Posted in

প্রাকৃতিক দূর্যোগের কাছে হার না মানলেও করোনার কাছে হারতে বসেছি

সাতক্ষীরার, শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল: বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো করোনা ভাইরাস। যার নাম ছোট শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সী মানুষের মুখে মুখে।যার ভয়াল ছোবলে গোটা বিশ্ব যেন থমকে আছে।দিনের পর দিন যেন মৃত্য মিশিলের সামিল হচ্ছে বিশ্ব। আর এর যে শেষ কবে তা কেউ বলতে পারছে। যত দিন যাচ্ছে ততোই যেন এ আরো ব্যাপক হারে ছাড়িয়ে পড়ছে।আর এর প্রতিরোধের জন্য সারা বিশ্ব নানান ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে ধারাবাহিকভাবে। এই পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো লক ডাউন।  এ লক ডাউন কখনো কঠিনভাবে আবার কখনো ঢিলেঢালাভাবে পালন করা হচ্ছে। এতে করে সকল পেশা শ্রেণীর মানুষের নানান ধরনের ভোগান্তির স্বীকার হতে হচ্ছে। 

এ লকডাউনের কারণে মানুষ যেন নিঃসঙ্গ ও এক ঘরে হয়ে পড়েছে। তারা না পারছেন বাইরে যেতে, না পারছেন কোন কাজ করতে। এটি তো দু’একদিনের ব্যাপার নয়! এর শেষ যে কবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেউ বলতে পারছেনা।দিনকে দিন, মাসকে মাস চলতেই আছে। এর সাথে বাড়ছে আক্রান্ত, বাড়ছে মৃত্যু। বাংলাদেশে শুরুতে এ ভাইরাস এর প্রভাব কম ছিলো। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই এটি মারাত্মক আকারে ধারণ করছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশ বাংলাদেশও এটি বিস্তার এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।এতে সরকারি–বেসরকারি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যুব সমাজেরা নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে।কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সহায়তা করছে কিন্তু সে সহায়তা কতদিন চলবে? এভাবে তো মানুষ অন্যের অপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারেনা।মানুষের মধ্যে থেকে যেন তাদের টিকে থাকতে পারা না পারার এক মতভেদ তৈরি হয়েছে।

আমরা জানি যে, বাংলাদেশ ভৌগলিক ও ভুতাত্বিক অবস্থানগত কারণে প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রবণ দেশ হিসেবে বিশ্ব পরিচিতি।প্রতিনিয়ত জলবাযু পরিবর্তনের ফলে দূর্যোগের মাত্রা যেমন বাড়ছে সাথে ক্ষতির মাত্রা, ক্ষতির পরিধিও বাড়ছে।বাড়ছে ঝুঁকিও। এ ঝুঁকির মধ্যে থেকে দূর্যোগের আগে ও পরে থাকে নানান ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় যাতে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। এখন এক অদৃশ্যমান দুর্যোগ করোনা এসে উপস্থিত। যার ছোবলে সব কিছু নিঃশ্বেষ হতে চলেছে। বাংলাদেশের উপকুলীয় এলাকায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের মানব সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ অহরহ লেগে আছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা দুর্যোগ। এ দুর্য়োগের কারণে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও মতভেদ তৈরি হচ্ছে যে তারা কি আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবেন কিনা? সকলের পরিবার পরিজনদেরকে সাথে কি আর দেখা হবে কিনা?অজান্তে কারোর সংস্পর্শে যেয়ে তারাও কি এই রোগে আক্রান্ত হবেন কি না? কাজ করতে না পেরে কতো দিন বা আর এভাবে চলবেন? এরকমই নানান চিন্তা ভাবনা করে তাদের দিন অতিবাহিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে তারা জানান, উপকুলে এলাকার মানুষ হিসেবে বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে টিকে আছেন। প্রতিবছর ছোট-বড় দুর্যোগ সব সময় যেন লেগে আছে। এ দুর্যোগের সাথে তাদের ওঠা পড়া। তারা এটিকে অনেকটা তাদের চলমান জীবনের সাথে মানিয়ে নিয়েছেন। দুর্যোগ হচ্ছে তার জন্য আগে পরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুর্যোগে ঘর বাড়ি, ফসল ক্ষেতসহ বিভিন্ন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারা আস্তে আস্তে সেগুলো কাটিয়ে উঠেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো এ দুর্যোগ অর্থাৎ প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ হলে তারা সকলে কাঁধে কাঁধ রেখে একত্রে মিলিত হয়ে তা মোকাবেলা করেন। সবাই একসাথে থাকেন বলে মনে বল পান। এ সময় বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পরামর্শ ও উপকরণ সহায়তা পান। তাই কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তারা এখন আর খুব বেশি ভয় পান না! কিন্তু এই করোনা দুর্যোগের কাছে তারা মাথা নত করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ এটা এক অদৃশ্যমান ভাইরাস যা কখন কিভাবে এসে পড়ছে, কার মাধ্যমে সংক্রমিত হচ্ছে তা বলা যাচ্ছে না। যার ভয়াবহতার কারণে সব কিছু বন্ধ, নিজের আত্মীয় পরিজন ও প্রতিবেশীদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখা যাচ্ছেনা। এমনকি কারো বাড়িতে যাওয়া যাচ্ছে না। সব রকমের কাজ বন্ধ, যাতাযাত বন্ধ, দোকানপাট, অফিস আদালত বন্ধ। যদিওবা লকডাউনের মধ্যে দিয়ে কোন না কোন দোকান, গাড়ী, বাজার, ব্যাংক খুলছে কিন্তু সেখানেই ভালো কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণে আতংক রয়ে গেছে।এ যেনো প্রাকৃতিক দুর্য়োগের চেয়ে আরো ভয়াবহ কোন দুর্যোগ!

এবিষয়ে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের প্রবীণ কৃষক সুধীর কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘আমার বয়স তো প্রায় ৭০ পার হয়ে গেছে। এই বয়স পর্য়ন্ত নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অনেক মহামারী আমার চোখে পড়েছে।কিন্তু এ করোনা যেন সবকিছুর উর্ধ্বে চলে যাচ্ছে। কারণ সব রকম দুর্যোগ হলে আমরা তা একসাথে মোকাবেলা করেছি। এখন এ করোনা দুর্যোগে যেন নিজেকে নিজের সাথে যুদ্ধ করা্র মতো। যে কারো বাড়িতে যাওযা যাবে না, কারোর হাত থেকে কিছু নেওয়া যাবেনা, কোন মিলা মেশা, কোন আচার অনুষ্ঠান কিছু করা যাবেনা’। তিনি আরও বলেন, ‘যারা গরীব মানুষ একদিন বাইরে না গেলে তাদের চলে না।যারা যোন মজুরী দিয়ে সংসার চালান তারা কোন কাজ করতে যেতে পারবে না।আবার কৃষকেরা ফসল ফলালে তা বিক্রি করতে পারবে না। এরকম নানান ধরনের সমস্যা হচ্ছে। এভাবে কি আর জীবন চলে? এ করোনা যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে আরো খারাপ ও ভয়াবহ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে আমাদের মাথা নত না করলেও করোনা দুর্য়োগের কাছে নত করতে হচ্ছে।’

মহামারী করোনার কারণে সারা বিশ্ব আজ নিস্তবতার রূপ নিয়েছে। এর শেষ কবে ও কিভাবে হবে তা কেউই বলতে পারছে না।মানুষের বেঁচে থাকা যেন দিনকে দিন কঠিন হযে যাচ্ছে। আগামী দিন, আগামীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের শংকা দেখা দিতে শুরু করেছে। কতোদিন আর যে এভাবে চলতে হবে তা নিয়ে মানুষের চিন্তার কোন শেষ নেই।একদিকে মানব সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর তার সাথে করোনা দুর্যোগ। সব মিলেয়ে যেন এক বিভিষিকাময় জীবন পার করতে হচ্ছে উপকূলীয়সহ অন্যান্য এলাকার মানুষকে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.