সাম্প্রতিক পোস্ট

স্বনির্ভর একজন নারী সেলিনা বেগম

সিংগাইর, মানিকগঞ্জ থেকে শিমুল বিশ্বাস
মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের বাংগালা গ্রামের কৃষাণি সেলিনা বেগম। ৪৬ বছর বয়সী এ নারী জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজ নিজের পরিবার এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এখন তিনি গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের অন্যতম অবলম্বন। নিজের কর্মতৎপরতায় সেলিনা বেগম নিজ গ্রামের মানুষের কাছে যেমন সমাদৃত তেমনি বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে তৈরি হয়েছে কার্যকরী সম্পর্ক। ইতিমধ্যে তিনি বলধারা ইউনিয়নের কৃষি স্ট্যান্ডিং কমিটি, নবগ্রাম স্কুল কমিটি এবং বাংগালা কমিউনিটি ক্লিনিকের সদস্য হিসাবে যুক্ত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে ঘটিত হয়েছে সিংগাইর উপজেলা নারী উন্নয়ন কমিটি। তিনি যুক্ত হয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলা নারী উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে। আত্ম মনোবল ও কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন সেলিনা বেগম। এ প্রতিষ্ঠা পেতে তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে নানান ঘাত-প্রতিঘাত।


৩৩ বছর আগে নিজের অমতে বিয়ে করেন প্রতিবেশী আ: বারেককে। সংসার বিমুখ স্বামীকে নিয়ে জীবনে কখনো সুখ পাননি তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জীবনের শুরুতে না পাইছি স্বামীর ভালোবাসা, না দেখছি টাকা পয়সার মুখ।’ সংসারের হাল নিজের হাতে তুলে নিতে হয়েছে তাকে। সেলিনা বেগমের স্বামী আ: বারেক’র কোনদিনই সংসারে মন ছিলো না। স্বামীর বাড়ি একই গ্রামে হওয়ার কারণে সেলিনা বেগম বর্তমান স্বামী বারেককে আগে থেকেই চিনতেন!


জীবনের প্রয়োজনে সেলিনা বেগম সর্বদাই উন্নয়ন ভাবনাকে অনুসন্ধান করেছেন। গ্রহণও করেছেন নিজের মত করে। তার এই আগ্রহকে হাতছাড়া করেনি বারসিক। ২০১৩ সালে সেলিনা বেগম সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয় বারসিক’র কাজের সাথে। গড়ে তোলেন বাংগালা নবকৃষক কৃষাণি সংগঠন। তার নেতৃত্বে সংগঠনের সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করে বারসিক। সংগঠন পর্যায়ে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। অন্য সদস্যদের সাথে নিজেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, জৈব কৃষি চর্চা বিষয়ে। বিশেষত ভার্মি কম্পোস্ট, জৈব কম্পোস্ট, জৈব বালাইনাশক তৈরি বিষয়ে। তাছাড়া সরকারের বিভিন্ন সেবা সহযোগিতা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন বারসিক কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন সভা, আলোচনা সভা, সংলাপ, মতবিনিময় সভা, দিবস উদযাপন, মানববন্ধন, র‌্যালিসহ নানাবিধ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে।


অভিজ্ঞতালদ্ধ জ্ঞান দিয়ে তিনি শুরু করেন কৃষি কার্যক্রম। প্রথমে তিনি ২ বিঘা জমিতে কৃষি কাজ শুরু করেন। প্রথম বছর ৮ মণ সরিষা পান। তিনি জানান ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য তিনি নিজে মাঠে কাজ করতে শুরু করেন। জমি রোপণ, সার দেওয়া, নিরানো, ফসল উত্তোলন যাবতীয় কাজ । নিজে মাঠে কাজ করতেন বলে সমাজ তাকে কম হেয় করেনি। তথাপি থামেনি সেলিনা বেগম। সংসারে আয় বাড়ানোর জন্য তিনি গরু পালনের চিন্তা করেন। সরিষা এবং ধান বিক্রির টাকা দিয়ে ৫২ হাজার টাকা দিয়ে একটি গাভী গরু ক্রয় করেন। এক বছরের মাথায় গাভীর একটা বাচ্চা হয়। পরের বছর জমিতে ১৫ মণ সরিয়া হয়। বাছুরটা বিক্রি করেন ৩৪০০০ টাকা। সরিষা বিক্রি করেন ২৪০০০ টাকা । তিনি আরেকটা গাভী ক্রয় করেন ৫৮০০০ টাকা দিয়ে। এ ভাবেই বাড়তে থাকে সেলিনা বেগমের আয়ের উৎস। বর্তমানে মাসিক আয় ২০০০০ টাকা।


এখন সেলিনা বেগম স্বনির্ভর একজন নারী। একদিন সংসারের দৈন্যদশা দূর করতে স্বামীকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পরও স্বামীর অভ্যাসের কোন পরিবর্তন আসেনি। মেলেনি সংসার খরচের কোন টাকা পয়সা। যে কারণে সংসারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বামীর মতামতের কোন পাত্তা দেন না সেলিনা বেগম। সন্তান লাপলন পালন, সংসার চালানোসহ যাবতীয় কাজের সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি লেখাপড়া শিখতে পারি নাই। তাই অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। আমি আমার সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর ব্যাপারে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ২ মেয়ে বিয়ে দিয়েছি নিজে পছন্দ করে।”


শুধু নিজের সংসারের সিদ্ধান্ত নয়। গ্রামের অনেক মানুষ আসে সেলিনা বেগমের কাছে পরামর্শ ও বিভিন্ন সহযোগিতা নিতে। বিশেষত জমি জমা সংক্রান্ত কোন ধরনের জটিলতা, রোগী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলাসহ নানাবিধ কাজে গ্রামবাসী সেলিনা বেগমের সহায়তা নিয়ে থাকেন। তিনি নিজ গ্রাম সহ আশেপাশের গ্রামের মানুষের কাছে সমাদৃত হয়ে উঠেছেন। যে কারণে অধিকাংশ মানুষ তাকে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করার অনুরোধ করছেন। এ প্রসঙ্গে সেলিনা বেগম বলেন, ‘মানুষ তো আমার কাছে আসেই। অনেকসময় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে উপকার করবার পারিনা। তাই আমার ভবিষ্যতের ইচ্ছা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করে আমি সামনের দিনগুলোতে জনগণের সহযোগিতা করে যাবো।’
সেলিনা বেগমের মন্তব্য নারী হোক কিংবা পুরুষ। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে চাই একাগ্রতা ও নিষ্ঠা। তবে নারীদের ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন ধরনের বাধা থাকে। তাই নারী জাগরণ বা নারী মুক্তির জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে সামাজিক ও পারিবারিক বাধাগুলো ছিন্ন করা দরকার বলে সেলিনা বেগম মনে করেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: