সাম্প্রতিক পোস্ট

নেত্রকোনায় এলাকা উপযোগি শস্য ফসলের জাত গবেষণার মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

হাওরাঞ্চলের জগোষ্ঠীর প্রধানতম পেশা হল কৃষি এবং একমাত্র বোরো মৌসুমের উপর নির্ভরশীল। হাওরাঞ্চলের ফসলের জমি বছরের প্রায় ৬-৮ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এসময়ে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কোন কাজ থাকেনা। হাওরাঞ্চলের কৃষকরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবেলা করে জমিতে কৃষি ফসল চাষ করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাওরাঞ্চলে চাষকৃত বোরো ধান আগাম বন্যা, ঢেউ ও বাতাসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একান্ত চাহিদা আগাম ধানের জাত। কিন্তু তাদের হাতে ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধানের উফশী জাত ছাড়া আগাম ও অধিক ফলনশীল তেমন কোন জাত না থাকায় তারা প্রতিবছর এ দু’টি ধানের জাত প্রতি বছরই চাষ করে থাকে। অন্যদিকে ধানের বিকল্প কোন ফসলের জাত তাদের না থাকায় এবং বিকল্প ফসল সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তারা বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে।

53364408_1856357987800854_7964239113459073024_n
বারসিক ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার হাওর অধ্যুষিত গোবিন্দশ্রী ও মদন উপজেলায় কার্যক্রম শুরু করে। গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা থেকে হাওরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রাণবৈচিত্র্যসহ বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানা যায়। তথ্যানুযায়ী, আগাম বন্যায় প্রতিবছরই তাদের একমাত্র ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু কোন উপায় না থাকায় আগাম বন্যায় নষ্ট হবে জেনেও তারা ধান ফসল চাষ করতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় বারসিক ধানের বিকল্প ফসল চাষের পরামর্শ দিলে গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষকরা একত্রিত হয়ে বারসিক এর বীজ সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে কৃষক নেতৃত্বে এলাকা উপযোগি শস্য ফসলের জাত নির্বাচনে প্রায়োগিক কৃষি গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৫ জন কৃষক-কৃষাণী ১৬টি শস্য জাত নিয়ে (শস্য ও মসলা) ৪০ শতাংশ জমিতে (যে জমি শুধুমাত্র ধান মাড়াইয়ের জন্য ব্যবহার হয়) গবেষণাটি স্থাপন করে। গবেষণা প্লটে পরীক্ষণকৃত জাতগুলো হল- শস্য ফসল (যাব, কাউন, বরবটি, ফ্রেঞ্চ বিন, মটরশুটি), ডাল ফসল (খেসারী, মসুর, ছোলা), তৈল ফসল (রাই ও তিসি), মসলা ফসল (ধনিয়া, কালিজিরা, মিষ্টি সজ, মহুরীসহ নয় জাতের)। জমির মাটি এটেল হওয়ায় গবেষণাটি পরিচালনায় কৃষকদেরকে অনেকটা বেগ পেতে হয়। বিশেষভাবে মাটিতে রস না থাকায় মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়, সেচের সমস্যা, জৈব সার (গোবর/কম্পেষ্ট সার) না পাওয়া, সময়মত বীজ বপন করতে না পারা ইত্যাদি কারণে গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক সমস্যার পরও কৃষকরা নিজেদেরকে গবেষণায় সফল হয়েছে বলে মনে করছে।

গতকাল (১২ মার্চ) গবেষণা কমিটির সদস্যরা তাদের গবেষণার ফলাফল অন্যান্য কৃষক-কৃষাণী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে সহভাগিতার জন্য মাঠ দিবসের আয়োজন করে। মাঠ দিবসের অনুষ্ঠানে গোবিন্দশ্রী ও মদন ইউনিয়নের দু’জন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাসহ (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) ১০টি গ্রামের (মূলত পাড়া) প্রায় ৩০জন কৃষক-কৃষাণী অংশগ্রহণ করে গবেষণার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন। অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধে কৃষক-কৃষাণী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ গবেষণা প্লটের ফসলগুলো পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালীন সময়ে তারা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে (খরাসহনশীল, শুকনা এঁটেল মাটিতে হয়, এলাকা উপযোগি, ধানের বিকল্প হিসেবে চাষ করা যায় এবং আগাম তোলা যায় ফলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবার কোন সম্ভাবনা থাকেনা) ১৬ জন কৃষক-কৃষাণী ৫টি ফসলের জাত (যব, রাই, তিসি, কালিজিরা, মহুরী) নির্বাচন করে। গবেষণা টিম এবং অংশগ্রহণকারীদের মতে, তাদের নির্বাচিত শস্য জাতগুলো এলাকা উপযোগি এবং লাভজনক।

53636625_318528338853136_2339369588350779392_n
মাঠ পরিদর্শন শেষে গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন পরিষদ সভা কক্ষে এক আলোচনা সভা ও অভিজ্ঞতা সহভাগিতা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় বারসিক’র শংকর ম্রং গবেষণা কার্যক্রমর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গবেষণা পদ্ধতি ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি আগামী রবি মৌসুম যথা সময়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এখন থেকেই জমি নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দেন।

মদন ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রুবেল সরকার কৃষকদের গবষণা কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ‘বারসিক’র সহযোগিতায় ও পরামর্শে আপনারা প্রথমবার হলেও সফলভাবে গবেষণাটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। বারসিক এখানে শুধুমাত্র পরামর্শ ও সামান্য সহযোগিতা দিয়েছে মাত্র, কিন্তু পুরো গবেষণাটিই আপনারা নিজেরা করেছেন এবং আগামী মৌসুমে নিজেদের জমিতে চাষের জন্য বেশ কয়েকটি শস্য জাত আপনারা নির্বাচন করেছেন।” তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সরকার প্রতি মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ধান ও শস্য ফসলের বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করে। আপনাদের কারো কোন ফসল চাষ করার ইচ্ছা থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা বীজ ও কৃষি উপকরণ সহযোগিতার চেষ্টা করবো।’

53600227_2290169461308042_9109641745238327296_n
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গবেষণা কমিটির সদস্যদেরকে আগামী বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বিনা চাষে রসুন, ডাল, সরিষা, ছোলা, যব, তিসি, রাই, ফ্রেঞ্চ বিন, মটরশুটির গবেষণা করার পরামর্শ দেন। তিনি সকলকে বসতভিটার খালি জায়গাতে আদা, হলুদ ও বৈচিত্র্যময় সবজি চাষের মাধ্যমে পরিবারের চাহিদা পূরণ করে বাজারের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার আহবান জানান।

গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের কৃষকরা আগাম এবং ভালো ফলনের আশায় শুধুমাত্র ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ ধানের জাতটি চাষ করেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত এ ধানের জাতগুলো অধিক রোগবালাই আক্রান্ত হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই কৃষি বিজ্ঞানীরা এ জাতগুলো চাষ করতে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছেন এবং রোগবালাই সহনশীল ব্রি-৮১, ব্রি-৮৬ ও ব্রি-৮৯ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে।’ তিনি গবেষণা থেকে বাছাইকৃত শস্য ফসলগুলো ধানের বিকল্প হিসেবে চাষ করলে কৃষকরা উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন।

কৃষক সাজ্জাদ হোসেন গবেষণা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা সহভাগিতা করে বলেন, ‘গবেষণা প্লটে ১৬টি জাতের ফসলের বীজ বোনার পর আমরা প্রথমে সন্দেহ করেছিলাম কোন ফল পাওয়া যাবেনা। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম ফসলগুলো ভালোই হচ্ছে। গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে আমি অনেক ফসল সম্পর্কে এবং গবেষণার গুরুত্ব সম্পর্কে শিখেছি। তবে সঠিক সময়ে এবং প্রয়োজনমত সেচ দেয়া সম্ভব হলে ফসল আরোও ভালো হত। আমরা ২০টি ধানের জাত নিয়ে ১০ শতাংশ জমিতে ধানের জাত গবেষণা করছি। আশা করি এখান থেকে আমরা আগাম জাত পাব। আগামীতে আমরা পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে গবেষণা আরম্ভ করব।’

54230701_811117545890393_7123210355701972992_n
কৃষাণী মিরারা বেগম বলেন, ‘আমরা কখনো এধরণের ফসল চাষ করিনি, এ বছর গবেষণার সাথে যুক্ত হয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে।’ তিনি আগামী মৌসুমে গবেষণা পরিচালনায় বারসিক’র সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারী কৃষকরা গবেষণা কমিটির নিকট পছন্দের শস্য জাতের বীজের চাহিদা প্রদান করেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: