সাম্প্রতিক পোস্ট

হাঁস খেলে ডোবায়, মারজানা স্কুলে…

পাভেল পার্থ

আট বছরের ফুটফুটে মেয়ে মারজানা। কলমাকান্দার নাজিরপুর ইউনিয়নের ভেলুয়াতলী গ্রামে বাড়ি। পড়ে নারায়নপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে।

মারজানার পড়াশোনার জন্য তার মা রোকেয়া বেগম বাড়ির লাউ বেচে কতগুলো হাঁসের বাচ্চা কিনেছেন। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে মারজানা হাঁস ছানাদের নামতা শেখায়। ঘরের পাশের ডোবায় গোসল সেরে গরম ভাত আর বারোমাসী বেগুন ভাজি খেয়ে স্কুলে রওনা দেয়। হাঁস ছানাগুলো তখন খেলতে নামে ডোবায়। মারজানার বাবা আবদুল মোতালেবই এই বারোমাসী বেগুনের চারাগুলো এনে চাষ করেছিলেন। মাটি কোপানো, চারা লাগানো, গাছে পানি দেয়া, খুঁটি দিয়ে গাছ বেঁধে দেয়া, পোকামাকড়ের জন্য ছাই ছিটানো, বেগুন পেড়ে আনা সব করেছেন মারজানার মা-বাবা মিলে। মোতালেব বেগুন বিক্রি করেছেন হাটে। বছরে প্রায় ৩০,০০০ টাকার বেগুণ বিক্রি হয়েছে তার। মাত্র আট শতাংশ বসতভিটা তাদের, জমি আছে ৪০ শতাংশ আর একটা ছোট্ট ডোবা পুকুর। গত বছর রোকেয়া আর মোতালেব মিলে মিষ্টিকুমড়া বেচেছেন ১১০০ টাকার, লাইশাক ৩৬০ টাকার, লালশাক ৪০০ টাকার, সীম ৯০০ টাকার, লাউ ৯৮০ টাকার। ঘরের সামনে বিশাল এক বড়ই গাছ, ১৪০০ টাকার বড়ই বিক্রি করেছেন রোকেয়া। আছে লেবু গাছ, বছরে তাও হাজার টাকা আনে সংসারে। ছোট্ট একটুকরো বসতজমিনে সবজি আবাদ করেই তাদের সংসার।

Presentation1
মারজানার বড় বোন ফারজানার মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। তার আরো দুই ভাই এরশাদ ও রনি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। মোতালেব বলেন, “আগে বুঝতে পারি নাই, বড় মেয়েটার জীবন নষ্ট করছি। আগে কেউ এমনভাবে আমাদের কাছে আসে নাই,। বোঝায় নাই। ক্ষেতে বিষ দিলে যেমন পোকা মরে মাটিও মরে। কম বয়সে বিয়া দিলেও মানুষের শরীর মরে।” কাজের ভেতর দিয়েই বারসিক’র সাথে পরিচয় মোতালেবের। পেয়েছেন বেশকিছু প্রশিক্ষণ ও কিছু উপকরণ সহযোগিতা ও নিয়মিত সাহচর্য। রোকেয়া ও মোতালেব আগেও নিজেরাই মিলেমিশে কাজ করতেন, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মোতালেবের সিদ্ধান্তই পরিবারের চূড়ান্ত সিন্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হত। বারসিকের নারী-পুরুষের সমঅধিকার বিষয়ক বেশ কিছু আলোচনায় তারা অংশ নেন। তাদের মতে, এখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পাল্টেছে। পরিবর্তন এসেছে মোতালেবের ভেতরেও। মোতালেব মারজানা কি এরশাদ-রনিকে সমান চোখেই দেখছেন।

বরং তার ছোট্ট মেয়ে মারজানাকে দিয়েই এখন তার আশা আকাংখা। রোকেয়া বলেন, “আগেও আমি বেশ কয়েকবার হাঁসের বাচ্চা কিনতে চাইছি, মারজানার বাপে মত দেয় নাই। এখন আমি লাউ বেইচ্যা নিজেই হাঁসের বাচ্চা কিনছি, বাচ্চাদের বাপই হাঁসের বাচ্চা কিইন্যা আনছে, বাকী টাকা আবার আমার কাছে ফেরত দিছে।” মোতালেব পরিবার এখন রাসায়নিক ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছেন। মোতালেব মাটির গর্ত করেছেন, রোকেয়া তাতে গোবর ও আবর্জনা ফেলেন। এভাবেই তারা নিজেদের জৈব সারই নিজেদের ক্ষেতে ব্যবহার করেন। নিম, মেহগনি, বিষকাটালি দিয়ে দু’জনে মিলে তৈরি করেন জৈব বালাইনাশক। রোকেয়া নানান শাকসবজির বীজ বোতলে জমিয়ে সংরক্ষণ করেন। পাড়াপ্রতিবেশী নারীরা তার কাছে বীজ নিতে আসে। অনেকে তাদের চাষপদ্ধতি দেখতে আসে।

পরিবার ও সমাজে তাদের একটা সম্মানও তৈরি হয়েছে। গ্রামের বিচার সালিশে এখন তারা জায়গা পায়, মতামত দিতে পারে। স্কুল ছুটি হলে বই নিয়ে ঘরে ফেরে মারজানা, ডোবা থেকে হাঁসের ছানারাও ঘরে আসে। একটি কুপির আলোয় মারজানা পড়ে আর আরেকটি কুপির আলোয় স্বামী-স্ত্রী মিলে বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার বাইর বানায়। তাদের ছোট্ট বাড়িটিতে কোনো বাঁশঝাড় নেই। মরাল বাঁশের চারটি ছুবা বাড়ির চারদিকে লাগানোর ইচ্ছা তাদের। এ নিয়ে বারসিক’র সাথে তাদের কথাও হয়েছে। নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার দূর্গাশ্রম গ্রামের বাগড়া কৃষক ঐক্যের আবদুল ওয়াদুদ খানের বাড়ি থেকে বাঁশের চারা আনতে যাবেন মোতালেব। এ প্রসঙ্গে মোতালেব বলেন, “মারজানার মাও যদি যাইতে চায় যাইতে পারবো, মহিলা কি পুরুষ বইলা কথা না, বিবেক বুদ্ধি থাকলে সবাই সব কাম করতে পারে। কাউরে ছোট কইরা রাখার দিন এখন আর নাই, পরিশ্রম কইর‌্যাই এই দিন বদলাইতে হইব।”

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: