Posted in

সুবিমল’র প্রচেষ্টা সকলের নিকট অনুকরণীয়

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ঘেষা একটি গ্রাম চন্দ্রডিঙ্গ। ভারত সীমান্তে হওয়ায় এ গ্রামের জনগোষ্ঠী যোগাযোগসহ সকল ধরণের উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামে মূলত আদিবাসী গারো ও হাজং জাতিস্বত্ত¡ার জনগোষ্ঠী ছাড়াও বেশকিছু বাঙালি পরিবারের বসবাস রয়েছে। এ গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে একটি খ্রীষ্টান মিশনারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাত্র। গ্রাম থেকে প্রায় ৬ কি.মি. দূরে রংছাতি হাইস্কুল। গ্রাম থেকে প্রায় তিন কি.মি. পায়ে হেটে পাঁচগাও বাজার এবং বাজার থেকে তিন কি.মি. অটোতে করে হাইস্কুলে যেতে হয়। বাজার থেকে হাইস্কুল বা উপজেলা সদরে যাবার রাস্তাটিও নির্মিত হয়েছে মাত্র বছর কয়েক আগে। বাজার থেকে রাস্তা হবার পর থেকে সীমান্তের গ্রামগুলোর শিক্ষার্থীরা এখন অর্ধেক রাস্তা হেটে এবং বাকি অর্ধেক রাস্তা অটোতে করে স্কুলের যেতে পারায় শিক্ষার হার অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ১০/১৫ বছর পূর্বেও সীমান্ত এলাকার যোগাযোগের মাধ্যম ছিল মানুষের পা ও সাইকেল। যোগাযোগের দূরবস্থার জন্য সেসময় চন্দ্রডিঙ্গাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক পাশ করার পর আর পড়াশুনা এগিয়ে নিতে পারেনি। তাদের অধিকাংশই শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ত। আবার গ্রামের বেশ কয়েকজন ছেলে-মেয়ে দূরবর্তী খ্রীষ্টান মিশন হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে সক্ষম হয়েছে। শত বাঁধার মধ্যেও সীমান্ত এলাকার যে সকল ছেলে-মেয়ে নিজেদেরকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে তাদের মধ্যে চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের সুবিমল ম্রং (৩২) একজন।


স্ত্রী, মা-বাবা, বোন-বোন জামাই ও ভাগ্নে-ভাগ্নিদের নিয়ে সুবিমলদের ৮ জনের যৌথ পরিবার। পরিবারের মোট জমিজমা বলতে ৪ আড়া (১ আড়া=১২৮ শতাংশ) বা ৫.১২ একর কৃষি জমি (মায়ের)। বাড়িভিটার মোট জমির পরিমাণ ৫৬ শতাংশ। আমন মৌসুমে তারা চার আড়া জমিতেই ধান চাষ করেন। তবে বোরো মৌসুমে ছড়ার পানি দিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন।
পরিবারের ৬ ভাই-বোনের মধ্যে (৩ ভাই ৩ বোন) সবার ছোট সুবিমল ¤্রং কলমাকান্দা কলেজ থেকে বিএ পাশ করার পর চাকরির সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় একটি চায়না বাইং হাউজে তিনি প্রায় ৫/৬ বছর চাকরি করেন। বৈশ্বিক মহামারী করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন চলাচল বন্ধ হলে কোম্পানির চীনা মালিক কোম্পানী বন্ধ করে নিজ দেশে চলে গেলে সুবিমল তার চাকরি হারায়। চাকরি হারিয়ে সুবিমল দেশের অন্য সকলের মত ঢাকা শহর ছেড়ে নিজ গ্রাম চন্দ্রডিঙ্গায় চলে আসেন। গ্রামে এসে তিনি মা-বাবাকে চাষাবাদে (ধান চাষ) সহযোগিতা করতে থাকেন। চাষাবাদে বাঁধ সাধে পাহাড়ি ঢলের সাথে ভেসে আসা বালি। কৃষি জমির বেশির ভাগই বালি হওয়ায় জমির পানি ধারণ ক্ষমতা ও উর্বরতা দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় খুবই কম হয়। তথাপি সুবিমলরা বছরের খোরাকের সংস্থান করতে জমিতে ধান চাষ করেন। কিন্তু চার আড়া (৫.১২ একর) জমি চাষ করেও তারা বছরের প্রয়োজনীয় খোরাকের ধান উৎপাদন করতে পারেন না। ফলে গ্রামের সকল কৃষকদের সাথে ছড়ায় বাঁধ দিয়ে বোরো মৌসুমে কিছু জমিতে বোরো ধানের চাষ করে বছরের বাকি খোরাক সংগ্রহ করে থাকেন। একদিকে পাহাড়ি ঢলে ফসল নষ্টের ভয়ে এবং অন্যদিকে বালি মাটিতে সবজি ও অন্যান্য ফসল তেমন ভালো না হওয়ায় কৃষকরা বসতভিটাতে তেমন কোন ফসল চাষ করেন না। বিশেষভাবে বর্ষা মৌসুমে মাটিতে ছিপ ছিপ পানি জমে থাকায় চাষকৃত সবজি ফসলের চারা পচে যায়।


অন্যদিকে শীত বা শুষ্ক মৌসুমে খরা ও সূর্যের প্রখর তাপে ফসল শুকিয়ে মারা যায়। বারসিক ২০১৭ সাল থেকে চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের জনগোষ্ঠী ও কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা জানার পর কৃষকদের পানি, খরা, লালপানি ও বালিসহনশীল ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষের পরামর্শ প্রদান করে। পানি, খরা, বালি ও লালপানি সহনশীল ফসল পরীক্ষামূলকভাবে চাষে বারসিক কৃষকদেরকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা প্রদান করে। বসতভিটা, জলাবদ্ধ জমি ও বালি মাটিতে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষের জন্য বারসিক গ্রামের কৃষকদেরকে বস্তা পদ্ধতিতে মাঁচায় মরিচ ও সবজি চাষের পরামর্শ দেয়। শুরুতে কৃষকরা বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষে তেমন আস্থা না পাওয়ায় খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। তবে গ্রামের এক দু’জন কৃষক-কৃষাণী এক-দু’টি বস্তায় প্রথমে পরীক্ষামূলক মরিচ চাষ করেন। বস্তায় মরিচ চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ায় কৃষক-কৃষাণীরা এ পদ্ধতিতে সবজি চাষে বেশ আগ্রহী হতে থাকেন। ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের কৃষাণী রেনুকা ম্রং বারসিক’র কর্মীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তার নতুন বাড়ি ভিটায় (পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে আসা বালিতে প্রায় দুই ফুট ভরাট হয়ে যাওয়া ধানের জমিতে ২০১৭ সালে তৈরী বাড়ি) ৩০টি বস্তায় ১২ জাতের বারোমাসি মরিচ চাষ করেন। বস্তায় চাষকৃত মরিচ গাছে ব্যাপক ফলন হয়। ২০২০ সালের পর থেকে রেনুকা ম্রং এর দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই ৫/১০টি করে বস্তায় মরিচসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ করছেন।

আপন বড় বোন রেনুকা ম্রং এর বস্তা পদ্ধতিতে মরিচ চাষের সফলতা দেখে সুবিমল ম্রং চলতি বছর (২০২১ সালে) বাড়ির পাশের ৭ কাঠা (৬৬ শতাংশ) জমির তিন কাঠা বা ২৪ শতাংশ (১ কাঠা=৮ শতাংশ) বালি জমিতে বারসিক’র উপকরণ (বস্তা) সহযোগিতায় ১০০টি বস্তায় মরিচ, শিম, পেঁপে ও বরবটি চাষ করেছেন। বস্তায় শিম ও বরবটি রোপণ করে নিচু বালি জমির উপর মাঁচা করে দিয়েছেন। তিন শতাংশ জমিতে ৬০টি বস্তায় ১২ জাতের মরিচ চাষ করেছেন। তথ্য সংগ্রহ করাকালীন সময়ে (১৩ সেপ্টেম্বর/’২১) দেখা যায়, সকল মরিচ গাছে মরিচ ধরেছে। বরবটি প্রথম ধাপে ফল দেয়া শেষ হবার পর একই বস্তায় পুনরায় বীজ রোপণ করেছেন। বস্তায় রোপণকৃত শিম গাছে পুরো মাঁচা ছেয়ে গেছে। বস্তায় ২-৩ ফুট উঁচু বেশকিছু পেঁপে চারা রয়েছে। সুবিমলের চাষকৃত ৭ কাঠা বা ৫৬ শতাংশ জমিটি মূলত নিচু ও বালি, বর্ষা মৌসুমে জমিতে সব সময় দেড়-দুই ফুট পানি জমে এবং কিছুদিন বৃষ্টি না হলে ছিপ ছিপ পানি থাকে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এই জমিতে কোন ফসলই চাষ করা যায়না। সুবিমল শীত মৌসুমে এই নিচু জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করার জন্য এখন থেকেই পলিব্যাগে লাউ ও মিষ্টি কুমড়ার তিন শতাধিক চারা তৈরি করছেন। সাত কাঠা জমির চারপাশে (বেড়া ঘেষে) লাউ চাষের জন্য ৫০টির অধিক গর্ত করে তাতে গোবর মিশিয়ে চারা রোপনের উপযোগি করে রেখেছেন। পলিব্যাগে চারা রোপণের উপযুক্ত হলেই তিনি গর্তে চারাগুলো রোপণ করবেন। বর্ষা শেষ হলে মূল জমিতে গর্ত করে গোবর মিশিয়ে তাতে সরাসরি মিষ্টি কুমড়ার চারা রোপণ করবেন। জমির চারপাশে গবাদি পশু-পাখি থেকে ফসল রক্ষায় বাঁশ ও নেটের বেড়া দিয়েছেন।


সুবিমল চলতি আমন মৌসুমে চার আড়া ধানের জমিতে (৫.১২ একর) ছয় জাতের ধান (রঞ্জিত, রহমান, ব্রি-৩২, বিআর-১১, ব্রি-৪৯ ও বিন্নি) চাষ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি গত বোরো মৌসুমে ছড়ার পানি আটকে সেচ দিয়ে চার কাঠা জমিতে (৩২ শতাংশ) জমিতে ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছিলেন।


কৃষি ফসল চাষের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুবিমল বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে চাকরি হারানোর পর আমি গ্রামে চলে আসি। গ্রামে এসে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় আমি বেকার জীবন কাটাই। আমি কখনো কৃষি কাজ করিনি, কৃষি কাজ অনেক পরিশ্রমের, তাই কৃষি কাজ করতেও ভালো লাগতোনা। তবে গত বছর (২০২১) আমার বড় বোন রেনুকা ¤্রং, সাবিনা রেমাসহ গ্রামের অন্য কৃষকদের দেখে কৃষি কাজে অনুপ্রাণিত হই। আমি জীবনে প্রথমবারের মত এবছরই কৃষি কাজ করছি। বড় বোন রেনুকা ¤্রং এর কাছ থেকে পরামর্শসহ ১২ জাতের মরিচ বীজ নিয়ে এবং বারসিক’র সহযোগিতায় (১০০টি বস্তা) বাড়ির পাশের ৭ কাঠা (৫৬ শতাংশ) বালিময় নিচু জমির তিন শতাংশ পরিমাণ জমিতে দুই ফুট পরিমাণ মাটি উঁচু করে সে জমিতে এবং চারিধারে প্রায় একশ’টি বস্তায় ১২ জাতের মরিচ, শিম, বরবটি, পেঁপে, লাউ, মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছি। তিন শতাংশ জমিতে বস্তায় শিম চাষের পাশাপাশি মাটিতে লালশাক বুনেছি। শিম গাছের জন্য নিচু বালিময় জলাবদ্ধ জমির উপর মাঁচা করে দিয়েছি। শিমের লতায় মাঁচা ভরে গেছে।’


তিনি আরও বলেন, মরিচ গাছে বিভিন্ন আকৃতি ও রঙের মরিচ ধরছে। লালশাক বিক্রির উপযুক্ত হয়েছে। এগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। ৭ কাঠা জমির চারিদিকে বেড়া ঘেঁষে লাউ চারা রোপণ করছি। মূল জমিতে হালচাষ করে ডাটাশাক ও পালংশাক চাষ করবো। শাক খাবার বা বিক্রির পর মূল জমিতে গর্ত করে মিষ্টি কুমড়ার চারা রোপণ করবো। লাউ এর চারা পলিব্যাগে নিজেই উৎপাদন করেছি, মিষ্টিকুমড়ার চারাও পলিব্যাগে করে রাখবো। জীবনে প্রথম কৃষি কাজ করলেও ফলন দেখে আমি কাজটি খুব উপভোগ করছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীতে আমি আমাদের চার আড়া জমিতেও বৈচিত্র্যময় ফল ও ফসলের চাষ করবো। কৃষিতে সফল হলে আর ঢাকায় গিয়ে চাকরি করার ইচ্ছে নেই। তবে এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ বা অন্য কোথাও থেকে কোন ধরণের (বীজ, উপকরণ ও পরামর্শ) সহযোগিতা পেলে কাজটি করতে আমার সহজ হবে। আমার সবজি বাগান দেখে গ্রামের অন্যান্য কৃষক-কৃষাণীরাও আগামীতে বস্তা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করায় আমি আরও অনুপ্রাণিত হচ্ছি। আমি পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফল ও মাল্টা চাষ করার জন্য পলিব্যাগে ড্রাগন ফলের চারা উৎপাদন করছি। ভবিষ্যতে আমার ড্রাগন ফল, মাল্টা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ধরণের ফলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’


সুবিমলের মত আমাদের দেশের শিক্ষিত যুবরা চাকরির পিছনে না দৌড়ে কৃষি কাজে যুক্ত হয়ে নিজের যেটুকু সম্পদ (জমি) রয়েছে তাতে বছরব্যাপী পরিবেশবান্ধব উপায়ে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করে তাহলে কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি সকলের জন্য (নিজ ও ভোক্তা) নিরাপদ খাদ্যও নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় ফসল ও খাদ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং প্রাণবৈচিত্র্যও সংরক্ষিত হবে। জনগোষ্ঠী জন্য বৈচিত্র্যময় খাদ্য সুনিশ্চিত হবে। শিক্ষিত যুবক সুবিমলের গৃহীত উদ্যোগ দেশের সকল যুবদের জন্য অনুকরণীয়।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.