দুই শতক ও বোনের নিকট থেকে কেনা দুই শতক মোট চারশতক জায়গার উপর বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে নির্মাণ করেছেন দোচালা একটি টিনের ঘর ও একটি ছাপড়া ঘর। ছেলে বৌমা ও কেতুকী, পায়েল, আকাশ, বাতাস, রাতুল, নুপুর, গদাসহ হরেক নামের বিড়ালগুলো নিয়ে সেই স্বর্গেই বসবাস করেন আলেফা।

আলেফা বলেন, “ছোট বেলা থেকে বিড়াল পালন করে আসছি। বিড়ালগুলো আমার অতি আপন। এখন ৪৫ টি বিড়াল পালন করছি। বাচ্চা হয়। মারা যায়। তাই বিড়ালের সংখ্যা কমে বাড়ে। ওদের যখন নাম ধরে ডাকি ওরা আমার কাছে চলে আসে। ওরা আমার কথা আমার ইশারা আমার বাংলা ভাষা সব বোঝে। চেয়ার, চকি, খড়ির ঘর, রান্না ঘড়ে ওদের বিছানা পাতা থাকে। ওরা সেখানে ঘুমায়। কম করে হলেও প্রতিদিন অন্তত আড়াই কেজি চালের ভাত ও একশ টাকার মাছ লাগে ওদের। মাসে ছয় সাত হাজার টাকা খরচ করি ওদের পিছনে। আমার কাউন্সিলর ভাতার সব টাকা ওদের পিছনে খরচ করার পর ও ছেলের নিকট থেকে নিতে হয়।” তিনি আরও বলেন, “মাছ রান্না করে কাটা বেছে লবন ভাতের সাথে মাখিয়ে প্লেটে প্লেটে খেতে দেই। ওরা পরম তৃপ্তির সাথে খায়। ঘড়ে চিকন সুরঙ্গ পথ কাটা আছে। দরজা জানালা বন্ধ থাকলে ওরা সুরঙ্গ পথে যাতায়াত করে। বাড়ির কোন অন্যায় করে না। ওদের হাড়ি পাতিল আলাদা। ওরা সেগুলো চিনে। ওদের পিছনে সব টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় কোন টাকা জমাতে পারি না। ওদের ফালায়া ও দিবার পারি না। ওরা আমার মুখ নাড়ে। মাথা নাড়ে। আমার সেবা করে। আমাকে আদর করে। আশা করছি ওরা যতদিন আছে আমার যতই কষ্ট হোক তত দিন ওদের খাওয়াবো”।

pic-6

আলেফা বলেন, “কয়েক বছর পূর্বে বেজি পালন করতাম। বৈশাখ ও শিমলা আমার প্রিয় দু’টি বেজীর নাম। বৈশাখ আমার বাড়িতেই থাকতো। এখানে ওখানে ঘুড়ে বেড়াতো। ঘোড়া শেষ হলে বাড়ি ফিরে আসতো। শিমলা থাকতো বাড়ির পাশর্^বর্তী জঙ্গলে। শিমলাকে জঙ্গলেই খাবার দিতাম। এক পর্যায়ে পনেরো ষোলটি বেজি হয়ে যায় আমার। হোটেলে জবাইকৃত মুরগির উচ্ছিষ্টাংশ কিনে এনে খাওয়াতাম। একদিন বৈশাখ অনেক বেজি সাথে নিয়ে আমার বাড়িতে হাজির। আমি মন খারাপ করলে বৈশাখ ওদের তাড়িয়ে দেয়। ও কেবল আমার মুখের ভাষা নয় হয়তো মন ও বুঝতো।” তিনি বলেন, আমার ছেলে এবং আমি বাড়ির একই চাবি ব্যবহার করতাম। দুজনে আমাদের জানা একটি জায়গায় চাবি লুকিয়ে রাখতাম। একদিন বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে আমি এবং আমার ছেলে চাবি না পেয়ে ধারণা করি বৈশাখ হয়তো কোথাও ফেলে রেখে এসেছে চাবি। আমি বৈশাখকে দূরে ফেলে রেখে আসতে চাই। একটু পরে বৈশাখ জঙ্গল থেকে চাবি খুঁজে মুখে করে নিয়ে বাড়ি চলে আসে। একবার অসাবধনতাবশত আমি টুলে বসার সময় টুলের পায়ার চাপায় বৈশাখ লেজে খুব আঘাত পায় এবং আমার পায়ে কামড় দিয়ে রক্তাক্ত করে। আমি বৈশাখকে মারতে উদ্যত হলে এ পশুটি আমার রক্তাক্ত পা চুষে চুষে পরিষ্কার করে দেয়। পরে আমি সুস্থ হয়ে উঠি।” তিনি আরও বলেন, “একদিন চোর ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কানের স্বর্নালঙ্কার খোঁজার চেষ্টা করে। এসময় বৈশাখের চিৎকারে জেগে উঠে আমি উল্টো চোরকে ধরে ফেলার চেষ্টা করি। ওকে ছোটবেলা ফিডারে দুধ খাওয়াতাম। যেখানেই থাকুক আমার ডাক কানে গেলে আমার কাছে ছুটে আসতো। সাপের সাথে ওর শত্রুতা ছিল। আমার বেজি যখন সাপ মেরে মানুষের বাড়িতে বা বাড়ির পাশর্^বর্তী এলাকায় ফেলে রাখতো তখন গন্ধ বের হতো বলে প্রতিবেশীরা আমার বেজী পালন ভালো চোখে দেখতো না। এক পর্যায়ে প্রতিবেশীর বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে বেজি গুলো মারা যায়”।

pic-7

এলাকার কুকুরের অকৃত্রিম বন্ধু যেন আলেফা কাউন্সিলর। কুকুরের গলায় আটকে যাওয়া হাড় বের করতে আলেফার জুড়ি মেলা ভার। এলাকার কুকুরেরাও তা জানে। তাই কোন কুকুরের গলায় হাড় ফুটলে বা আটকে গেলে আলেফার আশপাশে এসে ঘুরবে কুকুরটি। আলেফা জানান, অনেক কুকুরের গলায় ফোটা বা আটকে যাওয়া হাড় মুক্ত করেছেন তিনি। একবার তিনি এক জোড়া মেছো বাঘ পালনের চেষ্টাও করেছেন বলে জানান।

প্রাণী পালন সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই বর্ণনা করেন আলেফা কাউন্সিলর। তিনি এর সাথে আরো বলেন, “দীর্ঘদিন এসব পশু পালন করায় এদের রোগ ব্যাধি সম্পর্কেও ধারণা হয়েছে আমার। ওদের অসুখ বিসুখ হলে বনের গাছ গাছালি খাওয়াই। কখনো নিয়ে যাই প্রাণী সম্পদ অফিসে”।

আলেফার পুত্রবধু হালিমা বলেন, “এত গুলি বিড়াল পালন করা আমাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। মা (শ^াশুরী)’র সব টাকাই খরচ করে বিড়ালের পিছনে। নিজে কখনো ভালো কাপড় চোপর পড়ার সুযোগ পান না। পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না। তারপরও এসকল প্রাণী তিনি বহু বছর যাবত পালন করে আসছেন”।

চাটমোহর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. স্বপন চন্দ্র দেবনাথ জানান, আলেফার পশুপ্রেম সত্যই প্রশংসনীয়। তার আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় বিড়ালগুলোকে পর্যাপ্ত খাদ্য ও স্বাস্থ্য সম্মত বাসস্থান দিতে পারছেন না। এটি সম্পূর্ণ অলাভজনক। পশুর প্রতি যে তার কতটা মমত্ব তা না দেখলে বুঝবার উপায় নেই। পোষা প্রাণী বিড়াল কিছু জেনেটিক রোগ ছড়ায়। এর মধ্যে র‌্যাবিস একটি। এ রোগটি বিড়ালের মাধ্যমে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আলেফা কেবল বিড়াল, কুকুর, বেজিসহ অন্যান্য পশুর বন্ধুই নয়; তিনি এ এলাকার ছোট বড় প্রায় সকল মানুষের বন্ধু। কারো বিপদে আপদে আলেফা ছুটে যান তার পাশে। এমনও দেখা গেছে সহায় সম্বলহীন আলেফা ভোট চাইতে গিয়ে মানুষের বাড়ি উঠান আঙিনা ঝারু দিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন অথবা মাছ কুটে দিচ্ছেন। মানুষের কাজে সহায়তা করছেন তিনি। দিনে রাতে। সব সময়। এলাকার অধিকাংশ মানুষ তাদের প্রিয় মুখ আলেফাকে দুই দুইবার প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করেছেন পৌর কাউন্সিলর।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: