Posted in

শত বাধা পেরিয়ে আজ তাঁরা জয়িতা

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ ॥

তাঁরা জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে প্রচণ্ড প্রতিকুলতা ও অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে স্বস্ব ক্ষেত্রে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অতীতে তাঁরা  অনেক দুঃখ-কষ্ট ও অভাব অনটন সহ্য করেও হতোদ্যম না হয়ে সাফল্যের গৌরবগাথায় উজ্জল হয়ে উঠেছেন। প্রতিকুল পরিবেশ সংগ্রাম করে তাঁরা তাদের  জীবনে সাফল্য এনেছেন।  সরকারের মহিলা অধিদপ্তরের উদ্যোগে “জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায়” মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ২০১৭-১৮ সালের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যাচাই বাছাই করে ৪ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত  হয়েছেন।

শামসুন নাহার

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানকারী নারী হিসাবে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। ঘিওর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক, কবি ও সাহিত্যিক শামসুন নাহার (৭০)। তিনি বলেন, “৭ম শ্রেণীতে পড়াশুনা চলাকালীন অবস্থায় আমার বিয়ে হয়।  বিয়ের পরে  ১৯৬৪ সালে এস এস সি পাশ করি। পরে ওই বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক পদে চাকুরীতে যোগদান করি। পরবর্তীতে এম.এ এবং বি এড পর্যন্ত পড়ালেখা করি। পরবর্তীতে এই স্কুলেই প্রধান শিক্ষক পদে চাকুরী নিয়ে শেষ করি।” SAMSUN NAHAR PIC-1তাঁর স্বামী সরকারি চাকুরী করতেন। ১৯৯৫ সালে স্বামী নূরুল ইসলাম মারা যাবার পরে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্যেও তিনি সংসারের হাল ধরেন। সংসারের বহু অভাব অনটনের মধ্যেও তার ৫ ছেলে ও ৪ মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। বর্তমানে ছেলে মেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। কবি ও সাহিত্যিক শামসুন নাহার  প্রায় ২৫টি সংগঠনের সাথে জড়িত। এককভাবে ১৩টি এবং যৌথভাবে ৭৪টি পুস্তকে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে সমাজ সেবা ও নন্দিনী সাহিত্য পদক, অতীশ দীপংকর (স্বণ পদর্ক), ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া স্মৃতি (স্বর্ণপদক), স্বামী বিবেকানন্দ সাহিত্য পদকসহ  প্রায় ৩০টি পুরস্কারে ভুষিত হয়।  ১৯৮৪ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ সমবায়ী হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে রৌপ্য পদক ও প্রাইজবোন্ড প্রাপ্ত হয়।  তার প্রথম উপন্যাস ‘ স্বামী”  প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়।  শিশুদের মনো বিকাশের জন্য ‘ছড়া দাদুর ছড়ার ঝুড়ি’ অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া বাল্য বিয়ে রোধ, জনসংখ্যা সমস্যা, শিশু পরিচর্যা, নারী শোষণ, নারীদের বিভিন্ন আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে শামসুন নাহার এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার স্বপ্ন দেখেন।

ছায়া রানী সাহা

ছায়া রানী সাহা (৬৫) সফল জননী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ঘিওর সাহাপাড়া গ্রামে প্রয়াত কার্ত্তিক লাল সাহার  স্ত্রী তিনি। মাত্র ৪ শতাংশ জমির উপরে তাঁদের ছিল বসবাস। বিয়ের আট বছরের ৪টি সন্তান হয় তাঁর। স্বামী ঘিওর বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। সন্তানগুলো ছোট থাকার সময় তার স্বামী হঠাৎ অন্ধ হয়ে যায়। চোখের চিকিৎসা করাতে বহু টাকা খরচ হবার পরে সংসার অচল হয়ে পরে। SAYA RANI PIC -2স্বামীর চোখ  এক পর্যায়ে ভালো হবার পরেও সন্তানদের লেখাপড়া চালাতে হিমশিম ক্ষেতে হয়। তিনি বলেন, “ছেলে মেয়েদের ঠিকমত খাবার দিতে পারিনি। ইট মাথায় দিয়ে আমার স্বামী রাতে ঘুমিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করে ও হাস মুরগি পালন করে স্বামীকে সাহায্য করি। অভাব অনটন দঃখ কষ্টের মধ্যেও ছেলে মেযেদের পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে বড় ছেলে ইডেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক। মেজ ছেলে একটি ইংরেজি পত্রিকার ম্যানেজার। এক  মেয়ে এমবি বি.এস পাস করে অষ্ট্রেলিয়াতে চাকুরীতে কর্মরত আছে এবং ছোট ছেলে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী। বর্তমানে পরিবারের সকলকে নিয়ে সুখে আছেন ছায়া রানী।

মোসাঃ হাজেরা বেগম

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন  মোসাঃ হাজেরা বেগম (৫০)। উপজেলার তরা মির্জাপুর গ্রামের ফুলবর মিয়ার স্ত্রী তিনি। ২ শতাংশ জমির উপরে ছোট একটি বাড়ি। ২ ছেলে ১ মেয়ে তাঁর। সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকতো তাঁদের। HAJERA PIC -3সংসারের কাজের মাঝেও ধাত্রীর কাজ করেন। এলাকার রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, বাল্য বিবাহ বন্ধসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িয়ে পরেন। এ পর্যন্ত ৩শ’ প্রসূতি মায়ের সেবা এবং ২শ’ জন অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করার পরে পর্যায়ক্রমে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। ১শ’৫০টি বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করেন। এ ছাড়া সমাজের উন্নয়নমূলক কাজকর্মে জড়িত থাকেন। বর্তমানে স্বামী দর্জির কাজ করেন। দু’ জনে মিলে সংসার পরিচালনা করেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাজেরা বেগম সুখে আছেন।

নাসিমা বেগম

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নাসিমা বেগম (৫৫)। উপজেলার পয়লা গ্রামের আমিরুল ইসলামের (আয়নাল) স্ত্রী তিনি। দু’ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে অভাব অনটনে কেটেছে প্রতিটি দিন। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ালেখা চলাকালীন অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন দিন মজুর। দরিদ্রতা কষাঘাত তার অভিপ্রায়কে ম্লান করতে পারেনি। প্রায় প্রতিটি দিন অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটলেও তিনি হাল ছাড়েনি। শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনের দিকে  এগিয়ে যায় নাসিমা বেগম।NASIMA PIC-4 আর্থিক সংকটে পড়া স্বামীর সংসারের হাল ধরেন। ২শতাংশ জমির উপরে তাদের বসবাস। সংসারে অভাব থাকায় শাপলানীড় এনজিও থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জির কাজ শুরু  করেন। নিজের ইচ্ছা শক্তি আর কঠোর পরিশ্রম করে দর্জির কাজ করার পাশাপাশি প্রশিকার স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে অভাবের সময় বিভিন্ন এনজি থেকে কিস্তির টাকা তুলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার যোগান দিয়েছেন। কিস্তির টাকা দিতে না পারায় অনেক সময় এনজিও প্রতিনিধিরা বাড়িতে এসে বিভিন্ন ধরনের কথা বলে গেছেন। তিনি বলেন, “কিস্তির টাকা দিতে না পাড়ায় আমি দিনের পর দেন পালিয়ে থেকেছি। তাদের কথাবার্তা সহ্য করে আমি আমার সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে গেছি।” তাঁর বড় ছেলে দেশীয় ইঞ্জিনের মেকার। মেজ ছেলেকে এম এ পাশ করার পরে বর্তমানে একটি কম্পানীতে কর্মরত আছেন। ছেলের উপার্জনের টাকা দিয়ে চলছে তাদের সংসার। ছোট মেয়ে অনার্স (একাউন্টটিং) ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। বর্তমানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে আছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার বলেন, “আমি প্রত্যেক জয়িতাদের সমন্ধে জেনেছি। তাদের প্রত্যেকেরই জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। সরকার জয়িতাদের বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছে। আমরা সবাই তাদের দিকে লক্ষ্য রাখবো।

 

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.