Posted in

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় তা প্রমাণ করেছেন শ্যামনগরের রেশমা বেগম

:: বারসিক শ্যামনগর সাতক্ষীরা থেকে মফিজুর রহমান

Untitledইচ্ছা ও উদ্যম থাকলে যেকোন কাজ সম্পাদন করা যায়, লক্ষ্যে পৌছানো যায় সেটা প্রমাণ করেছেন শ্যামনগর উপজেলার খোলপেটুয়া নদীঘেঁষে বসবাসকারী রেশমা বেগম। মোট ১০ কাঠা জমির উপর রেশমা বেগমের বসতভিটা। সেই বসতভিটায় বছরব্যাপী তিনি মৌসুমভিত্তিক শাকসবজি আবাদ করে সংসারের স্বচ্ছলতা এনেছেন। ঘুর্ণিঝড় আইলার পর তা বসতভিটা ভেঙে পড়লেও তিনি ক্ষান্ত হননি। নিজের অদম্য ইচ্ছা ও অন্যের সহযোগিতায় ঘর তুলে আবার নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। তাঁর ১০ কাঠা জমির মধ্যে এক বিঘা জমি ঘের মালিকদের কাছে বর্গা দিয়ে বছরে ৪ হাজার টাকা পান। কিন্তু দিনমজুর স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, স্বামীর পাশাপাশি নিজেও আয়মূলক কাজে নিয়োজিত হবেন। বাবার বাড়িতে থাকার সময়ে তিনি তাঁর মায়ের কাছে বসতভিটায় জৈব পদ্ধতিতে শাকসবজি আবাদ করার কৌশল শিখেছেন। মায়ের কাছ থেকে শেখা এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে তিনি শুরু করেন শাকসবজির আবাদ।

রেশমা বর্তমানে বারোমাসই মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ করে চলেছেন। তিনি বছরব্যাপী ঢেড়স, আমের মধু, ধুন্দল, ঝিঙা, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা শাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লাউ, শসা, কাকুর, শিম, সজিনা ও উচ্ছে চাষ করেন। এসব শাকসবজি তাঁর পরিবারের পুষ্টি চাহিদা যেমন পূরণ করেছে তেমনি পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করেছেন, যা অভাব-অনটনের সংসারে ব্যাপক কাজে লেগেছে। কেননা সবজি বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের টুকিটাকি জিনিস (হাঁড়ি, চৌকি খাট, আলনা, শোকেজ ও কাঁকড়া ধরার জন্য আটল) ক্রয় করেন। এছাড়া তার আবাদকৃত শাকসবজি তিনি পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথেও সহভাগিতা ও বিনিময় করেন। এই বিনিময় সংস্কৃতি তাদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। শাকসবজি ছাড়াও রেশমা বেগম বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও কাঠ জাতীয় গাছ রোপণ করেন। বাড়িতে তিনি হাঁস-মুরগি পালন করেন। রেশমা বেগমের ৬টি মুরগি, ২টি রাজহাঁস এবং৭টি পাতিহাঁস রয়েছে। এই প্রসঙ্গে রেশমা বেগম বলেন, “আমার বসতভিটায় শুধু শাকসবজি নয় ফলজ ও বনজ গাছও রয়েছে। আমি ছবেদা, গবেদা, পেঁয়ারা, কদবেল, ডালিম, খেঁজুর, খই, কেওড়া, তেতুল, বাবলা, নিম ইত্যাদি গাছ রোপণ করেছি। এছাড়া আমি হাঁস-মুরগি পালন করে সংসারের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করছি।”

Untitvcledআবাদ করা শাকসবজি থেকে বিভিন্ন বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন তিনি। তাই চাষবাসের জন্য তাকে বীজের জন্য চিন্তা করতে হয় না। বরং তাঁর সংরক্ষিত বীজগুলো অন্যদের মাঝে বিতরণ করেন। তিনি ইতিমধ্যে পদ্মপুকুর গ্রামের ৭ জনকে (ইকবাল, দাউদ, আহম্মদ, আমিরুল, সামেলা, ফজলে হক, রাফু) গড়েরপুরে ৩ জনকে (রুপিয়া, সুফিয়া, নাজমা) এবং পাখিমারা গ্রামে ৩ জনকে (আহসান, তাহমিদ, মমতাজ) ঢেড়স, আমের মধু, ধুন্দল, ঝিঙা, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা শাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লাউ, শসা, কাকুর ও শিমের বীজ বিতরণ করেছেন। এসব বীজ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তিনি পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়ন যেমন করেছেন তেমনিভাবে স্থায়িত্বশীল বা পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা, কৃষি ফসল চাষে বৈচিত্র্যতা আনয়নে অন্যদের উৎসাহিত করেছেন।

নিজের ও পরিবারের কল্যাণ ও ভালো থাকা নিশ্চিত করার জন্য রেশমা বেগমের পরিশ্রম ও উদ্যোগ থেমে নেয়। শাকসবজি চাষ, পশুপাখি পালন, বৃক্ষরোপণ এবং সাংসারিক কাজের অবসরে তিনি কাঁকড়া ধরার কাজেও নিয়োজিত করেন নিজেকে। উদ্দেশ্য একটাই: পরিবারের অভাব-অনটন দূর করা এবং সন্তানদের মানুষ করানো। কাঁকড়া ধরে তা বিক্রি করে তিনি মাসে প্রায় ২০০০ টাকা আয় করে বলে জানান। কাঁকড়া বিক্রির এই টাকা সঞ্চয় করে রেখে তিনি তা দিয়েই কৃষিব্যাংক থেকে নেওয়া ২৬ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন, যা তিনি নিয়েছেন শ্বাশুড়ির চিকিৎসা করানোর জন্য।

দিনের অধিকাংশ সময় রেশমা বেগম এ সমস্ত কাজে ব্যয় করেন। সংসারের চাকাকে স্বচ্ছল করতে স্বামীর পাশাপাশি তিনিও তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। সংসারের আয় বাড়ানো, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে তার এ প্রচেষ্টা। রেশমা বেগমের এই প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ অন্যদের উৎসাহিত করবে নিশ্চিত। আমাদের যা সম্পদ রয়েছে সে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার কিভাবে নিশ্চিত করতে পারি রেশমা বেগম তাঁর এই উদ্যোগের মাধমে প্রমাণ করেছেন। এতে করে তাঁর ব্যক্তিগত যেমন লাভ হয়েছে, লাভবান হয়েছেন তার পাড়াপ্রতিবেশীও।
উল্লেখ্য যে, স্বামী ছাড়াও রেশমা বেগমের সংসারে ৩ মেয়ে এক ছেলেসহ ৬ জন সদস্য রয়েছে। বড় মেয়ে ২য় শ্রেণীতে, মেজ মেয়ে প্রথম শ্রেণীতে বাকি ২ ছেলে মেয়ে এখনও স্কুল যাওয়ার উপযুক্ত হয়নি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.