সাম্প্রতিক পোস্ট

ছুটন্ত মানুষ, জ্বলন্ত দুনিয়া, ঝুলন্ত জলবায়ু-সভা

:: পাভেল পার্থ, লা বুর্জ, প্যারিস, ফ্রান্স থেকে

SAM_7505এক
বয়স তখন পয়ঁত্রিশ। চৈত্র্যের এক প্রবীণ বিকাল। সুন্দরবনের আমবাড়ী খালে থেমেছে মৌয়াল দলের নৌকা। বন থেকে সংগ্রহ করা মধুভান্ডগুলো সাজাতে গিয়ে চোখ পড়ে বাদাবনের কিনারায়। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এক মাদী বাঘ। এভাবেই কখনো ঢাংমারী চর, কালির চর, কালাবগীতে বাঘের মুখোমুখি হয়েছেন বারোবার। সুন্দরবনের ওয়াজেদ সর্দারের মত মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে, চুনারিসহ বনজীবীরা বাঘ কি কুমিরের সাথে সামিল হয়েই সংগ্রহ করে চলেছেন মধু, মোম, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা কি গরানের ছিটে। ওয়াজেদ সর্দারের জন্ম খুলনার পাইকগাছার গড়ইখালী ইউনিয়নের পাতরাবুনিয়া গ্রামে। শিবসা নদের ধারে। কিশোর বয়স থেকেই পরের নৌকায় বনে যাওয়া শুরু। কালাবগী, নলিয়অন, ঢাংমারী, দুবলারচর থেকে বেজাখালী। পরিবারের কৃষিজমি ছিল ১০ কাঠা। বনে যাওয়ার পাশাপাশি আবাদ করেছেন জমিও। আশির দশকে রপ্তানিমুখী বাণিজ্যিক চিংড়িঘের শুরু হলে তা ঝাঁপিয়ে পড়ে পাতারবুনিয়াতেও। চোখের সামনে খুন হয়ে যায় ধানের জমিন। চিংড়ি ঘেরের ফলে জমিগুলো লবণাক্ত হতে থাকে। পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ডুবে ভেসে যায় বসতজমিন, ঘর-দুয়ার, সংসার। চারধারে লবণ পানি আর লবণজলের ঘের। বনে যাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বনবিভাগ বাধা দেয়, বনে বাড়ে বনদস্যুর অপহরণ বাণিজ্য। বাধ্য হয়ে পারিবারিক পেশা ছেড়ে মানুষের বাড়ি ও জমিনে দিনমজুরির কাজ নেন। গ্রাম থেকে গ্রাম দিনমজুরের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আর জায়গা হয় না সবার। জন্মমাটি ছেড়ে ২০১৩ সনে চলে আসেন ঢাকায়। পাইকগাছা থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে এসে নামেন গাবতলী। কিছুই জানা ছিল না ঢাকার, কেউই ছিল না পরিচিত। প্রথম দশদিন মানুষের কাছে চেয়ে চিন্তে খেয়েছেন, ঘুমিয়েছেন রাস্তার ফুটপাতে। একদিন জুটে যায় নির্মাণকাজের দিনমজুরি। তার নিজের ভাষায় ‘রাজমিস্ত্রির জুগালি’। থাকা শুরু করে মোহাম্মদপুর বেরীবাঁধ বস্তিতে। মাসিক ভাড়া ৩২০০ টাকা। গ্রাম ছাড়ার আগেই তিন মেয়ের বিয়ে দিন। কয়েকদিন পর স্ত্রীকে নিয়ে আসেন ঢাকা। স্ত্রী এক দুরারোগ্য ব্যধিতে মহাখালী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর ভেতর নিজেই বের করেন আয় রোজগারের উপায়। মুড়ি, মশলা, ঝুড়ি, কাগজ, চানাচুর কিনে ২০১৫ সনের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে মোহাম্মদপুর বেরীবাঁধ এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন। ৩০ নভেম্বর ২০১৫ থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে শুরু হওয়া ২১তম জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণের আগে আলাপ হয় ওয়াজেদ সর্দারের সাথে। জানি অনেকেই ওয়াজেদ সর্দারদের জলবায়ু-শরণার্থী বানিয়ে দিয়েছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু দেনদরবারে ওয়াজেদ সর্দারদের নামে তহবিল আদায় নিয়ে লড়ছেন। কিন্তু তাতে কী যায় আসে তার? জলবায়ু দরবারের কোথাও তো তাঁর জায়গা নেই। বাস্তবতা হলো নানান আঘাতের অনিবার্যতা নিয়েই জন্ম হয় ওয়াজেদ সর্দারদের। লড়ে যেতে নিজেরই রক্ত-ঘামে। ওয়াজেদ সর্দারের কাছে জানতে চেয়েছি প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের কাছে তার চাওয়া কী? বিস্ময় আর ক্ষোভ নিয়ে মুড়িতে মশলা মাখান তিনি। ঝাঁঝঅলা সেই মশলার ঘ্রাণ নিয়ে প্যারিস রওনা হই।

দুই
শার্দ দ্যু গাল বিমানবন্দরে নেমে মেট্রো রেলে এসে নামি গার্দ দ্যু নর্দে। রাস্তায় ওঠেই বিস্ময়। বাংলাদেশ থেকে আসা তরুণেরা কেউ বা বাদাম, কেউ মোবাইল সিম কার্ড, কেউ খেলনা বিক্রি করছে। আর বাংলাদেশীদের একটা বড় অংশ কাজ করছে হোটেল, দোকান ও রেস্টুরেন্টে। প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের নামের আগেও একটি প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে ‘অভিবাসী’। হয়তো এখনও কেউ তাদের জলবায়ু-শরণার্থী বানাতে পারেনি। অনেকের বৈধ কাগজপত্র হয়ে গেছে, অধিকাংশই কাগজের জন্য লড়ছেন। রাস্তার পাশ থেকে ভাজা বাদামের ধোঁয়ায় ওয়াজেদ সর্দারের সেই মশলার ঝাঁঝ টের পাই। সংখ্যা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও প্যারিসে প্রায় ত্রিশ হাজার বাংলাদেশী বসবাস করছেন। অধিকাংশরাই জানালেন, দেশে কাজ নেই। গ্রামে ক্ষেত কৃষি করে তেমন একটা আয় রোজগার হয় না। তাই এত দূরের বিদেশে আসা। সিলেট, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, পাবনা, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরার অনেকের সাথে পরিচয় হয়। হঠাৎ মনে পড়ে যায় এসব অঞ্চলে একসময় ফরাসী ও ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ফরাসী উপনিবেশকালে ওয়াজেদ সর্দারের এলাকাকে ফরাসীরা বলতো স্যান্দারবান। নীলকুঠি গুলি টিকে ছিল ফরাসী ফ্যাশন বাণিজ্যের কসরত হিসেবেই। নীল বিদ্রোহের রক্তাক্ত টীকা বুকে নিয়ে বাংলাদেশের এক উত্তর প্রজন্ম আজ প্যারিসে আছে ‘আশ্রয়প্রার্থী’ হিসেবে। প্যারিসের বাংলাদেশীরা যে যেভাবে পেরেছেন বাংলাদেশ থেকে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়া সবাইকেই সহযোগিতা করেছেন। অনেক বাংলাদেশী প্যারিসে একটি আন্তর্জাতিক সভায় অংশ নিচ্ছে তার উচ্ছ্বাস যেন ঠিকরে পড়ছে সবার চোখেমুখে। কিন্তু জলবায়ু দরবার নিয়ে তাদের অধিকাংশেরই কোনো সম্পর্ক নেই। দিনরাত কাজ আর কাগজ ঠিক করাই প্যারিসের জীবন। কিন্তু যাদের সাথেই আলাপ হয়েছে তারা সকলেই এক ন্যায্য জলবায়ু চুক্তির জোর দাবি জানান। ন্যায্য বলতে তারা বুঝিয়েছেন মানুষ যাতে তার জন্মমাটিতে মৌলিক নাগরিক অধিকারসহ নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

SAM_7531তিন
প্যারিস যেন এক জাদুঘর। কিন্তু লা দ্য ফস এলাকায় গড়ে ওঠছে এক নতুন বিলাসী কর্পোরেট প্যারিস। সন্ধ্যারাতে লা দ্য ফসের এক বিশাল বিপণিবিতান পেরুনোর সময় আলো-অন্ধকারের ভেতর এক নারী বিপণিবিতানের দেয়াল ঘেঁষে বসে কী যেন খাচ্ছিলেন। চারধারে তার নানাকিছু ছড়ানো। জানলাম তিনি একজন আলজেরীয়। তার নামের আগে লেগেছে আরেক তকমা ‘শরণার্থী’। মনে পড়ে যায় পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত তৈলচিত্র ‘উইমেন অব আলজিয়ার্সের’ কথা। ১৯৫৪-৫৫ সনের দিকে উজ্জ্বল রঙে কিউবিক ধারায় ছবিটি এঁকেছিলেন পিকাসো। তখনও ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত এই লড়াই চলে। পিকাসোর সেই ছবিটি ২০১৫ সনের ১১ মে বিশ্বের এক দামি শিল্পকর্ম হিসেবে নিলামে বিক্রি হয়। ১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার। রাস্তায় হাটতে হাটতে জানলাম প্যারিস আলজেরিয়া, আফ্রিকা ও সিরীয় শরণার্থীদের সামাল দিচ্ছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় আলজেরীয় সেই শরণার্থী নারীর অচেনা খাবার থেকেও ভেসে আসা গন্ধে ওয়াজেদ সর্দারের মশলার ঝাঁঝ টের পাই। জলবায়ু সম্মেলনে দেখি বিশ্ব নেতাদের দরবার। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও আরবের মতো ধনী বিলাসী রাষ্ট্র। অপরদিকে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত গরিব দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্র। মাঝখানে আছে চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়ন অর্থনীতির দেশ। প্যারিস সম্মেলনে সবারই জায়গা হয়েছে। শুধুমাত্র ওয়াজেদ সর্দার, অভিবাসী, শরণার্থীর মতো মানুষেরা নেই। যারা নিরন্তর হামলা আর আঘাত সহ্য করে টিকিয়ে রাখছেন এই মাতৃদুনিয়া। দরবার চলছে উষ্ণতার মাত্রা নিয়ে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রী, তার নিচে, ১.৫ ডিগ্রী নাকি দুই ডিগ্রীর বেশি এই নিয়ে। ধনী আর বিলাসী রাষ্ট্রগুলো তাদের লাগামহীন বিলাসিতা পরিবর্তন করবে না। তারা কতটুকু কার্বন নির্গমণ করবে কী করবে না এটি কেউ বাধ্যবাধকতায় আনতে পারবে না। ধনী দেশের নির্দয় কার্বনে গলে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে এই পৃথিবী। গরিব দেশগুলো এই জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় অস্থির। তারা ক্ষতিপূরণও দিতে চাইছে না, সবকিছু ক্ষমতার ধমকে আড়াল করে ফেলতে চাইছে। ক্ষতিপূরণের নামে শর্তসহ চাপিয়ে দিতে চাইছে ঋণ-বাণিজ্য। বৈশ্বিক এই দরবারে সকলেই চেয়ে আছে বিশ্ব বাহাদুরদের দিকে। ঠিক যেমন নীলচাষের সময় সাহেবদের দিকে তাকিয়ে থাকতো নীলচাষিরা। ঠিক যেমন সেলাই মেশিনকে জীবন্ত রেখে লাশ হয়েও বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকেরা তাকিয়ে থাকেন জেসিপেনি, এডিডাস, নাইকি, লাকস্টে, হার্ডফোর্ড কি পিগালির মালিকদের দিকে।

SAM_7576চার
জলবায়ু সংকট এভাবে শুধুমাত্র একটি চুক্তির মাধ্যমে কাটতে পারে না। বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ও বাহাদুরিকে প্রশ্ন করতে হবে। ধনী-গরিবসহ সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান শ্রেণিদ্বন্দ্ব খারিজ করতে হবে। তা না হলে এক সংকট আরেক সংকট হয়ে আসবে। বৈশ্বিক জলবায়ু-রাজনীতি কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের মরভিয়ান কলেজের কলা বিভাগের অধ্যাপক স্টিফেন স্টুডার্ড। প্যারিস জলবায়ু সম্মেনের ৪নং কক্ষে এসব বিষয়ে তার সাথে দীর্ঘ আলাপ হয়। ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ প্রত্যয়টির ভেতর তিনি পুঁজিবাদী সভ্যতার সংকট, ইউরোপের দীর্ঘ মন্দা, অভিবাসী ও শরণার্থী সমস্যা, সন্ত্রাস ও হামলা, কর্পোরেট বাণিজ্য সকল কিছুই খুঁজে দেখতে চান। বিশ্বব্যাপী ধনী ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের অভ্যাস ও রাজনৈতিক কৌশল না বদলায় তবে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ আরো সংকটময় করে তুলবে পৃথিবীর ভবিষ্যত। জলবায়ু তর্কে সবাই মুখিয়ে আছে মার্কিন নীতি ও অবস্থানের উপর। প্যারিস সম্মেলনে আসা মার্কিন প্রবীণ নাগরিক এলিজাবেথ থর্ণডাইক ও জেমস হোয়াইটের সাথে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়। দু’জনেই শিক্ষকতার জীবন শেষ করেছেন। জেমস হোয়াইটের বয়স এখন ৯৯। সম্ভবত তিনিই প্যারিস সম্মেলনে যোগ দেয়া সবচে’ প্রবীণজন। উভয়েই জানান, জলবায়ু সংকট কাটানোর জন্য আমেরিকাসহ ধনীদেশগুলোর মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। মার্কিন কংগ্রেস ও রিপাবলিক দলের মধ্যকার ভোট-রাজনীতি হিসেবে এই সমস্যা দেখলে চলবে না। এটি পৃথিবীর সকলের অস্তিত্বের সাথে জড়িত।

পাঁচ
রবিবার জলবায়ু সম্মেলনের কাজ ছিল না। মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্যারিস আবাস খুঁজতে যাই ভার্সাই। তিনতালা বাড়ির দোতালায় একটা ছোট ‘নেমপ্লেট’ লাগানো। জন্মভূমি থেকে দূরের লা সাইন নদীর তীরেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন কপোতাক্ষের ঝাঁঝ। যে ঝাঁঝ নিয়ে ছুটে চলেছেন ওয়াজেদ সর্দার, অভিবাসী বাঙালি কি শরণার্থী সেই আলজেরীয় নারী। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ভাষ্য, দুনিয়ায় প্রতি ৯ জনে এক জন মানুষ প্রতি রাতে না খেয়ে রাত কাটায়। ঠিক এই দুনিয়াতেই চল্লিশ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এক বোতল পানি। এলিজাবেথ থর্নডাইকের মেয়ে সুসান ল্যাসি বাংলাদেশে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল। এলিজাবেথ জানান, আমেরিকার অধিকাংশ জনগণ জলবায়ু সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের মতো সকল মানুষের পাশে আছে। ফিরে গিয়ে আমার মেয়ে ও অন্যদের বলবো, আমরা সবাই একটি চমৎকার চুক্তির জন্য লড়ছি। ভাবছি দেশে ফিরে এলিজাবেথের বার্তাটি ওয়াজেদ সর্দারকে দিবো।

গবেষক ও লেখক।

animistbangla@gmail.com

happy wheels 2

Comments