সাম্প্রতিক পোস্ট

‘কার্বন নিঃসরণ ও অক্সিজেন নিশ্চিত করণে কৃষক সংগঠনের বৃক্ষ রোপণ

নেক্রকোনা থেকে রোখসানা রুমি
বৈশ্বিক মহামারী করোনা থেকে রক্ষার অন্যতম উপায় হলো শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা। আর এজন্য প্রত্যেকের প্রতিদিনের খাবারের ম্যানুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে টাট্কা শাক-সবজি, ফলমূল, ডিম, দুধ, মাছ ও মাংস রাখা প্রয়োজন। দেশে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, আর এ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় জাতের প্রাচীন ফলদ ও ঔষধি গাছগুলো কেটে মাছের খামার, গবাদী পশু-পাখির খামার ও বিদেশী প্রজাতির একক ফলের বাগান করা হচ্ছে। ফলে গ্রামের মানুষসহ দেশের আপামর জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণে বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বিদেশী প্রজাতির আগ্রাসী কাঠ ও ফলের বাগান করার ফলে এলাকার পরিবেশ প্রতিনিয়ত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

নেত্রকোনা অঞ্চল এক সময়ের বৈচিত্র্যময় ফলের গাছে ভরপুর ছিল। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের এসব ফল ও বৃক্ষ বৈচিত্র্য। বিশেষভাবে অল্প সময়ে অধিক বৃদ্ধির আশায় এ অঞ্চলের মানুষ এলাকার বাস্তসংস্থান, পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্যের কথা চিন্তা না করে স্থানীয় জাতগুলো ধ্বংশ করে রোপণ করছে একাশিয়া, ইউক্যালিপটাস, রেইনট্রি, মেহগনিসহ আগ্রাসী প্রজাতির গাছ। আশুজিয়া কৃষক সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন মাধ্যমে আগ্রাসী প্রজাতির এসব গাছের পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত ও প্রাণবৈচিত্র্যগত ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে এলাকা উপযোগি পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণের।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত প্রভাবে সৃষ্ট দূর্যোগ মোকাবেলায় নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা আশুজিয়া ইউনিয়নের “আশুজিয়া কৃষক সংগঠন’র উদ্যোগে প্রতি মৌসুমে সদস্যদের বসতভিটা, গ্রামের রাস্তার দু’পাশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বৈচিত্র্যময় গাছের চারা রোপণ করে আসছে। চলমান বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সংকটে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বৈচিত্র্যময় ফল ও ঔষধি বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি থেকেই বিগত বছরগুলোর ন্যায় চলতি মৌসুমেও সংগঠনটির উদ্যোগে প্রত্যেক সদস্যের বাড়িতে ৩টি করে মোট ১০০টি আম, পেয়ারা ও কাঁঠালের চারা রোপণ করা হয়েছে। সংগঠনের উদ্যোগে আশুজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থীকে দু’টি করে ফলদ ও কাঠ বৃক্ষের চারা প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফলদ, ঔষধি ও কাঠ জাতীয় গাছের চারা বিতরণের ফলে স্কুলের শিক্ষার্থীরাও সংগঠনের সাথে এলাকার পরিবেশ উন্নয়নে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচিতে সামিল হতে পেরেছে।

এ বিষয়ে সংগঠনের সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা স্থানীয় জাতের ফল ও ঔষধি গাছ লাগাই। বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতির গাছগুলোতে পাখি বাসা বাঁধতে পারেনা এবং পাখি খাদ্যও পায় না। দেশি জাতের বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলায় এলাকার পাখি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এবং খাবারের জন্য অন্য এলাকায় চলে গেছে। এলাকায় পাখি দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিদেশী আগ্রাসী গাছের জন্য আমাদের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা আগে ফলমূল কিনে খাইতাম না, নিজের গাছের ফল খাইতাম আর আতœীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠাতাম। এখন ফলের গাছগুলো কেটে ফেলায় আমরা প্রয়োজনমত ফল খাইতে পারিনা। তাই আমাদের পুষ্টির চাহদা পূরণ হচ্ছেনা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং রোগবালাই বেশি হচ্ছে। বিদেশী ফলের জন্য অনেক স্থানীয় জাতের ফলের স্বাদ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। তাই আগের সেই দিন ফিরিয়ে আনতে এবং এলাকার পরিবেশ সুন্দর বৈচিত্র্যময় পরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা ফলের গাছ লাগাচ্ছি।’

পারুল আক্তার বলেন, ‘এলাকার পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে বেশি বেশি বিভিন্ন ধরণের গাছের চারা রোপণ করতে হবে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে পুষ্টির প্রয়োজন আছে, আর পুষ্টি আসে টাট্কা শাক্-সবজি, ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার থেকে। তাই সকলকে প্রতি মৌসুমে নিজ উদ্যোগে ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে হবে। পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও এলাকার পরিবেশের উন্নয়নে আমারা প্রতি বছরের ন্যায় এ মৌসুমেও ঔষধি বৃক্ষ নিম ও বিভিন্ন দরণের ফলের চারা রোপণ করেছি। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে তালের মৌসুমে আমরা গ্রামের তিন কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশে তাল বীজ রোপণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি, সোনার চেয়েও খাঁটি।’ মাটি তখনই সোনা হবে, যখন প্রতিটি ইঞ্চি মাটি সঠিকভাবে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তাই প্রতি ইঞ্চি মাটি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহারের আহবান জানিয়েছেন। আমাদের দেশের অনেক সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা কেন্দ্র (হাট-বাজার), ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গন (মস্জিদ, মাদ্রসা, মন্দির, গীর্জা), রাস্তার দু’পাশ (সড়ক/গ্রামীণ রাস্তা), নদীর চর ও বাঁধগুলোতে এলাকা উপযোগী স্থানীয় জাতের কাঠ, ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সাড়া দিয়ে আশুজিয়া কৃষক সংগঠনের ন্যায় দেশের সকল সংগঠন ও জনগোষ্ঠী নিজ নিজ এলাকার পতিত জমিতে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ, বৈচিত্র্যময় ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করলে একদিন সত্যিই আমাদের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি সোনারে চেয়েও দামী হয়ে উঠবে। প্রতিটি গ্রামের পরিবেশ হবে সুষ্ঠু, সুন্দর, নির্মল ও বসবাসযোগ্য।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: