Posted in

জেয়ালা গ্রামের কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য

সাতক্ষীরা থেকে সাঈদুর রহমান

“আমার বাড়ি যাইয়ো ভ্রমর বসতে দিবো পিড়ে, জলপান করতে দিবো শালুই ধানের চিড়ে, ইন্নি ধানের মুড়ি দিবো বিন্নি ধানের খই আরো আছে ছবরি কলা গামছা পাতা দই।” আবহমান গ্রাম বাংলার, গ্রামের এমন চিত্র হয়তো এখন আর দেখা যায় না। কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে অনেক কিছুই। তবে এত কিছু হারানোর মধ্যেও সাতক্ষীরা জেলার জেয়ালা গ্রামের মানুষ তাদের মতো করেই আজও টিকিয়ে রেখেছেন গ্রামবাংলার এসব চিত্রসহ কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য। তাই তো দেখা গেছে, গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে রয়েছে আম, নারিকেল, খেঁজুর, পেঁয়ারা, কাগুজি লেবু, তেতুল, জামরুল, জাম ইত্যাদি ফলের গাছ। তারা প্রত্যেকে এখনও সযতেœ লালনপালন করছেন মেহগনি, নিম, শিশু, শিরিস গাছ বিভিন্ন বনজ গাছ। এছাড়াও তাদের বসতভিটায় রয়েছে বাবলা, বট, মান্দার  মতো গাছগুলোও। copyগ্রামের অনেক বসতবাড়িতে জিবল গাছ বেড়া হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন প্রকার গাছের পাশাপাশি জেয়ালা গ্রামে নানা প্রজাতির বাঁশও জন্মে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভেলকু বাঁশ, জাবা বাঁশ এবং তল্লা বাঁশ ইত্যাদি। শুধু তাই নয় জেয়ালা গ্রামের অধিবাসীরা এখনও টিকিয়ে রেখেছেন নানা ধরনের মসলাসহ সুপারি, তেজপাতা, ঝাল, পেঁয়াজ, রসুন, সজিনা, ডুমুর, সাড়া, ভেননা, ঢাকি ভেননা, শাপলা, কচুরিপনা, ঢোল কলমি, ভাটুই ইত্যাদি। প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা প্রতিটি প্রাণকে তাঁরা সযতেœ যেমন লালনপালন করেন ঠিক তেমনি বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানগুলোকে তারা তাদের বসতভিটায় আবাদ করেন। এভাবে তারা যেমন নির্মল বাতাস পান, পুষ্টি চাহিদা পূরণ করেন ঠিক তেমনি নানান রোগবালাই নিরাময় করার প্রাকৃতিক পথ্য পান।

নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদেই এই গ্রামের কৃষকরা নানা রকমের শাক সবজি চাষ করেন। এ সকল শাক সবজির মধ্যে রয়েছে লাল শাক, ডাটা শাক, পালন শাক, ফুলকপি, ওলকপি, বিট কপি, পাতা কপি, মান কচু, মুকি কচু, কচুর লতি। এছাড়া তাদের চাষবাসে রয়েছে কুমড়া, লাউ, পাট শাক, সরিষা শাক, মূলা, বেগুন, মৌরি, পটল, মেটে আলু কলা (কাচ, বড় বেউলা, কাঠালি, পেশু ধোপ, তুলসি ডয়রা, পুপি ডয়রা, মর্তমান, নিমোচা, চাপা কলা, কাবিল কলা, ঠোটি কলা, সাগর কলা ইত্যাদি। বারোমাসেই তারা নানান ধরনের শীতকালীন, বর্ষাকালীন ও বারোমাসী শাকসবজি আবাদ করেন। গ্রামের উচু ভিটায় তারা চাষ করেন খুটু আলু, চুপড়ি আলু, শাক আলু, চীনের আলু, শিম, বরবটি, ঢেড়শ, খিরাই, শশা, পেচেঙ্গা, ঝিঙে, উচ্ছে। বর্তমানে গ্রামটিতে পানি সিংড়ার চাষও শুরু হয়েছে।

kopy
বেঁচে থাকার জন্যই এ গ্রামের মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের প্রতি তাদের দরদ ও ভালোবাসা অগাধ। তাই তো তাদের অনেকের বাড়িতে বিভিন্ন ধরণের ফুলের গাছ রয়েছে। ঘাস ফুল, গাদা ফুল প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই রয়েছে। কিছু কিছু বাড়িতে টগর ফুলও রয়েছে। গোলাপ, জবা, কামিনী, কদম, কৃষœচূড়া, পাতা বাহার, দুপুরে ফুল, বেলি ফুল এগুলো তো প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে রয়েছে। এসব ফুল তাদের বাড়ির সৌন্দর্য্য যেমন বৃদ্ধি করে ঠিক তেমনি মানুষকে প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ করে তুলে। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য্য অবগান করে প্রকৃতির প্রতি মানুষকে আরও অনুরাগ করে তুলে। ফুলের পাশাপাশি জেয়ালা গ্রামে এখনো টিকে আছে নানা প্রজাতির ঘাস। এদের মধ্যে দুবলা (দূর্বা), শ্যামা, ঘুম, জবা, জাবি, মুতুঘাস, কাজলা ঘাস ইত্যাদি প্রধান। গ্রামটিতে বর্তমানে নেপিয়ার (চাষকৃতঘাস) ঘাসের চাষ ও শুরু হয়েছে। এ ছাড়াও নানা ধরনের অচাষকৃত লতাও দেখা যায়। এদের মধ্যে রয়েছে স্বর্ণলতা, নিমুক, আলোকলতা, গইলা ইত্যাদি প্রধান। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান সংরক্ষণ করার কারণে এসব উপকরণ গ্রামে সহজলভ্য যা মানুষের জীবনচলাকে আরও সহজতর করে তুলে। গ্রামবাসীরা চিতে গাছ ও ভেননা গাছকে প্রাকৃতিক বেড়া হিসাবে ব্যবহার করেন।

এছাড়া জেয়ালা গ্রামে এখনো টিকে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির অচাষকৃত শাকসবজি। গ্রামের পুকুর এবং ডোবাগুলোতে কলমি শাক ও হেলেঞ্চা শাক জন্মে। অনেক জলাশয়ে শাপলাও জন্মে। পতিত জমিতে এবং বেড়ে (চারিদিকে ঘেরা উচু জমি) কাটানটি শাক, থানকুনি শাকও জন্মে। ধানের জমির আইলে প্রচুর ব্রাক্ষ্মি শাক হয়। গ্রামের ডোবা, জলাশয় ও খানায় (পরিত্যাক্ত পুকুর) শোলা কচু এবং কচুর লতি জন্মে। গ্রামের বসতবাড়ির ঘিরার গায়ে  তেলাকচু শাক জন্মে। রাস্তার পাশে বুনো কচু হয়। এ বুনো কচুর পাতা গ্রামের ঋষি পাড়ার মানুষের তরকারির একটি প্রধান উৎস। এছাড়াও পতিত জমিতে পেপুল শাক, গাদো শাক, বউটুনি, চেলো নুটি শাক, সনচি শাক হয়। যেগুলো খেয়ে গ্রামের অনেক পরিবার তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করেন। গ্রামের ঋষি পাড়ার শান্তি রানি দাশ বলেন,“তরকারি না থাকলি রাস্তার পাশতে কচুর পাতা তুলি, বিলিরতে হিলাঞ্জ আর কলমি শাক তুলিও মাঝে মাঝে খাই। ” জেয়ালা গ্রামের কৃষক ইমদাদুল হক বলেন, “রাস্তার পাশের কচু শাক, হেলাঞ্চ, কলমি শাক ইত্যাদি গ্রামের মানুষের খাদ্যের একটি বড় উৎস”। IMG_20161204_162754

শুধু তাই নয় গ্রামের খালবিলে ও পাওয়া যায় নানা প্রজাতির মাছ। এ গুলোর মধ্যে রয়েছে পুঁটি, শোল, কই, মাগুর, শিং (জিয়ল), চ্যাং, বেতলা, বাইন, চিংড়ী (গলদা, ডিম্ল), টেংরা ইত্যাদি। এ সকল মাছ ধরে গ্রামের অনেক প্রান্তিক মানুষ তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছেন, একই সাথে জীবিকা নির্বাহও করছেন। জেয়ালা গ্রামের অনেক বাড়িতে নানা ধরনের ঔষধি গাছও রয়েছে। এ সবের মধ্যে রয়েছে তুলসি, বাকসা, শিউলি, থানকুনি ইত্যাদি। জেয়ালা গ্রামের গৃহিনী তাহেরা খাতুন তাই বলেন, “ছেলে মেয়েদের সর্দি কাশিতে তুলসি পাতা বেটে খাওয়াই, মাঝে মাঝে শিউলি ফুলের পাতার রসও খাওয়াই। পেট খারাপ হলে থানকুনির পাতা বেটেও খাওয়াই ”।

জেয়ালা গ্রামে এখনো নানা প্রজাতির পাখি রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে  কাক, কোকিল, দোয়েল, ফিংঙে, চড়–ই, ঘুঘু, শালিক (গাং শালিক, গুই শালিক), বক (কুজ বক,ডাড় বক), টুনটুনি, পেচা, কাঠ ঠোকরা ইত্যাদি। গ্রামটিতে টিকে থাকা কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য ধরে রাখতে পারলে এবং হারানো বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে পারলে গ্রামটি একটি শান্তির নীড়ে পরিণত হবে বলে অভিমত অনেকের।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.