Posted in

আমাজন বনের তিমেতিও কেমন আছো?

ঢাকা থেকে পাভেল পার্থ

পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আমাজন বন। বলা ভালো এক করপোরেট নয়াউদারবাদী দুনিয়া খুন করে চলেছে দুনিয়ার এই বৃহত্তম বর্ষারণ্য। গলে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে শুধু কী গাছপালা লতাগুল্ম? পাখি পতঙ্গ সরীসৃপ স্তন্যপায়ী? নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে জানা অজানা এক ঐতিহাসিক অরণ্য সভ্যতা। খানখান হয়ে যাচ্ছে আমাজন জংগলের আদিবাসী জীবন। শত সহস্্র বছর ধরে আমাজনের আদিবাসী মানুষেরাই এই জংগলের রক্তনালী জীবন্ত রেখে চলেছেন। মানুষ হিসেবে এই বনের সাথে খবরদারি করেনি, বরং নিজেদের ভেবেছে বনের এক নগণ্য অংশ হিসেবে। আমাজন বনের আদিবাসী মানুষের এই জটিল অরণ্য-দর্শনকে দুমড়েমুচড়ে এক করপোরেট দুনিয়া হামলে পড়লো জংগলের ওপর। অরণ্যের গিলা-কলিজা-রক্তনালী ছিঁড়েখুঁড়ে তুলে আনতে শুরু করলো খনিজ। কাঠবাণিজ্যের জন্য লাগাতার খুন হলো গাছগাছালি। নির্দয় ধনীর দুলালেরা পিৎজা হাট, ম্যাগডোনাল্ড কী কেএফসির দশাসই খাবারগুলো গিলবে বলে মাংস দরকার। গতরে আহাম্মকী মাংস জমাতে ঘাস দরকার। ঘাসের জন্য জমিন দরকার। করপোরেট কোম্পানির ঘাস চাষের জন্য বিরান হলো জংগলের পর জংগল। আমাজনের উপর করেপোরেট খুন ধর্ষণ থামানোই যাচ্ছে না। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বাণিজ্য দরবারকে আড়ালে রেখে আমাজন বন নিশ্চিহ্ন করে করে তৈরি হলো বায়োডিজেল প্রকল্প। কেবল জংগল নয়, নয়াউদারবাদী উন্নয়নের নামে প্রতিদিন উদ্বাস্তু আর নিরুদ্দেশ হতে লাগলো আমাজনের আদিবাসী সভ্যতা। যে সর্বগ্রাসী উন্নয়ন দুনিয়ার বৃহত্তম জংগলের বাসিন্দাদের নিরুদ্দেশ করছে নিরন্তর, নিদারুণভাবে এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াই প্রশ্নহীনভাবে ডাকাতি করেছে আমাজনের আদিবাসী বিজ্ঞান। গবেষণা আর উন্নয়নের নামে আমাজনের আদিবাসী জ্ঞান ডাকাতি করেই ডাকসাইটে হয়ে চলেছে ‘আধুনিক ঔষধ বাণিজ্য’। এই হলো দুনিয়ার বৃহত্তম অরণ্যভূমির এক নিদারুণ খুদে আখ্যান। আজ আবারো বাণিজ্য দুনিয়ার লোভের আগুনে পুড়ছে এই বন। অথচ পুরো দুনিয়া কত নির্বিকার। কত নির্দয়। কত নিশ্চুপ। যে বন এখনো দুনিয়ার বিশ ভাগ অক্সিজেন জোগান দেয় সেই বন অঙ্গার হচ্ছে শত শত অকৃতজ্ঞ জাতিরাষ্ট্রের সামনে। আমাজনের এই সাম্প্রতিক অগ্নিকান্ডে প্রমাণ আরো মজবুত হলো এই করপোরেট দুনিয়া কোনো আমাজন বন চায় না। কিনাবালু, সিনহারাজা, মিন্দো-নামবিল্লো, দেইনট্রি, জিসুয়াংবান্না, টংগাস, কঙ্গো, মিয়াম্বো, সুমাত্রা, পাপুয়া, ল্যাকানডান কী সুন্দরবন চায় না।

২.
আমাজনের এই দুঃসময়ে খুব মনে পড়ছে এডলফো তিমেতিওর কথা। তিমেতিও আমাজনের ব্রাজিল অংশের একজন বাসিন্দা। তিমেতিও গুয়ারানি আদিবাসী জাতির মানুষ। প্রায় ৫০০ বছর আগে যখন আমাজন অরণ্যে ইউরোপীয় উপনিবেশ শুরু হয় তখন গুয়ারানিদের সাথেই সাদা চামড়াদের প্রথম সাক্ষাত হয়। গুয়ারানিদের জনসংখ্যা নিরন্তর কমছে। ব্রাজিলের সাতটি রাজ্যে বর্তমানে মাত্র ৫১,০০০। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও প্যারাগুয়েতেও কিছু বসতি আছে। ব্রাজিলের গুয়ারানিরা কাইওয়া, নানদেভা ও মাবিয়া এই তিনটি প্রধান গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তিমেতিও কাইওয়া গোষ্ঠীর। কাইওয়া মানে ‘অরণ্যের মানুষ’। পঞ্চাশোর্ধ তিমেতিওর সাথে সাক্ষাত হয়েছিল ২০১০ এর অক্টোবরে। ইতালির টুরিনে অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব মাতৃদুনিয়া উৎসবে (টেরা মাদ্রি)’। তিমেতিও যখন নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন আমার তখন বাংলাদেশের মিজো, মান্দি কী সাঁওতাল বন্ধুদের কথা মনে হয়েছিল। মধুপুর শালবনে এক মান্দি শিশু তার নাম বলেছিল ‘ব্রিংনি বিবাল’ মানে বনের ফুল। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ কী বিরল উপজেলার নামগুলো ‘বীর’ শব্দ থেকে এসেছে। সাঁওতালি ভাষায় বীর মানে জংগল। বান্দরবানের মিজো জনগণ নিজেদের বনপাহাড়ের সন্তান মনে করেন। মিজো ভাষায় মি মানে মানুষ আর জো মানে পাহাড়। এক দয়ালু পর্তুগীজভাষীর কল্যাণে কয়েকদিনের জন্য বুঁদ হয়ে গেছিলাম গুয়ারানিদের আমাজন জংগলের জটিল সংসারে।

৩.
টুরিনের রাস্তায় তিমেতিও শুনিয়েছিলেন আমাজন জংগল হারানোর নির্দয় সব কাহিনি। আজ নয় বছর আগের পুরনো খাতা খুলে তিমেতিওর আহাজারিগুলো যখন পড়ছি যেন প্রতিটি উচ্চারণ থেকে উসকে পড়ছে দগদগে পোড়া দাগ। পর্তুগিজ, ফরাসী ও ডাচ উপনিবেশের জন্য গুয়ারানিদের মতো আমাজন অরণ্যের আদিবাসীরা নিজেদের অঞ্চল ও ভাষা হারিয়েছে। বহিরাগত উপেিনবেশ ও লোভের বাণিজ্য আমাজন বনে প্রশ্নহীন গণহত্যা করেছে। জংগল কী মানুষের সংসারে নানা দুরারোগ্য অসুখবিসুখ আমদানি করেছে। গুয়ারানিদের আদি বিশ্বাস এই মাতৃদুনিয়া এক পবিত্রসত্তা, এখানকার প্রাণজগতও পবিত্র। মানুষ একতরফাভাবে এই পবিত্রতা বিনষ্ট করতে পারে না। এই দুনিয়ার ওপর মানুষের কোনো বিশেষ এখতিয়ারও নাই। কিন্তু বাইরে থেকে আসা মানুষেরা আমাজন বনের আদিবাসীদের কথা শুনেনি। বুঝতেও চায়নি। বাইরের মানুষেরা জংগলের পবিত্রতা খানখান করে দিয়েছে। আদিবাসীদের বননির্ভর জীবন, কৃষি ও জীবিকা সবই বহুজাতিক খনন ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য হুমকির মুখে পড়েছে। আমাজন বনে প্রতিদিন বৈচিত্র্য কমছে। কত জানা অজানা প্রাণ যে হারিয়ে যাচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। এভাবে চলতে থাকলে কেবল আমাজন নয়, এই গোটা দুনিয়াটাই এক কঠিন অসুখে পড়বে। ঈশ্বর নয়, মানুষেরাই এই পৃথিবীকে জোর করে শাসন করছে। মেরে ফেলতে চাইছে। তিমেতিওর সাথে বাংলাদেশের আদিবাসী জীবনের নানা গল্প বিনিময় করি। আমার ডান হাতটি মুঠোয় নিয়ে তিমেতিও বলেন, নিশ্চিত করে বলতে পারি আদিবাসীরা যে জ্ঞান ও নীতির প্রচলন করেছে দুনিয়াকে বাঁচিয়ে রাখার রসদ খুঁজতে এই জীবনের দিকেই আমাদের জীবন মেলাতে হবে।

৪.
২০১৫ সনে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আলাপ হয় পেরুর ট্রাসিলা রিভেরা জিআ ও গুয়াতেমালার ললা কেবনালের সাথে। তারাও তিমেতিওর মতো আমাজনের আদিবাসীদের অরণ্য হারানোর কাহিনি শুনিয়েছিলেন। ট্রাসিলা চিরাপাক নামের একটি সংগঠন কাজ করেন পেরুর আদিবাসীদের নিয়ে। ট্রাসিলা জানান, আমাজন অরণ্য নির্ভর আদিবাসীদের টিকে থাকাই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি আজ। বহুজাতিক কোম্পানির নানা উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি প্রবল রাষ্ট্রীয় অসযোগিতা সারা বিশ্বের আদিবাসীদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত সমস্যা। দিন দিন বৃষ্টির ধরণ পাল্টাচ্ছে, তাপমাত্রা অনিয়মিত হচ্ছে। ব্যাপকহারে বনভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীরা এই সর্বনাশের জন্য কোনোভাবেই দায়ী না হলেও এর ঝুঁকি সামলাতে হচ্ছে তাদেরই। ললা কেবনাল কাজ করেন ‘এসোসিয়েশন এক টিনামিট’ নামের এক আদিবাসী সংগঠনে। ললা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক দেনদরবারে আদিবাসীদের অস্তিত্ব একেবারেই গুরুত্বহীন। অথচ আদিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবেই পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান ও সংস্কৃতির ভেতর এক দারুণ সম্পর্ক তৈরি করে চলেছেন। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনেও দেখেছি আমাজনসহ অরণ্যনির্ভর আদিবাসী জীবনের আহাজারিগুলো অনুচ্চারিতই থেকেছে।

৫.
আজ যখন চোখের সামনে বুকের ভেতর পুড়ছে আমাজন, খুব মনে পড়ছে তিমেতিওর কথা। না জানি কেমন দুশ্চিন্তা নিয়ে আছেন গুয়ারানি আদিবাসীরা? কেবল গুয়ারানি নয়; নুকাক, ওয়ারানি, কায়াপো, আমানিই, আতিকুম, আওয়া-গুয়াজা, বানিওয়া, বোটোকডু, বারা, এনাওনি নাওয়ে, কাদিওয়ে, কানিগাং, কামাইওরা, কারাজা, কুবেও, কাক্সিনাওয়া, কোকামা, করোবো, কুলিনা মাদিহা, মাবিয়া, মাকুক্সি, মাটসেস, মায়োরুনা, মুন্দুরুকু, মুরা, নাম্বিকওয়ারা, ওফাওয়ে, পাই তাভিতেরা, পানারা, পানকারাউয়ু, পাতাক্সু, পাইতার, পতিগুয়ারা, সাতিরে মাউয়ি, সাউরি দু পারা, তাপিরাপি, তারিনা, তিকুনা, ত্রিমেম্বি, তুপি, ওয়াজাপি, ওয়াপিক্সানা, ওয়াজা, উইটোটো, জাকরিয়াবা, জাভান্তে, জুকুরু কিংবা ইয়ানুমামি আদিবাসীরা কেমন আছেন এই অগ্নিদগ্ধ সময়ে!

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.