সাম্প্রতিক পোস্ট

করোনা মোকাবেলায় আদিবাসী গারো জনগোষ্ঠীর উদ্যোগ

মধুপুর টাঙ্গাইল থেকে শংকর ম্রং: করোনা ভাইরাস বর্তমান সময়ের একটি মহা বৈশ্বিক দূর্যোগ। বিশ্বের ১৮৮টি দেশ আজ এই দূর্যোগ মোকাবেলায় দিশেহারা। বিশ্বের অনেক উন্নত ও ধনী দেশগুলো করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। গত ৮ মার্চ ২০২০ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ধীরে ধীরে এদেশেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আমাদের জনবহুল দেশের জন্য আশংকাজনক। আমাদের দেশের সরকার করোনা রোগী শনাক্তের প্রথম থেকেই বরোনা ভাইরাস সম্পর্কে, সংক্রমণের মাধ্যম এবং এর মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়া, জনসমাগম না করা, বাইরে গেলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মূখে মাস্ক ব্যবহার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধোয়ার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে করোনা মোকাবেলায় (সংক্রমণ রোধে) জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। করোনা মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সুবিধার্থে সকলকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার জন্য সরকার দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম দুই মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। সকল প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনলাইনে/ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের সাময়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এই দীর্ঘ সময় হোম কোয়ারিন্টিনে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা সম্মিলিত উদ্যোগে করোনা মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছে। করোনাকালীন সময়ে হোম কোয়ারিন্টেনে থাকা নি¤œ আয়ের জনগোষ্ঠী পরিবার পরিজন নিয়ে যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তাদের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। সরকারি/বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি হ্যান্ড স্যানিটাইজার/সাবান, মাস্ক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যদিও খাদ্য সহায়তার পরিমাণ জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল।
আদিবাসী এলাকায় করোনা মোকাবেলায় সরকারি/বেসরকারি/ব্যক্তি উদ্যোগে প্রদত্ত্ব সহায়তার চিত্র আর অপ্রতুল। বিশেষভাবে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় বসবাসরত গারো আদিবাসীদের অধিকাংশই ঢাকা শহরের বিভিন্ন বিউিটি পার্লার, বিদেশী ও বাঙালি বাসাবাড়ি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এসব আদিবাসী নারী-পুরুষ করোনা পরিস্থিতিতে বর্তমানে গ্রামে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে। অধিকাংশেরই কোন বেতন নেই। এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিদারুণ অভাব অনটনে থাকলেও খাদ্য বা কোন ধরণের সহায়তার জন্য কোথাও যাচ্ছেনা। স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি/স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত্ব এসব খাদ্য সহায়তা গ্রহণেও তারা সংকোচ বোধ করে। ফলে তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে গ্রামে এসে অর্থনৈতিক সংকটের সম্মূখীন হচ্ছে। তাই বলে তারা সরকারি বা বেসরকারি সহায়তার আশায়ও বসে নেই। অন্যদিকে তারা অর্থ উপার্জনের জন্য সরকার ও বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব মেনেও চলছে। তারা লোক সমাগম এড়িয়ে নিজ নিজ বসতভিটার চারিপাশে সাধ্যমত বৈচিত্র্যময় সবজি ও ফলের চাষ করছে। ফলের মধ্যে আম, লেবু, পেঁপে, লিচু, পেয়ারা, কলা ইত্যাদির চারা রোপণ করছেন। বসতভিটায় বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করায় সবজির জন্য গারো জনগোষ্ঠীকে বাজারেও তেমন যেতে হচ্ছেনা। সম্পূর্ণ সার ও কীটনাশকমুক্ত নিরাপদ শাকসবজি হওয়ায় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব সবজি খুবই উপকারে লাগছে। এছাড়াও আদিবাসীরা বিশেজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী করোনা মোকাবেলায় নিজেদের চাষকৃত বাগানের ভিটামিন ‘সি’ এর উৎস লেবু ও কাঁচা আমের শরবত/ভর্তা নিয়মিত খাচ্ছে।
মধুপুর গড় এলাকায় বসবাসরত অধিকাংশ আদিবাসীই গারো নৃ-গোষ্ঠীর। এ অঞ্চলের গারোদের অনেকেই চাকরীজীবী। আবার অনেকে আম, কাঁঠাল, কলা, লেবু, পেঁপে ও আনারসসহ বৈচিত্র্যময় ফল এবং আদা,হলুদ ও কচু চাষ করে। আবার অনেক গারো ও বাঙালি জনগোষ্ঠী এসব বাগানে দিন মজুরির কাজ করেন। করোনার ফলে এসব আদিবাসী ও বাঙালি কৃষি শ্রমিকরা বর্তমানে কর্মহীন জীবনযাপন করছে। দৈনন্দিন খাদ্য যোগানোর জন্য এসব দরিদ্র আদিবাসী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর কৃষি শ্রমিকরা মধুপুর গজারী বন থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো জংলী আলু থ্-াজ্ া(গাতি আলু), আম্পেং, থ্-াগিছাক (দুধ আলু), স্টেং (হুইরা আলু) ও শাক-সবজি (আদুরাক, শেরেংকী বিজাক, স্টেং খাম্বি, আগেন্দ্রা, সামাদুরাক ইত্যাদি) সংগ্রহ করে খেয়ে করোনাকালীন সংকট মোকাবেলা করছেন। আবার কোন কোন দরিদ্র পরিবার জংলী আলু সংগ্রহ করে বিক্রি করে পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাচ্ছেন (প্রতি কেজি ৩০-৫০ টাকা)। কোন কোন পরিবার বন থেকে জ্বালানি (শুকনা লাকড়ি) সংগ্রহ করে বিক্রির আয় দিয়ে করোনাকালীন সংকট মোকাবেলা করছেন। বন থেকে জংলী আলু শুধুমাত্র দিনমজুর শ্রেণীর গারো ও বাঙালি জনগোষ্ঠীই সংগ্রহ করছেনা। অনেক স্বচ্ছল গারো আদিবাসী নারী-পুরুষ, যুব ও কিশোর-কিশোরীরাও সখের বসে জংলী আলু ও বনজ শাক-সবজি ও ফলমুল সংগ্রহ করে খেয়ে (নিরাপদ খাদ্য) করোনাকালীন সংকট ও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলা করছে।
বিভিন্ন কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া আদিবাসী যুবক/যুবতীরাও করোনাকালীন সংকটে বসে নেই। তারা নিজ নিজ গ্রামের রাস্তাগুলো বাঁশ/কাঠ/টিন/লোহার গেইট দিয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে লকডাউন করে দিয়েছে। নিজেরা ঘরের বাইরে যাচ্ছেনা এবং অন্যদেরও গ্রামে প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা। নিজেরা নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার, সাবান/হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত-পা ধোয়া, ভিটামিন ‘সি’ জাতীয় খাবার খায় এবং অন্যদেরও পরামর্শ দিচ্ছে। এসব আদিবাসী গারো যুব শিক্ষার্থীররা নিজ নিজ বসতভিটার চারপাশে সাধ্যমত বৈচিত্র্যময় ফল ও সবজি চাষ করছেন। নিজেরাই জমি কোদাল দিয়ে কুপিয়ে তৈরি সবজি বীজ বপন ও ফলের চারা রোপণ করেছে। করোনাকালীন সমযে পিতা-মাতাকে যাতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সবজির জন্য বাজারে যেতে না হয় সেজন্য তারা স্বল্প সময়ে হয় এমন সবজি চাষ করছে। আদিবাসী যুবক-যুবতীরা গ্রামের পতিত পড়ে থাকা মাঠে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো হেলেঞ্চা, ঘিমাই (ডিমা তিতাশাক), কচু শাক, কার্মান শাক, গোবইরা শাক, তেলাকচু শাক, খাক্কু বিজাক, গন্ধবাদলী পাতা শাকসহ বৈচিত্র্যময় শাক সংগ্রহ করে খেয়ে করোনা মোকাবেলার চেষ্টা করছে।

মধুপুরের আদিবাসী যুবকরা গ্রামভিত্তিক সংগঠিত হয়ে (জলছত্র, গায়রা, পিরগাছা ইত্যাদি গ্রামে) গ্রামের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল পরিবার এবং বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বন্ধু ও আত্মীয়দের নিকট থেকে চাল ও নগদ অর্থ সংগ্রহ করে করোনার ফলে কর্মহীন/উপার্জনহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপনকারী এলাকার ১০০টি দরিদ্র পরিবারকে (গারো ও বাঙালি উভয়) এককালীন খাদ্য সহায়তা দিয়েছে (৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি আলু, ১ কেজি লবন, ১ লিটার তেল)। আদিবাসী গারো যুবকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কাজ করছে এলাকার বেশকিছু বাঙালি যুবকরাও। করোনাকালীন সংকটের সময়ে দরিদ্র বাঙালি পরিবারের লোকজন অর্থ কষ্টে যেন আসন্ন পবিত্র ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য গারো যুবকরা ঐসব পরিবারকে সেমাই, চিনি ও দুধসহ খাদ্য সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা পরিচিত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের যোগাযোগ করে অর্থের সংস্থান করছে। এছাড়াও তারা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের নিকট সরকার প্রদত্ত্ব খাদ্যসহ সকল ধরণের সেবার জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নামের তালিকা জমা দিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। মধুপুরের গারোরা যুগযুগ ধরে বহুত্ববাদী মানসিকতা নিয়ে গারো, কোচ, বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে ভাতৃত্বের বন্ধনে বসবাস করে আসছে। বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনা ভাইরাস মোকাবেলায়ও গারোরা বহুত্ববাদী সমাজের মানসিকতা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মানব সেবায় কাজ করছে।
মধুপুর গড় এলাকায় (বনে এবং লোকালয়ে) এ মৌসুমে আনাচে-কানাচে প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে বৈচিত্র্যময় অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদ, যা এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত এবং সম্পূর্ণ নিরাপদও। যা’ খেলে শরীরে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (এন্টিবডি) তৈরিতে সহায়ক। মধুপুরের আদিবাসী গারোরা এসব কুড়িয়ে পাওয়া নিরাপদ খাদ্য খেয়ে করোনাকালীন সংকট মোকাবেলা করছেন। আদিবাসীদের দেখাদেখি অনেক বাঙালি পরিবারও এসব কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্য উদ্ভিদ খেয়ে করোনা মোকাবেলা করছেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: