সাম্প্রতিক পোস্ট

সোলার ভিলেজে আলোকিত ধুমঘাট গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া

সাতক্ষীরা থেকে রামকৃষ্ণ ও মননজয় মন্ডল

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিদ্যূতের উপর চাপ কমানো বিদ্যুৎ বিহিন গ্রামে বিদ্যুৎ সেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বৃদ্ধিতে নানা ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। সরকারি যুগান্তকারী তেমনি একটি উদ্যোগ সোলার ভিলেজ স্থাপন। বাংলাদেশের উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ৮নং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশান এর মাধ্যমে ‘সোলার ভিলেজ’ স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ সরকার এ কাজে বিভিন্ন এনজিও বা প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করার জন্য আহবান জানান। এর অংশ হিসেবে  বারসিকও এর অংশ হয়। ২০১৫ সালের প্রতিষ্ঠিত সোলার ভিলেজের বর্তমান অবস্থা এবং এর ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবর্তনগুলো চোখে পড়েছে তা বারসিক নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
1
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধূমঘাট গ্রামের সোলার পল্লীর মাধ্যমে ১১২টি পরিবারে একটি করে সোলার সহযোগিতা করা হয়। প্রতিটি পরিবারে একটি করে ৩০ ওয়াটের সোলারের মাধ্যমে একটি সোলার প্যানেল, একটি ব্যাটারী, একটি কন্ট্রোলার, ৩টি বাতি, একটি মোবাইল চার্জার এবং প্রয়োজনীয় তার একই সাথে দেওয়া হয়। এ সকল পরিবারে একটি করে লক্ষ্মী ঘট (মাটির ব্যাংক) দেওয়া হয়, যাতে করে সকলেই নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারে। প্রয়োজনে সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে সোলার হোম সিস্টেম ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের এসকল পরিবার সোলারের মাধ্যমে নতুনভাবে আলোকিত জীবন শুরু করে।

সোলার প্রাপ্তিতে এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ, বিনোদন, স্বাস্থ্য সেবাসহ পারস্পারিক সহযোগিতার মাত্রাগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সোলার ভিলেজ বিষয়ে ধুমঘাট গ্রামের আদব আলী, মনিন্দ্র নাথ সরকার, সুভাস চন্দ্র বর্মণ ও ইলিয়াস হোসেন জানান, আগে তাদের প্রতি সপ্তাহে কেরোসিন তেল দিয়ে টেমি (বাতি) বা হ্যারিকেন ব্যবহার করে আলো পেতেন। এখন সোলারের মাধ্যমে আলো পান। ছেলে মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি সময় পড়ালেখা করছে। অনেকেই রাতের বেলাতে সোলারের আলোতে কাঁথা সেলাই করতে পারে। এর ফলে কিছুটা পরিবারভিত্তিক আর্থিক উন্নয়ন ঘটছে।
2
সোলার প্রাপ্ত দোকানী নাজমা বেগম বলেন, “সোলারটি পাওয়ার ফলে আমার দোকান চালাতে সুবিধা হয়েছে। পূর্বে সন্ধ্যা নামলে কোন ক্রেতা পাওয়া যেত না। বর্তমানে গ্রামে সোলারের আলো থাকার ফলে এবং আমার নিজের দোকানেও আ্েরলা থাকার ফলে বেশিক্ষণ বেচাকেনা করতে পারছি। ফলে আমার পরিবারের আর্থিক উন্নয়ন ঘটেছে’’।

“মানুষের অন্ধকার জীবনের অবসান হয়ে আলোকিত জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। মানুষের জীবনের একধাপ উন্নতি ঘটেছে।” বলে মনে করেন স্থানীয় ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়াডের ইউপি সদস্য বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল। বীরেন্দ্রনাথ মন্ডলসহ গ্রামটির সকলের ভাষায় উঠে এসছে নিচের পরিবর্তনের ধারাগুলো যা নিচে উল্লেখ করা হলো।
১.  সোলার ব্যবহারকারীদের সাথে সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে কথা বলে জানা গেছে, আগে যখন এলাকায় সোলার ছিল না, তখন রাতে চলাচলে কিছুটা পারিপার্শিক ভয় বা সংকোচ ছিল। কিন্তু সোলার আসার পর থেকে সেটার অনেকটা সমাধান হয়েছে। বর্তমানে রাতের বেলা উঠানে বা পথের পাশে সোলার বাতি ব্যবহার করে আলোকিত করা হচ্ছে। ফলে নারী ও শিশুসহ পুরুষেরা স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দে চলাচল করতে পারে। তুলনামুলক ছোট খাট চুরি বা ডাকাতির মাত্রা কমেছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

3
২.    বিদ্যালয় থেকে ফিরে সন্ধ্যা হবার আগ পর্যন্ত যেটুকু সময় পেত শিক্ষার্থীরা সেইটুকু সময় পড়াশুনা করতো। অন্ধকার নেমে এলেই তারা ঘুমায়ে যেত। এখন সুইচ চাপ দিলেই ঘরময় আলো, ফলে শিক্ষার্থীরা বেশি সময় ধরে পড়ালেখা করতে পারে। রাতের বেলা শিক্ষার্থীরা বেশি সময় পড়ালেখা করতে পারছে বলে ভালো রেজাল্টের হার বেড়েছে।
৩.  বর্তমানে সোলারের মাধ্যমে নিজের বাড়িতে মোবাইল চার্জ দিতে পারছে। তারা এখন ঘরে বসেই মোবাইলের মাধ্যমে ফেইসবুক, ই-মেইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই তথ্য আদান প্রদান করতে পারছে এবং দেশ-বিদেশের ঘটে যাওয়া সব ধরনের খবর দেখতে পাচ্ছেন।
৪.   তথ্যদাতারা জানান, সোলার ব্যবহারে তাদের বিনোদনের ক্ষেত্রটি প্রসারিত হয়েছে। এলাকার হিন্দু, মুসলিম একইসাথে রাতের বেলা সোলারের আলোতে লুডু ও তাস খেলে বিনোদনসহ অবসর সময় কাটায়। বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিও বাড়ছে। যাদের বাড়িতে সোলার নেই তারা সোলার বাড়িতে মোবাইল ও লাইট চার্জ দিতে আসে। যেকারণে উভয় পরিবারের মধ্যকার সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
৫.  স্থানীয়দের মতামত অনুযায়ী, পরিবারের কোন সদস্য অসুস্থ হলে লাইটের আলো সারারাত জ্বালিয়ে রাখে। তারা মনে করেন আলোর মধ্যে থাকলে রোগীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা মানসিক প্রশান্তি পান।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে গড়ে তোলা সোলার ভিলেজ একটি দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ। যেটা বর্তমান সময়ের নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার এর একটি উল্লেখ্যযোগ্য উদাহরণ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: