Posted in

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় মহিষ একটি অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ

তানোর রাজশাহী থেকে মো. শহিদুল ইসলাম শহিদ

বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থায় মহিষ একটি অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। বরেন্দ্র অঞ্চলে এক সময় কৃষকদের অধিকাংশ বাড়িতে এক জোড়া করে মহিষ থাকতো। সবুজ বিপ্লব আর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন আসার পর মহিষ এর প্রয়েজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই এখন আর কৃষকদের বাড়িতে মহিষ দেখা যায় না। অতীতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি পরিবারে গরু ও মহিষের গাড়ীকেই একমাত্র পIMG_20170509_110701রিবহন মনে করা হতো। বর্তমানে রাস্তার ঘাটের উন্নয়ন হওয়ার ফলে কৃষি উপকরণ আর ফসল পরিবহন এর মাধ্যম অনেক দ্রুতগামী হয়েছে। তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামের কৃষকদের মহিষ পালন করা আর হয়ে ওঠে না। কিন্তু ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা গেছে রিশিকুল গ্রামের কিছু পরিবার। এখনও এক জোড়া করে মহিষ পালনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা।

গ্রামটিতে চারটি পাড়ায় বিভক্ত। ৪টি পাড়া মিলে গ্রামটিতে প্রায় ২০০টি পরিবার বসবাস করেন। তার মধ্য থেকে দুটি পাড়ার ১০১টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে দেখা যায় ১৭ টি পরিবারে এক জোড়া করে মোট ৩৪ টি মহিষ রয়েছে। গ্রামবাসীর মতে, তাদের গ্রামে ত্রিশটি পরিবারে প্রায় ত্রিশ জোড়ায় মোট ৬০ টি মহিষ রয়েছে। কিন্তু আশাপাশের অন্য গ্রামগুলোতে মহিষ পালনের চিত্র কিন্তু একেবারে ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহীর পবা উপজেলার মাধবপুর, তানোরের আড়াদিঘী ও গোকুল মথুরা এবং গোদাগাড়ীর বড়শিপাড়া এই চারটি গ্রামে মোট ১০০ টি পরিবারের মধ্যে মাত্র একটি বাড়িতে মহিষ রয়েছে। এতে দেখা যায়, রিশিকুল গ্রামটিতে আগে থেকেই মহিষ পালনের যে ঐতিহ্য ছিল সেটি আজও কৃষকরা ধরে রেখেছেন।

অন্য গ্রামে মহিষ পালন করেন না, কিন্তু আপনারা কেন পালন করেন? এ বিষয়ে জানা যায় যে, মহিষ এই এলাকার ভূমির গঠন এবং স্থানীয় প্রকৃতির সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  এখানকার উচু নিচু জমির জন্য অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে মহিষের টানা গাড়ি ও লাঙল বেশি সহায়ক। জমি চাষ, মই দেওয়া, ধান এবং অন্যান্য ফসল জমি থেকে ঘরে তোলাসহ প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হতো মহিষকে। সেই প্রচলন এখনও ধরে রেখেছে এই গ্রামের অধিবাসীরা। এক জোড়া মহিষ একজন কৃষকের অনেক কাজ করে দেয়। নিজেদের পরিবারের কাজ ছাড়াও অন্যের জমির কাজ এবং ফসল তোলার কাজের মাধ্যমে বাড়তি আয়ও হয়। অন্যের জমি থেকে বিঘা প্রতি ৫০০ (পাঁচ শত) টাকা করে ফসল তোলার কাজে লাগান মহিষ এর গাড়ি। এছাড়া প্রতি বছর মহিষ থেকে প্রচুর পরিমাণে গোবর সার পেয়ে থাকে; সেগুলো মহিষের গাড়িতে করেই জমিতে ছড়িয়ে দেয়। ফলে ফসলের উৎপাদনও বেশি হয়। অন্যান্য কৃষকের চেয়ে প্রতি বছর এক বিঘা জমিতে ৮-১০ মণ ধান বেশি পায় বলে গ্রামবাসীর দাবি। মহিষ অন্যান্য খাবারের চেয়ে খড় খায় বেশি। আর খড় তো জমি থেকেই পাওয়া যায়। তাই মহিষের খাবারের জন্য বাড়তি কোন খরচ বা ঝামেলা পোহাতে হয় না। গোবরের জ্বালানি ব্যবহার ও বিক্রিও করা যায়। আর সর্বোপরি ২-৩ বছর বাদে মহিষ বিক্রি করার সময় প্রায় ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। মহিষের মাধ্যমে এই কাজ গুলো করতে তারা যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন; তেমনই এটি বেশ স্বাশ্রয়ী। তাই এখনো তারা মহিষকে নিজেদের জীবন এবং জীবিকার অংশ হিসেবে ধরে রেখেছে।

IMG_20160823_125330মহিষ পালনের এই ধরনের নানা সুবিধা এবং স্থানিক সম্পর্ক থাকার পরেও দিনকে দিন মহিষ পালনে আগ্রহ হাারাচ্ছে কৃষক পরিবার। এর অন্যতম একটি কারণ রয়েছে এখানকার পানির সংকট এবং ভূপৃষ্ঠস্থ পানির উৎসগুলো কমে যাওয়া এবং বানিজ্যিক মৎস্য চাষে ব্যবহার করা। মহিষ পালনের জন্য প্রয়োজন পানি। বিশেষ করে পুকুর, নালা এবং খাড়ি। কিন্তু দিন দিন এটি কমে যাচ্ছে। এ সম্পর্কে স্থানীয় কৃষক আব্দুর রশিদ (৪২) বলেন, “মহিষের গোসল করানোর জন্য আমাদের সমস্যা হয়। পুকুর আছে তবে সকল পুকুরে খরার সময় পানি থাকে না। আবার অনেক পুকুর লিজ দেয়ার কারণে পানিতে মহিষ নামাতে দেয় না। তাই দুরে নিয়ে খাড়িতে গোসল করাতে হয়।” তাছাড়া মহিষ এর রোগ-ব্যাধির ক্ষেত্রে চিকিৎসা বর্তমানে বেশ অপ্রতুল।

মহিষ লালন পালনের এই ঐহিত্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ভাবনা জানতে চাইলে ‘স্বপ্নের ভেলা’ সংগঠনের সভাপতি সোহেল আরমান (২৭) বলেন, “আমাদের গ্রামের মানুষ দাদার আমল থেকেই মহিষ পালন করে আসছেন। মহিষ আমাদের এলাকা উপযোগী গৃহ পালিত ও উপকারি প্রাণী। আমরা চাই এই এতিহ্য ধরে রাখতে। তাই কোন কঠিন রোগে মহিষ বা গবাদি পশু যাতে মারা না যায় তাই টিকা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েছি। তার আলোকে প্রাথমিক অবস্থায় আমরা সেচ্ছায় চারটি পাড়ার গবাদি পশুর তথ্য সংগ্রহ করতেছি।”

রিশিকুল গ্রাম থেকে উপজেলা প্রশাসন প্রায় ৩০-৩২ কিঃ মিঃ দুরে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রাণী সম্পদ বিভাগের সাথে তাদের যোগাযোগ খুব কম। সরকারিভাবে ইউনিয়ন পর্যায় যদি প্রাণীসম্পদের চিকিৎসা পাওয়া গেলে সুবিধা হতো বলে স্থানীয়রা মনে করেন। এছাড়াও প্রতিবছর সরকারিভাবে সকল গৃহপালিত প্রাণির কঠিন রোগগুলো প্রতিরোধের জন্য সরকারিভাবে টিকার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি, সরকারি ভৃ-পৃষ্ঠস্থ পানির উৎসগুলো সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা। তাহলে প্রাণীসম্পদ এর একটি প্রজাতি; যা স্থানীয় প্রকৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থার অংশ মহিষ পালনে আগ্রহী হতো রিশিকুল এর মতো আরো অনেক বরেন্দ্র গ্রাম।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.