সাম্প্রতিক পোস্ট

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে স্বেচ্ছাসেবী কাজে সিডিও ইয়ুথ টিম

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে গাজী আল ইমরান

সমাজের প্রতিটি ভালো কাজের ঘ্রাণের সাথে মিশে আছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্রণী ভূমিকা যারা রাখে তার মধ্যে একটি দল বা গোষ্ঠী স্বেচ্ছাসেবক। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই বিনা স্বার্থে সমাজের মানুষের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করে স্বেচ্ছাসেবক নামের একটি দল বা সংগঠন। যাদের কাজ বা নেশা থাকে বাড়ির খেয়ে অন্যের জন্য কাজ করা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সমস্যায় নিজেদের উদ্যোগে অন্যের পাশে দাঁড়ানো মানুষগগুলোই স্বেচ্ছাসেবক। ঠিক তেমনি গত ১০ নভেম্বর ২০১৯ উপকূলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বুলবুল নামক ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে শ্যামনগরের উপকূলীয় শিক্ষা ও বৈচিত্র উন্নয়ন সংস্থা (সিডিও) ইয়ুথ টিম। ৮ই নভেম্বর বুলবুল নামক ঘূণিঝড় নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত পেয়েই মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নামেন সংগঠনের উপজেলার ১৫টি ইউনিটের সদস্যবৃন্দ।

Bulbul (1)
৮ নভেম্বর বেলা ১১টায় সভা ডাকেন উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আবার একইদিন জরুরি সভা ডাকেন ঠিক রাত ৮টায়। হঠাৎ করেই সিডিও ইয়ুথ টিমের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিটের সদস্যরা জানতে পারেন এলাকার বিশিষ্টজনেরা তাদের ইউনিয়ন পরিষদের দিকে ছুটছে। তাদের সাথে সিডিও ইয়ুথ টিমের বুড়িগোয়ালিনী ইউনটের সদস্য ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হয়। উপস্থিত হয়ে দেখা দেখতে পান শ্যামনগর উপজেলা দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটির জরুরি সভাটা বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে অনুষ্ঠিত হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামনগরের সকল সরকারি কর্মকর্তাসহ উপজেলার সকল জনপ্রতিনিধি হাজির। বাদ যায়নি উপকূলের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বররাও। সবার মুখে একটাই কথা বুলবুল আসছে। এ বুলবুল কিন্তু কোন মানুষ নয়। এ হলো পাকিস্তানের দেওয়া ঝড়ের নাম। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো ওই উপজেলার সকল মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্র বা সাইক্লোন শেল্টারে নিতে হবে। প্রথমে গাবুরার মানুষকে শতভাগ মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

Bulbul (1)
শ্যামনগর সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর দায়িত্ব পড়লো গাবুরাতে। তিনি ছুটলেন, সাথে আছে গাবুরার চেয়ারম্যানও। সফর সঙ্গী হিসেবে শ্যামনগরের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কোস্টাল এডুকেশন ডাইভার্সিটি এন্ড ইমপ্রুভমেন্ট অর্গানাইজেশন (সিডিও) ইয়ুথ টিমের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন ইউনিয়নের ৭ জন রাত ১০টা নাগাদ খোলপেটুয়া নদী পাড়ি দিয়ে গাবুরায় পৌঁছায়। সেখানে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন গাবুরা ইউনিটের সদস্যবৃন্দ।

রাত ১১ টার পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের আভাস পেয়ে সকল মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে সকলের যৌথ প্রচেষ্টা এবং মানুষেরা আসছে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে জোয়ার থাকায় বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ধ্বংসাত্মক শক্তি নিয়ে উপকূলে আছড়ে পড়বে এমন শঙ্কায় মোংলা ও পায়রাবন্দর এবং আশেপাশের জেলাগুলোতে ৯ নভেম্বর সকাল থেকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলায় ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। প্রবল ঝড়ের আশঙ্কায় সকাল থেকেই উপকূলের মানুষ ছুটছিলেন বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে। শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে ছুটতে দেখা যায়।

Bulbul (3)
শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ভাইস চেয়ারম্যানগণ, শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ, সকল সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে সিডিও ইয়ুথ টিমের স্বেচ্ছাসেবকরাও দ্বীপবেষ্টিত গাবুরার মানুষকে প্রাণহানি থেকে রক্ষা করতে এক দরজা থেকে আরেক দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। শুধু গাবুরা নয়, পাশাপাশি শ্যামনগর তথা উপকূলীয় সকল ইউনিয়নের মানুষেরা সাইক্লোন শেল্টারে জড়ো হতে থাকে। ছেলে-বুড়ো, নারী-শিশু, গর্ভবতী-প্রতিবন্ধী সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে চলতে থাকে আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন কাজ করছো এমন জবাবে টিমের সদস্যরা বলেন, ‘সমাজের কাছে আমাদের নিশ্চয় দায়বদ্ধতা আছে আর এই দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা মানুষের জন্য কাজ করছি।’ কাশিমাড়ি ইউনিটের নারী সদস্যরা বলেন, ‘আমি একা নই আমার পরিবারসহ প্রতিবেশীরা যাতে ভালো থাকে এজন্য সকল বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সচেতন করেছি।’

Bulbul (3)
দুপুরের পর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার, পানি, জরুরি ঔষধ সরবরাহ করে। রাস্তায় ছোট কোন যানবাহন না চলার কারণে বোঝাই ট্রাক থেকে সিডিও ইয়ুথ টিমের সদস্যরা খাবারগুলো নিজেরাই নামিয়ে কাঁধে করে প্রতিটা সাইক্লোন শেল্টারে পৌঁছে দেয়। শুধু পৌঁছানোতে থেকে নয়, প্রশাসনের সহযোগিতায় সেগুলোর সুষ্ঠু বণ্টন ও তদারকি কাজেও সহায়তা করে সিডিও ইয়ুথ টিম। এসময় গাবুরা ইউনিয়ন থেকে শ্যামনগরের উদ্যেশ্য আসা মানুষদের সরকারিভাবে নির্ধারিত বাসে তুলে দিয়ে শ্যামনগর সরকারি মহসিন কলেজ এবং সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এসময় কাশিমাড়ি, সদর কৈখালী, সরকারি মহসিন কলেজ ইউনিট সহ সংগঠনের সকল ইউনিটের যুবক-যুবতীরা প্রবীণ-প্রতিবন্ধী এবং গর্ভবতীসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে সহযোগিতা করেন।

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। আকাশে কাল মেঘের ঘনঘটা। ইতিমধ্যে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সীমানা অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের আলোর কোল দুবলার চর নামক স্থানে আঘাত হানে। রাত যত গভীর হয়, ভয়ও বাড়তে থাকে। উপকূলের এই মানুষগুলো ঝড়কে মোকাবিলা করতে করতে আবহাওয়ার গতিবিধি নিরিখ করেই বলতে পারেন, কি ঘটতে চলেছে। আবহাওয়ার তখন গুমোট একটা ভাব। রাত ঠিক ১১টা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় ১০-১২ খানা ছোট-বড় গাড়ী আসলো শ্যামনগরের সীমানায়। গাড়ীগুলোতে সৈনিক এবং ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার সরঞ্জাম। তাঁরা রাত কাটান শ্যামনগর সরকারি মহসিন ডিগ্রি কলেজে। তাদের থাকার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন সংগঠনের সদস্যরা। আর নৌবাহিনী বুড়িগোয়ালিনীর কলবাড়ী বরসা রিসোর্টে। রাত ১২ টার দিকে পুরো জোয়ার। রাস্তাঘাট একদম জনশূন্য। সো সো শব্দে সারা উপকূল যেন এক আতঙ্ক বিরাজ করছে। সিডিও ইয়ুথ টিমের নির্বাহী কমিটির সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে সকল ইউনিটের সদস্য বৃন্দ। রাত সাড়ে তিনটার দিক থেকে শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডব। ভাঙতে থাকে গাছ পড়তে থাকে গৃহ।

Bulbul (4)
রাত ৪টার দিকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে ঈশ^রীপুর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম। সে জানায় গাছ, পড়ে তার ঘর ভেঙে গেছে। সকাল থেকেই ফোন করেন সদর ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরিফ, সে জানান গাছ পড়ে তার একমাত্র থাকার ঘর ভেঙে পড়েছে। যদিও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক দূর্বল ছিলো তারপরেও সকাল বেলা থেকে বিভিন্ন ইউনিট থেকে ফোন করে জানায় যে, গাছ পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে সকল রাস্তাঘাট।এ যেন গাছের ধর্মঘাট। এসময় সকল ইউনিটের সদস্যদের রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সরাতে এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের জন্য ত্রাণের প্যাকেট তৈরি এবং বিতরণে সহযোগিতা চান উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এসময় উপজেলা থেকে সকল সদস্যদের সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়।

টিমের সদস্যরা বিভিন্ন ইউনিয়নে গাছ সরাতে মাঠে নেমে পড়েন এবং শ্যামনগর থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে সহযোগিতা করেন। এছাড়া আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদে আটুলিয়া, সদর এবং সরকারি মহসিন কলেজ ইউনিটের সদস্যবৃন্দ ত্রাণ সামগ্রী প্যাকেট করতে সহযোগিতা করে। এসময় জানা যায়, জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল গাবুরায় ত্রাণ বিতরণ করবেন। বার্তা পেয়ে সদস্যবৃন্দ জেলা প্রশাসকের ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবলে সাধারণ মানুষর পাশে থাকার জন্য জেলা প্রশাসক সিডিও ইয়ুথ টিমের সকল ইউনিটের সদস্যবৃন্দের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের সাথে ছবি তোলেন।

Bulbul (6)
গাবুরায় ত্রাণ বিতরণ কাজ শেষে নীলডুমুরে আসা ত্রাণ সংরক্ষণে সহযোগিতা করেন সিডিও ইয়ুথ টিমের সদস্যরা। দিন শেষে রাতে বাড়ি ফিরে আসেন টিমের সদস্যরা। তাদের মনের প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, ‘আমরা গর্বিত কারণ আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি।’ তারা আরও বলেন, ‘আমাদের কষ্ট স্বার্থক হয়েছে কারণ আমাদের সদস্যরা সব ইউনিয়নের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে সিডিও ইয়ুথ টিমের কর্মকান্ডকে প্রশংসনীয় এবং মানবিক উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলা, উপজেলার প্রশাসন সহ সাধারণ মানুষ।

কলবাড়ি গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি রুহুল আমি বলেন, ‘আমরা সব সময় বিভিন্ন বিপদে সিডিও’র সদস্যদের কাছে পেয়ে থাকি। তারা আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহযোতিার হাত বাড়িয়ে দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ফণির রাতে তারা তাদের অফিসে আমাদের আশ্রয়সহ শুকনা খাবার দিয়েছিল। আর এবারের বুলবুলে আমাদের যেভাবে সহযোগিতা করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাদের সকল ভালো কাজের জন্য শুভ কামনা রইলো।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: