Posted in

প্রকৃতি রাঙানো বর্ষার ফুলের সমারোহ

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) ॥
বর্ষা মানে বাহারী রঙের সুগন্ধী ফুলের সমাহার। বর্ষা যেন আমাদের প্রকৃতিকে আপন করে বিলিয়ে দেয় এবং এর ফুলের সৌন্দর্য আমাদের করে তোলে বিমোহিত। বর্ষার নানারকম ফুলগুলো ফুটতেও শুরু করেছে। বর্ষার যে ফুলগুলো আমাদের আকৃষ্ট করে তোলে তাহলোÑশাপলা, কদম, কেয়া, কলাবতী, পদ্ম, দোলনচাঁপা, সোনাপাতি (চন্দ্রপ্রভা), ঘাসফুল, পানাফুল, কলমী ফুল, কচুফুল, ঝিঙেফুল, কুমড়াফুল, হেলেঞ্চাফুল, কেশরদাম, পানি মরিচ, পাতা শেওলা, কাঁচকলা, পাটফুল, বনতুলসী, নলখাগড়া, ফণীমনসা, উলটকম্বল, কেওড়া, গোলপাতা, শিয়ালকাটা, কেন্দার এবং এছাড়া নানা রঙের অর্কিড।

কদম
বাংলাদেশের কদমফুল বর্ষার স্মারক। আমাদের ঐতিহ্যে ও সাহিত্যে কদম ফুল আদি প্রাচীন। বর্ষার বৃষ্টিতে যেন কদমফুল বেয়ে অশ্রু ঝরে। কবির মনেও দোলা লাগে “তখন কেবল ভরিছে গগন মেঘে/কদম-বোরক দুলিছে বাদল বাতাস লেগে।” কদমফুল Rubiaceae পরিবারভুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Antho cephalus kadamba এগুলো সাধারণত: বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলে পাওয়া যায়। কদম গাছ সাধারণত: ৩০/৪০ ফুট লম্বা হয়। প্রস্থ ঊর্ধ্বে ৫ থেকে ৭ ফুট হয়। ফুল গোলাকৃতি লম্বা বৃন্তে দণ্ডায়মান। ফুলের রঙ হলুদ সাদায় মেশানো। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেই এই ফুল ফোটে। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ প্রথম এই কদম গাছে উঠে বাঁশী বাজান এবং তার দয়িতা শ্রীরাধিকাকে আকৃষ্ট করেন। এই ফুলের সৌন্দর্য আছে কিন্তু গন্ধ নেই।

Manikgonj pic (1)

শাপলা
আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা সর্বত্রই পাওয়া যায়। সমাজের সর্বস্তরের লোকের হৃদয় হরণকারী এই ফুল। আমাদের কাছে এগুলো আটপৌরে মনে হলেও আজ অনন্যতায় ভাস্বরিত। শাপলার (জাতীয় ফুল) বৈজ্ঞানিক নাম Nzmphaca lotus. Nzmphaece পরিবারে ৮টি গোত্র ও ৯০টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাপলা জাতীয় প্রজাতি হলোÑসাদা বা লাল শাপলা, হলদে শাপলা, নীল শাপলা ও বড় শাপলা। সাদা শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। তাছাড়া শাপলা ফুল এবং পাতা সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফুলের নাম ঢেপ। যার থেকে সুস্বাদু এবং ছোট ছোট গোলাকার মুড়ি তৈরি হয়ে থাকে। এই মুড়ি থেকে মোয়াও তৈরি হয়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা ফুলের ডাঁটা ভেঙে সুন্দর সুন্দর গহনা বানিয়ে গলায় পরিধান করে। এছাড়া এ ফুল পুকুর-ডোবা, খাল-বিলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।

দোলনচাঁপা
দোলনচাঁপার ইংরেজি নাম Butterflz Lilz ও বৈজ্ঞানিক নাম Hedzchium coronarium. বাংলায় দুলালচাঁপা বা গুলবাকাওলী বলেও ডাকা হয়। এটিও সাদা রঙের ফুল। বড় বড় দুটি পাপড়ি। ফুলটা দেখতে ভারি মিষ্টি। পাপড়ি দুটো প্রজাপতির ডানার মতো দেখতে লাগে বলে এর ইংরেজি নাম বাটারফ্লাই লিলি।

দোপাটি
চমৎকার একটি ফুল দোপাটি। এর ইংরেজি নাম Touch me not। বৈজ্ঞানিক নাম Impatiens blasmina. ফুলগুলো একক অথবা জোড়া হয়। গোলাপি, লাল, বেগুনি, লাইলাক, আকাশি, নীল, সাদাসহ আরো কয়েক রঙের ফুল হয়। দোপাটির অনেকগুলো জাত রয়েছে। এই ফুলটি শুধু বর্ষা নয়, গ্রীষ্মকালেও ফোটে। মে ও জুন মাসে লাগালে বর্ষায় ফুল পাওয়া যায়।

কেয়া
কবি নজরুল কেয়াকে নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন -“রিমি ঝিম রিমি ঝিম ঐ নামিল দেয়া/ শুনি শিহরে কদম, বিদরে কেয়া।” আবহমানকাল ধরে বাংলায় কেয়া ফুলের সুগন্ধের খ্যাতি ছড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কদমফুল দেয় যেমন দৃশ্যের আনন্দ সেরকম এই কেয়া ফুল দেয় সৌরভের গৌরব। এই ফুল বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, আফ্রিকার গ্রীষ্মমন্ডল এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Pandamus Odoratiss imus, Pandamus নামটা এসেছে মূলত: মালয়েশিয়া থেকে। এর পাতা সরু লম্বা এবং কাঁটাযুক্ত। ফুলগুলো শ্বেতবর্ণ, ধানের ছড়ার মতো বিন্যস্ত এবং উগ্র সুবাসযুক্ত। এর বায়বীয় মূল কাণ্ড থেকে ঝুলে পড়ে বায়ু থেকে খাদ্য উপাদান নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। অনেক সময় ফুলগুলো পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এর ঘ্রাণে বিমুগ্ধ হয়ে সাপ ও বিষাক্ত কীটপতঙ্গ গাছে জড়িয়ে থাকে। পারফিউম তৈরি করতে এর রস ব্যবহৃত হয়। গ্রাম্য মেয়েরা সৌন্দর্য চর্চায় এই ফুল অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করে। কেয়া গাছ লম্বায় ১০-১২ ফুট হয়ে থাকে। এর কা- গোলাকার এবং কণ্টকময়। এ গাছগুলো পরস্পরের সাথে জড়াজড়ি করে নিবিড় এবং দুর্গম পরিবেশ তৈরি করে।

চালতা
চালতা সুদৃশ্য পত্রমোচী বৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica। গাছের উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার। কাণ্ড অনেক বড় নয়। শাখা-প্রশাখা এলোমেলো। ছায়াঘন ও প্রসারিত। বাকল লালচে, মসৃণ। পাতা টিয়াসবুজ আর দীর্ঘ হয়। পাতার শিরাবিন্যাস তীক্ষ্ন ও খাজকাটা। পাতার এই আকৃতির কারণে চালতাকে রূপসী গাছ বলা হয়। চালতার ফুল আকারে বেশ বড় হয়। এই ফুল শ্বেতবর্ণের ও সুগন্ধিযুক্ত। পাতার গাঢ় সবুজের পটভূমিতে ফুলের দুধসাদা পাপড়ির ঔজ্জ্বল্য আকর্ষণীয়। কিন্তু ফোটার দিনই তা ঝরে পড়ে। পাতার সজীবতা, ফুলের শুভ্রতা, হলুদ পরাগ কেশরের সমাহার মিলে চালতা ফুলের সৌন্দর্য অদ্ভুত।

চন্দ্রপ্রভা
হলুদ রঙের অসম্ভব সুন্দর এই ফুলটির নাম চন্দ্রপ্রভা ফুল। ঘণ্টা আকৃতির স্বর্ণাভ হলুদ রঙা গন্ধহীন এ ফুলকে কেউ কেউ একে সোনাপাতি নামেও ডাকে। গ্রীষ্ম বা বর্ষায় ডালের আগায় বড় বড় থোকায় দেখা যায় হলুদ রঙের এই ফুল। এটি Bignoniaceae পরিবারে একটি উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tecoma stans। অন্যান্য স্থানীয় নামের মধ্যে Yellow bells, Yellow trumpet, Yellow-Elder উল্লেখযোগ্য। এটি Bignoniaceae পরিবারে একটি উদ্ভিদ। জানা গেছে, চন্দ্রপ্রভা ফুলের গাছ চিরসবুজ। মাথা কিছুটা ছড়ানো। দল ফানেলের আকার, ৩-৪ সে.মি চওড়া। ফল শুকনো, ১২-২০ সে.মি লম্বা, বীজ আকারে ছোট। বীজ ও কলমে চাষ হয়। ডালের আগায় বড় বড় থোকায় হলুদ রঙের ফুল ফোটে। দেখতে অনেকটা হলুদ ঘণ্টার মতো। Tecoma gaudichaudi নামে সোনাপাতি ফুলের আরেকটি প্রজাতি আছে যেটায় সারাবছর ফুল ফুটে।

কলাবতী
বর্ষার এক অনন্য ফুল কলাবতী। এর আরেক নাম সর্বজয়া। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে কিংবা শহরের বিলাসী বাগানে লাল-হলুদ এবং লাল ও হলুদ মেশানো কলাবতী ফুল পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ফুলগুলো ঈধহহধপবধব পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর ৫৫টি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। দেখতে সরু, লম্বায় ৩ থেকে ৫ ফুট, পাতা দুই প্রান্তের দিকে চাপা, মাঝখানে প্রশস্ত। এগুলো একবীজপত্রী উদ্ভিদ। ৩টি বৃন্তযুক্ত এই ফুলে ৫টি পাপড়ি রয়েছে।

আবহমানকাল ধরেই আমাদের প্রকৃতিকে বর্ষার ফুল স্বতন্ত্র্য সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে আসছে উদারতায়। বর্ষা ও তার ফুল যেন বাংলার প্রকৃতির আত্মা; বৃষ্টিস্নাত বর্ষার ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি মানুষের মনে রঙ লাগিয়ে আসছে। বর্ষা নামলেই হাত চলে যায় প্রিয়ার খোঁপায় আর চোখ চলে যায় জানালার ফাঁক দিয়ে। তাই তো কবি কন্ঠে উচ্চারিত হয় অনন্য কবিতার পঙ্ক্তিমালা “আঁধারে ডুবিছে সবি/ কেবল হৃদয়ে হৃদি অনুভবি।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.