সাম্প্রতিক পোস্ট

অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদগুলো খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং
নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার মদন সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মদন গ্রামের নারীদের উদ্যোগে দিনব্যাপী এক অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের মেলা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলায় দক্ষিণ মদন গ্রামের নারীরা ২৩টি স্টলে সর্বনিম্ন ১৫টি এবং সর্বোচ্চ ৫৯টি অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের প্রদর্শনী করে। মেলায় বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার (নারী, শিশু, প্রবীণ ও কিশোর-কিশোরী) প্রায় ৬০ জন মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

IMG_20180916_121839-W600
সকাল ১১টায় গ্রামের নারীরা দল বেঁধে বিভিন্ন জাতের অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদ নিয়ে মেলার স্থানে এসে ট্রিপল বিছানো উঠানের স্টলে প্রদর্শনী করেন। মেলার শুরুতে বারসিক’র কর্মী শংকর ম্রং মেলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি মেলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনায় বলেন, ‘গ্রামের আনাচে কানাচে অনেক অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদ রয়েছে যেগুলো গ্রামের জনগোষ্ঠী শত শত বছর যাবত খাদ্য ও ঔষধী হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এক সময় গ্রামাঞ্চলে এসব উদ্ভিদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মানুষ শাক-সবজির জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীল ছিলনা। কিন্তু আধুনিক কৃষির বিস্তার ও কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে এসব উদ্ভিদের কদরও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সময়ে মানুষ রাসায়নিক কৃষিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ অল্প পরিশ্রমে অনেক উৎপাদনের আশায় ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক অতিমাত্রায় ব্যবহার করছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য নিরপাত্তা হচ্ছে বিগ্নিত ও পরিবেশ হচ্ছে বিপর্যস্ত।’

IMG_20180916_121846-W600
মেলায় স্টলে সর্বোচ্চ ৫৯টি অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের প্রদর্শন করে প্রথম স্থান অধিকারী কৃষাণী রেজিয়া আক্তার বলেন, ‘মেলায় আমাদের প্রদর্শিত অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদগুলোর সবগুলোই আমরা সংগ্রহ করে খাই। এসব শাকসবজি খুবই সুস্বাদু ও বিষমুক্ত। বাড়ির চারপাশ থেকেই এসব উদ্ভিদ সংগ্রহ করা যায়। এ মেলায় অংশগ্রহণ করে আমরা সকলের অনেক খাদ্য উদ্ভিদ সম্পর্কে পরিচিত হয়েছি, যেগুলো আমরা আগামীতে খাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করবো।’

IMG_20180916_140101-W600
কৃষাণী ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা এ ধরণের মেলা এই প্রথম করছি। মেলায় এসে আমরা অনেক উদ্ভিদ সম্পর্কে জানতে পেরেছি, যেগুলো খাদ্য ও ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করে পুষ্টির চাহিদা মেটানো ও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করে সেসব রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারব। এ ধরণের মেলা আগামী শীত মৌসুমে আয়োজন করা হলে হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানে আরও অনেক খাদ্য উদ্ভিদ সম্পর্কে বর্তমান নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। এসব উদ্ভিদ আমাদের প্রয়োজনেই আমাদেরকে সংরক্ষণ করতে হবে।’

IMG_20180916_132422-W600
বারসিক এর কর্মী অহিদুর রহমান মেলায় বিজয়ী (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়) স্থান অধিকারী কৃষাণীদের মধ্যে পুরষ্কার বিতরণী পর্বে সকলকে সক্রিয়ভাবে মেলায় অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ ৫৯টি জাতের অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের প্রদর্শনীর জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি সকল অংশগ্রহণকারীদেরকে নিজ নিজ বাড়ির চারপাশে জন্মানো অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদগুলো সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। তিনি সকলকে রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহার না করে হাত দিয়ে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে খাদ্য উদ্ভিদগুলো সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। মেলায় অংশগ্রহণকারী সকলকে শ্বান্তনা পুরষ্কার প্রদান করা হয়।

IMG_20180916_135806-W600
উল্লেখ্য যে, কৃষি শ্রমিক সংকট হাওরাঞ্চলের একটি বড় সমস্যা। ধানের চারা রোপণের কাজ কোন রকমে শেষ করতে পারলেও আগাছা নিড়ানোর জন্য শ্রমিকের ব্যাপক সংকট দেখা যায়। কৃষকরা আগাছা নাশক প্রয়োগ করে রাসায়নিক উপায়ে আগাছা দমন করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে আগাছা থেকে শুরু করে অসংখ্য অণুজীব ও কৃষির জন্য উপকারী ও অপকারী অসংখ্য জীব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রাসায়নিক আগাছানাশক প্রয়োগের ফলে হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে (অচাষকৃত) জন্মানো এসব খাদ্য উদ্ভিদও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের অজান্তে এসব নিরাপদ খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মও এসব নিরাপদ অচাষকৃত খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব নিরাপদ অচাষকৃত খাদ্য সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে পরিচিত করা এবং উদ্ভিদের ধরণ, ব্যবহার ও গুরুত্ব সম্পর্কে জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা জানানোর জন্যই এমন মেলা আয়োজন করা হয়েছে বলে আয়োজকরা জানান।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: