সাম্প্রতিক পোস্ট

মঠবাড়িয়ায় ঘূর্ণিঝড় ফণির ছোবল: মরা শস্য নিয়ে বিপন্ন কৃষক

দেবদাস মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি,উপকূলীয় অঞ্চল 

পঞ্চাশোর্ধ কৃষক আনোয়ার হোসের দুই একর জমি বন্ধক রেখে এবার রবি মৌসুমে মুগ ডালের আবাদ করেছিলেন। জমি চাষ বাবদ দুই হাজার টাকা, বীজ, সার ও পরিচর্যাবাবদ আরও আট হাজার টাকা ব্যয় করেন। একর প্রতি ১৪ মণ মুগডাল ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ধার দেনা করে এ কৃষক স্বপ্ন বীজ বুনেছিলেন। মাঠের মুগডাল ফসল এক কর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন কৃষক। কিন্তু বৈরী প্রকৃতি সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে লবণ পানির প্লাবণে ডাল ফসলের মাঠ ৩ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতায় পড়ে মাঠের ফসল মার খায়। এখন পচে যাওয়া মরা ফসল নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক আনোয়ার হোসেন।

SONY DSC

শুধু আনোয়ার নন, উপকূলীয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে অতি জোয়ারের প্লাবণে বলেশ^র নদ তীরবর্তী এলাকায় রবিশস্যের এখন মরা। ফণীর প্রভাবে ভারি বর্ষণ ও অতি জোয়ারের তোড়ে বলেশ^র নদের ক্ষেতাছিড়া মোহনার দুইটি পয়েন্টে বিপন্ন বেড়িবাধের ফাটল ধরে চার গ্রামের বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ প্লাবিত হয়। ফলে বোরো ধান ও মুগডালের পাশাপাশি বিভিন্ন মৌসুমী ফসল পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন হাজারো কৃষক। এছাড়াও অনেক মৌসুমী চাষীরা মরা ফসল নিয়ে এখন বিপন্ন দশা।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফণির প্রভাবে উপজেলায় পাঁচ সহস্রাধিক কৃষক অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অন্তত ৫০০ হেক্টর জমির ফসল জলাবদ্ধতায় পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে ডাল জাতীয় ১৫৩ হেক্টর, বোরো ধান ২৮ হেক্টর, ভুট্টা ১৭ হেক্টর ও মরিচ, মিষ্টি আলু, চিনা বাদাম, সূর্যমুখি ও শাখসবাজি ক্ষেতসহ ২০ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। কৃষি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী সর্বমোট ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকের কাছে এ ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি।

অপরদিকে চলতি বোরো মৌসুমে কম ফলন, নেক ব্লাস্ট রোগ এবং সর্ব শেষ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সর্বশান্ত হয়ে বোরো ধান নিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেক টাকার ধানও ঘরে তুলতে না পারছেন না কৃষক পরিবার। বোরো উৎপাদনের সবচেয়ে বড় কৃষিব্লক উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়ন।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত বছর উপজেলায় ৮ হাজার মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হয়। যার সিংহ ভাগ উৎপাদন এ ইউনিয়নে। এবার সহস্রাধিক একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন কৃষকরা। বোরো জাতের মধ্যে বিনা-১০, ব্রী-৭৪ ও ২৮। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রী-২৮ ধান।

ঘোপখালী গ্রামের কৃষক শাহাদাত খান (৩৫) এর প্রায় ১ একর জমির ব্রী-২৮ ধান ব্লাস্টের আক্রমণে নষ্ট হয়ে গেছে। এপর্যন্ত ২০/২২ হাজার টারও অধিক খরচ হলেও তার অর্ধেক টাকার ফসলও এবার এ কৃষকের ঘরে উঠবেনা। ছোট শৌলা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন গাজী (৪৮) জানান, প্রায় ২ একর জমিতে বোরো চাষ করে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও জলাবদ্ধতায় অধিকাংশ ধান চিটা হয়ে যাওয়ায় অর্ধেক টাকার ধানও পাবেন না। এসব এলাকার আধা পাকা ধান ক্ষেত ঘূর্ণিঝড় ফণির পানিতে তলিয়ে রযেছে।

সরেজমিনে মঠবাড়িয়ার সাপলেজা ইউনিয়নের ক্ষেতাছিড়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ফণির দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গত ভারি বৃষ্টিতে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় সকল শ্রেণির কৃৃষক ক্ষতির কবলে পড়েছেন। ক্ষেতাছিড়া গ্রামেও কৃষি জমিতে এখন পচে যাওয়া ডাল ফসল নিয়ে পাঁচ সহ¯্রাধিক কৃষক এখন মহা বিপাকে। ক্ষেতাছিড়া পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে ফণির প্লাবণে ক্ষেতাাছিড়া, মধ্য ক্ষেতাছিড়া, কচুবাড়িয়া ও পশ্চিম ক্ষেতাছিড়া গ্রামের মুগডালের মাঠে এখনও অবাঞ্ছিত পানি। মাঠের পর মাঠ মুগডাল পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

SONY DSC

মধ্য ক্ষেতাছিড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে বলেশ্বর নদের ক্ষেতাছিড়া মোহনার বাঁধ ভেঙে গ্রামে জোয়ারের পানির প্লাবন দেখা দেয়। এখনও মাঠে লবণ পাণির আগ্রাসন। ডালক্ষেত পচে সব নষ্ট। একরে ১৪/১৫ মণ ডাল উৎপাদনের আশা ছিল কিন্তু এখন এক মণ ডালও পাবেন না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এখন আমন ফসলের জন্য অপক্ষো করতে হবে।

পশ্চিম ক্ষেতাছিড়া গ্রামের বিপন্ন ডাল চাষী রত্তন মিয়া বলেন, ‘আমাগো ভাঙা বাঁধ মেরামত না দিলে আগামী আমন মৌসুমে ধানের আবাদ করেও লাভ হবে না। জমিতে লবণ পানি ঢুকে আবার তা নষ্ট হবে। আমাগো ত্রাণ লাগবে না বাঁধ দেন।’
ক্ষেতাছিড়া গ্রামের ইউপি সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় সিডরে বলেশ^র নদের ক্ষেতা ছিড়া পয়েন্টের বাঁধ ধ্বসে যাওয়ার পর আজ অবধি তা কার্যকরভাবে নির্মাণ হয়নি। প্রতিবছর এ নদী তীরের চার গ্রামের ফসলহানীর জন্য এখন এই ভাঙা বাঁধ একটা মরণ ফাঁদ। জরুরি বাঁধ না দিলে এলাকার কৃষি ও কৃষক মরবে।’

এ বিষয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শওকাত হোসেন বলেন, ‘আগাম বন্যা নিয়ে কৃষকের মাঝে সতর্ক করা হয়েছিল তা না হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যেত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে এখন আমন ফসলের ওপর ভরসা করতে হবে। বিষয়টি দেখার জন্য প্রত্যেক উপ-সহকারী কৃৃষি অফিসারদের নির্দেশনা হয়েছে।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: