Posted in

বাঁচাও বরেন্দ্র, রক্ষা কর বরেন্দ্র এলাকার পানি

::নাচোল থেকে অমিত সরকার::

যতদূর চোখ যায় উঁচুনিচু টিলাময় ভূমি। থরেথরে সাজানো সবুজে মোড়ানো সিঁড়ি। মাঝে মাঝে গলা জড়াজড়ি করে তালগাছের বাহার। দূর থেকে দেখেই মনে হয় এ যেন কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া কোন দৃশ্যের অবতারণা। আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র ভূমির কথা বলছি। নির্বিচারে গাছপালা নিধন, ভূগর্ভস্থের পানির নির্বিচার উত্তোলন এব প্রতিবেশী দেশের বৈরী আচরণে (তিস্তা নদী চুক্তি) বাংলাদেশের বরেন্দ্র এলাকার  পরিচিত ওই চিত্রটি আজ আর নেই; এলাকাটি মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো কোন একদিন উঁচু-নিচু বরেন্দ্র ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হবে। অধিক জনসংখ্যার চাপের কারণে কৃষি, আবাসস্থল, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির পরিমাণ কম হওয়ায় বন-জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কমেছে বৃষ্টিপাত সংঘটনের হার, বাড়ছে বৈশ্বিক উষœতা। এসব প্রতিকূলতার ও সমস্যার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চল দিনকে দিন মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ হচ্ছে একটি কৃষি প্রধান দেশ। সরকার দেশের খাদ্য চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিনিয়ত নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের মাধ্যমে ধান চাষের জন্য বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি নির্বিচারে উত্তোলিত হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটিই ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে চাল রপ্তানি করা। তাই তো সরকার এই অঞ্চলের কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছে সেচনির্ভর বোরো ধান বীজ। এই ধান বীজে যেমন রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয় তেমনিভাবে বেশি প্রয়োজন হয় সেচের পানি, যা মাটির নিচের পানি উত্তোলন ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। কেননা কম বৃষ্টিপাত, নদী, পুকুর, জলাশয়ে জল শূন্যতা, খরার প্রকোপ এমনিতেই এই এলাকায় মাটির উপরিভাগে পানি প্রাপ্যতা কম। তাই বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য মাটির নিচের পানি উত্তোলন করতে হয়েছে কৃষকদের।

গবেষকদের মতে, এভাবে যদি বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থের পানির ব্যবহার চলতে থাকে তাহলে হয়তো আর ১০-১৫ বছর পর পানি পাওয়া যাবে না। প্রতিবছর বৃষ্টির পানি যে হারে জমা হয়, তার চাইতে গভীর নলকূপের সাহায্যে বেশি পানি তুলে নিলে সৃষ্টি হয় ভূগর্ভস্থ পানির অভাব। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি রক্ষা করতে হলে পানি কম প্রয়োজন হয় এমন ধরনের খাদ্যশস্য আবাদের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ৩ থেকে ৩.৫ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। আমরা একটু যদি লক্ষ্য করি, এক কেজি ধানের বাজার মূল্য ১৫ থেকে ২০ টাকা আর এক লিটার বিশুদ্ধ পানির বাজার মূল্য ২০-২৫ টাকা। সেই হিসাব করলে আমরা এক কেজি ধান উৎপাদনের জন্য শুধু পানি বাবদ খরচ করছি প্রায় ৬০-৬৫ হাজার টাকা, যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। নাচোল উপজেলায় মোট আবাদী জমির পরিমাণ ২৬২৭০ হেক্টর। এই জমিগুলোর মধ্যে বোরো মৌসুমে সেচের আওতাধীন জমির পরিমাণ ১৩,৫৭৫ হেক্টর। এই ১৩,৫৭৫ হেক্টর জমি সেচ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় বিদ্যুৎ চালিত ডিপ টিউবয়েল রয়েছে ৫৫০টি। এর মধ্য একটি মালিকানাধীন আর বাকিগুলো সব বিএমডিয়ের। মিনি/ছোট ডিপ টিউবয়েল বিদ্যুৎ চালিত রয়েছে ১১৬০টি। এগুলো সবই ব্যক্তি মালিকানাধীন। ডিজেল চালিত এলএলপি সেচযন্ত্র (পুকুর, খাল, খাড়ি থেকে পানি সেচ দেওয়া যন্ত্র) রয়েছে ৯০০টি। বিদ্যুৎ চালিত এলএলপি রয়েছে ১২টি। এসব এলএলপি সেচযন্ত্রও ব্যক্তিমালিকানাধীন। (তথ্য সূত্র-নাচোল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএমডিএ)

উপরোক্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, সম্পূর্ণ আবাদী জমি সেচের আওতায় নিতে বর্তমান সেচ যন্ত্রের সমান অর্থাৎ আরও প্রায় ২৬২২টি সেচ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। নাচোল উপজেলার সব আবাদী জমিগুলোকে যদি বোরো ধানের চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয় তাহলে ভূ-গর্ভস্থের পানির ওপর প্রচ- চাপ পড়ে যাবে। এতে করে শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থের পানির নিচে নেমে যাবে না, বরং এলাকায় বিরাজমান পানি সঙ্কট আরও ভয়াবহ আকার রূপ নেবে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির হাত থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলকে বাঁচাতে আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া দরকার। সরকারিভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিক পানি নির্ভর খাদ্যশস্য আবাদের পরিবর্তে কম পানি নির্ভর খাদ্যশস্য তথা গম, কাউনসহ রবিশস্য আবাদের দিকে মনোযোগী হতে হবে। পাশাপাশি নির্বিচারে গাছপালা কাটা বন্ধ করতে হবে। মাটির প্রয়োজন মতো জৈব, অজৈব সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষককে সচেতন করে তুলতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির নির্বিচার উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং উপরিভাগের পানি ব্যবহারের নিশ্চয়তা তৈরির জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি নদী, খাল, পুকুর পুনঃখননের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এতে করে বরেন্দ্র এলাকা বাঁচবে, বাঁচবে সেখানকার অধিবাসী ও প্রাণবৈচিত্র্য।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.