সাম্প্রতিক পোস্ট

বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌসুমি আবহাওয়ার তারতম্য ও মৌমাছির অভাবে ফলনে বিপর্যয়
smart

বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌসুমি আবহাওয়ার তারতম্য ও মৌমাছির অভাবে ফলনে বিপর্যয়

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে শহিদুল ইসলাম
বরেন্দ্র অঞ্চল একটি ঐতিহাসিক ঐশ^র্যমন্ডিত অঞ্চল। এখানে প্রচুর বন, জঙ্গলে ঘেরা ছিলো। ফসল উৎপাদনের অত্যন্ত উপযোগী আবহাওয়া ছিলো এই অঞ্চলে। এই অঞ্চলে একসময় নানা জাতের চিকন ও সরু চালের আবাদ হতো। প্রচুর পরিমাণে রবিশস্যের চাষ হতো। সবকিছুই হতো প্রাকৃতিক পানির উৎস থেকে। এখানে ছিলো সমৃদ্ধময় প্রাণবৈচিত্র্য। ( সূত্র: A Statistical Account of Bengal by W W Hunter)

আঞ্চলিকভাবে নানা কার্যক্রমের কারণে সমৃদ্ধময় এই অঞ্চলটি দিনে দিনে নানাভাবেই সংকটের দিকে এগিয়ে গেছে যেমন, তেমনি কিছু সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। যেমন-এই অঞ্চলের বন জঙ্গল, প্রাকৃতিক নদী নালা এবং জলাধার বিনষ্ট হয়েছে; তেমনি বৈশি^ক জলবায়ুর আঞ্চলিক অভিঘাতের কারণে অঞ্চলটি দিনে দিনে আবহাওয়ার মধ্যে তারতম্য ও বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। আবার কিছু উন্নয়নের কারণে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দিকের উন্নয়ন হয়েছে।


কিন্তু দীর্ঘ স্থায়ী উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে যখন কাজগুলো করা হয়নি; তখন এই সময়ে এসে বর্তমান প্রজন্ম কিছু সমস্যার মধ্যে পড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের সচেতন প্রবীণ মানুষরা মনে করেন, স্থায়ী সমাধানের দিকে না এগুলো হয়তো একসময় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরো সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। তাঁরা মনে করেন, এই অঞ্চলের খরা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে; অন্যদিকে ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর অপ্রত্যাশিতভাবে নি¤œগামী হওয়ায় কোন কোন অঞ্চলে পানিয় জলের সমস্যাসহ শস্য ফসল উৎপাদনেও ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মধ্যে পড়েছ। প্রাকৃতিক বন, জঙ্গল এবং বিগত এক দশকে উন্নয়ন কাজের নামে বড় বড় বৃক্ষ নিধন হওয়ায় প্রাণের সমাহার কমেছে মারাত্মকভাবে।


এর ফলে কৃষক তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী শস্য ফসল ফলাতে পাচ্ছেনা। শস্য ফসলের ফলনে আসছে বিপর্যয়। উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা এলাকা এবং রাজশাহীর তানোর উপজেলার গ্রাগগুলোতে পর্যবেক্ষণ এবং মতবিনিময়কালে জানা যায়, বিগত একদশক থেকে তাঁরা যেসকল রবিশস্যগুলো করে আসছিলেন সেগুলোতে ফলন বিপর্যয় বা কোন কোন সময় একেবারেই ফসল নষ্টের কথা বলেছেন। নাচোল উপজেলার বরেন্দা গ্রামের কৃষকের মত বিনিময়কালে তাঁরা বলেন, পাতাল থেকে পানি তুলেও আর কাজ হয় না, কারণ আশানুরূপ আবহাওয়া নেই। ফসলের উপযোগী আবহাওয়া নেই। যার ফলে বিগত দুই বছর থেকে তাঁরা মশুর ফসল চাষে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে মশুরের ক্ষেতে পাতাল থেকে তুলে পানি দিলেও আর কাজ হয় না, কারণ বিগত দুই বছর থেকে ঠান্ডা আরো কমেছে।’ বরেন্দা গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের (৬২) বলেন, ‘বৃষ্টি ও শীত কমে গেছে, যার ফলে পাতাল থেকে পানি তুলে গাছ হলেও আবহাওয়ার কারণে গাছে ফলন নেই। আশি^নে গা শির শির করতো আগে আর এখন অগ্রহায়ণেও ঠান্ডা নেই।’


একসময় গ্রামের কৃষকরা নিজেরা সব ধরনের ফসলের বীজ উৎপাদন করতো। ধান, সবজি, মসলাসহ সকল ধরনের রবিশস্যের বীজ তাঁরা নিজেরই উৎপাদন করতো। বাজার নির্ভরশীলতা কম ছিলো। কিন্তু চলমান সময়ে তাঁরা অনেক ধরেনর বীজ উৎপাদনে আগ্রহ থাকলেও আবহাওয়ার কারণে তা আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন না।


একদিকে যেমন বৈরি আবহাওয়া অন্যাদিকে এলাকার জীববৈচিত্র্য কমার কারণেও ফসল উৎপাদনের মধ্যে প্রভার পড়েছে। নাচালের কৃষক আনিসুজামান (৪৫) বলেন, ‘বিগত সময়ে আমরা নিজেরাই পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করতাম, কিন্তু বিগত বছরে আমরা পেঁয়াজের বীজের ফলনে মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হই।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন- ‘এবার মৌমাছি না আসার কারণে ফুলগুলো থেকে বীজ ভালো হয়নি। পেঁয়াজের বীজে যতো মৌমাছি বসবে, ততো বীজ ভালো হবে।’

smart


কৃষকরা মনে করেন, ‘এই অঞ্চলে প্রচুর বন জঙ্গল আর বড় বড় গাছ না থাকার কারণে যেমন মৌমাছি কমে গেছে বা কোন কোন গ্রামে একেবারেই মৌমাছি চাক নেই। আবার দেখা যায় প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে মৌমাছি ধ্বংস হয়ে গেছে। বা এই রকম মাছি জাতিয় প্রাণগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’


কৃত্রিমভাবে পানি তুলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকগণ আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন না রবিশস্যের ফসলে। বিশেষ করে আবহাওয়ার অপ্রত্যাশিত তারতম্যের কারণে রবিশস্যের ফলন ব্যাহত, অন্যদিকে এলাকার বৃক্ষ লতাপাতা এবং বনজঙ্গল উজাড় হওয়ার কারণে বিভিন্ন বন্যপাণী, পাখি ও মাছি জাতীয় প্রানও কমে গেছে। আবার এর উপরি অঞ্চলটিতে কৃষি উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যহারের ফলে মাছি জাতীয় বিভিন্ন প্রাণের বিলুপ্ত বা কমে যাবার কথা জানান স্থানীয় অধিবাসীগণ।
আগামীতে এই অঞ্চলের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের পরিবেশ প্রতিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে শস্য ফলন উৎপাদনে রাসায়নিক কীটনশাক কমিয়ে জৈব চর্চার দিকগুলো বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সকল সংগঠনগুলো এই বিপর্যয় ঠেকাতে এখন থেকেই ভূমিকা পালন না করলে আগামীতে আরো সংকট বাড়ার সম্ভাবনা আছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: