সাম্প্রতিক পোস্ট

“ভূমিহীন ছিলাম, এখন আমরা নিজেদের উন্নয়ন করছি”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে অনিতা রানী বর্মণ

ভূমিকা

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা। নানা জাতি ও পেশার বসবাস এই এলাকাটিতে। প্রবীণজনের তথ্য এবং ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় একসময় আদিবাসিসহ সনাতন ধর্মের লোকেরাই এই এলাকাটির পরিত্যক্ত জমি শস্য ফসলের চাষ উপযোগী করে তুলেছিলেন, বন জঙ্গল কেটে সবুজ শস্য ফসলের চাষ উপযোগী করে তুলেছিলেন আদিবাসিগণই। তবে নানা কারণেই অনেক আদিবাসীসহ সনাতন ধর্মের অনেক পরিবার ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। নিজের বসবাসের জায়গাটুকুও আর পাচ্ছে না তাঁরা, এ যেন নিজভূমিতে পরবাস।’ তবুও থেমে থাকেননি যাযাবরের মতো বসবাসকারী কিছু মানুষ। নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও সহায়তা নিয়ে অনেক পরিববার আজ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন। এমনকি নিজেরা সংবদ্ধ হয়ে সরকারি খাসজমি নিয়মানুযায়ী গ্রহণ করে সেখানে গ্রাম গড়ে তুলেছেন। তেমনি একটি গ্রাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের আওয়াল পাড়া। অনেকে গ্রামটিকে পুকুড়িয়া পাড়া নামেও ডাকেন। এখানে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকে ভূমিহীন ওরাঁও, সর্দার, মুড়ালী, ঠাকুর, নাপিত, সনাতন, বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকজন এসে বসবাস শুরু করেছেন। গ্রামের মধ্যে পরিত্যক্ত পুকুরটি নিজেদের উদ্যোগে সংস্কার করে নিজেরা যৌথভাবে মাছ চাষ করছেন এবং নিজেদের গ্রামটির উন্নয়নে নানা ধরনের উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।

বসবাসের আগের ইতিহাস

উচ্চ বরেন্দ্র ভুমির ছোট্ট একটি গ্রাম আওয়াল পাড়া। চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ৪নং ইউনিয়নে আওয়াল পাড়া গ্রামটি অবস্থিত। এই পাড়াটির অতীতের অবস্থান সর্ম্পকে মৃদুল রানী (৫৫) বলেন, “এই পাড়াটিতে আগে মানুষের বসবাস ছিল না। জায়গাটি জঙ্গলে পরিণত ছিলো। পার্শ্ববতি গ্রাম পুকুরিয়া পাড়ার সনাতন ধর্মাবল্বী বাসিন্দারা এই জায়গাটি শশ্মান ঘাট হিসেবে ব্যবহার করতেন। জায়গাটি ছিলো খাস।” তথ্যদাতা প্রভাতি রানী কাছ থেকে জানা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুর গ্রামের সেকেন্দার মহরিল এই জায়গাটি দখল করে নেয়। এরপর চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে আগত কিছু বাঙালি পরিবার যাদের (স্থানীয় ভাষায় দিয়ারা) বলে তারা এই জায়গাটি রাতারাতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তারা তাদের বসবাসের উপযুক্ত করে নেয় । এরপর নেজামপুর উইনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আ: আওয়াল এই জায়গাটিতে স্থানীয় জনগণ ছাড়া অন্য কাউকে বসবাসের অনুমতি দেননি। এ নিয়ে অনেককিছু ঘটেছে। তবে অবশেষে স্থানীয়রাই এখানে বসবাস করছেন এখন। এভাবে এখন থেকে প্রায় ১৮/১৯ বছর আগে বরেন্দা গ্রাম ৩৫টি পরিবার নিয়ে আওয়াল পাড়াটি গড়ে উঠেছে। আওয়াল চেয়ারম্যান নিজে এবং স্থানীয় (বরেন্দা, লক্ষ্মীপুর, পচাকানদর, ফুলকুড়ি) গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে প্রতিটি পরিবারকে ৪ কাঠা করে জায়গা ভাগ করে দেন। আওয়াল চেয়ারম্যান ও স্থানীয় কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এই পরিবারগুলো তাদের বসবাসের জায়গা পেয়েছে এই গ্রামটির নাম দেওয়া হয় আওয়াল চেয়ারম্যানের নামানুসারে আওয়ার পাড়া।

গ্রাম উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ

আওয়ালপাড়ায় বসবাসের পর বাসিন্দারা ছোট ২টি এবং বড় একটিসহ মোট ৩টি পুকুর পায়। এরপর বিএমডিএ এর সহায়তায় পুকুরটি খনন করে তারা সম্মিলিতভাবে একটি সমিতির মাধ্যমে মাছ চাষ শুরু করেন। একটি ছোট ও একটি বড় পুকুরে ২০টি পরিবার এবং বাকি একটি ছোট পুকুর ৯টি পরিবার মিলে মাছ চাষ করেন। মাছের পোনা ক্রয়ের জন্য প্রতিটি পরিবার প্রথমত ১০০ টাকা ও পরবর্তীতে ৬০০ টাকা হারে চাঁদা দিয়ে মাছ চাষ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে আরো ৬টি পরিবার এই পুকুরটির সাথে যুক্ত হতে হন যাদের কাছ থেকে ৩৫০০ টাকা নেওয়া হয় সদস্য ফি হিসেবে। এই পরিবারগুলো ছোট পুকুরে মাছের পোনা ছেড়ে পোনা একটু বড় হলে বড় পুকুরে স্থানান্তর করেন। পুকুর থেকে বছরে ৩ বার মাছ ধরা হয় এবং মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে মাছের পোনা ক্রয় এবং মাছের খাবার কেনার জন্য ব্যবহার করেবাকি টাকাটা গ্রামীণ ব্যাংকে রাখা হয় বলে শ্রীমতি টুম্পা রাণী জানান।

অভিজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তরুণদের পথচলা

বর্তমানে ২৬টি পরিবার একত্রিত হয়ে আওয়াল পাড়া জাগরণী সংঘ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয় তরুণদের নেতৃত্বে ও অভিজ্ঞদের সহায়তায়ং। এই সংগঠনের সদস্যরা পুকুরের দেখাশুনা করেন। এই প্রসঙ্গে মো. সেকেন্দার আলী জানান, পূর্বে যারা এই পুকুরের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বে ছিলেন তারা পুকুরের মাছ বিক্রি করার টাকা সকল সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করেন। কিন্তু বর্তমানে এই সংগঠনের (ক্লাব) উদ্যোগে মৎস্য সমিতির একটি গ্রামীণ ব্যাংকে যৌথ একাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এই একাউন্টে মাছ বিক্রির টাকা জমা করেন। এই ব্যাংক একাউন্টটিতে তিনজনের যৌথ স্বাক্ষরে মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা হয়। একাউন্টের অন্যতম স্বাক্ষরকারী শ্রী কাজল (২৮) এই প্রসঙ্গে বলেন, “এই পুকুরে মাছ চাষ করে যে টাকা পাওয়া যায় তার সব টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয় । এই পাড়ায় যদি মেয়ের বিয়ে হয় সেক্ষেত্রে সেই পরিবারটিকে ১০ কেজি মাছ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “শুধু তাই নয় কেউ মারা গেলে ও তার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানের জন্য পরিবারকে ১০ কেজি মাছ দেওয়া হয়। এছাড়া গ্রামের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার জন্য আর্থিকভাবে সাহায্য করা হয়।” এই পুকুরের মাছ বিক্রি টাকা দিয়ে একটি মন্দির ও একটি ক্লাব (টিনের তৈরি) তৈরি করা হয়। তাছাড়া হিন্দু সমাজের ধর্মীয়, বিয়ে, শ্রাদ্ধসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হাড়ি, পাতিল, চেয়ার, টেবিল, থালা, গ্লাস, হাতা, চামচ কেনা হয়েছে। তরুণদের উদ্যোগে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহায়তায় এই গ্রামের পূর্বদিকে একটি পাকা ঘাট তৈরি করা হয়। পুকুরের সংগঠণের সদস্যরা প্রতি মাসের ৫/৬ তারিখে সভায় বসেন পুকুরের ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য।

অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ব্যবহার

শুধু সমন্বিতভাবে মাছ চাষ নয় বরং গ্রামের পরিবেশসহ সামগ্রিক উন্নয়নের দিকেও নজর রয়েছে আওয়ালপাড়ার বাসিন্দাদের। পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য নিজেরাই কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায্যতা, বৈচিত্র্যময় এবং আলোকিত সমাজ গঠনে নিরালসভাবে কাজ করে চলেছে। এ চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে গ্রামের নারীরা নিজের ও পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে মাঠে ঘাটে বিভিন্ন ধরনের কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত উদ্ভিদ সংগ্রহ করেন। এগুলো তারা কখনো খাদ্য বা কখনো ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেন। মূলত আওয়ালপাড়া গ্রামের নারী উন্নয়ন সংঘ সদস্যদের উদ্যোগে এবং বারসিক’র সহায়তায় ২০১৩ সালে আয়োজিত অচাষকৃত উদ্ভিদের পাড়া ও রান্না প্রতিযোগিতার পর থেকে অচাষকৃত উদ্ভিদ সম্পর্কে তারা সচেতন হয়েছে এবং এগুলোর ব্যবহার জেনেছেন। এই প্রসঙ্গে গৌরি রাণী মুখার্জী বলেন, “আমাদের আশেপাশে যে সব অচাষকৃত উদ্ভিদ বেড়ে উঠে তা থেকে পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য ও বজায় থাকে। এগুলোই হলো আমাদের প্রকৃত খাবার। এগুলো আমাদেরকে ও আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এই উদ্ভিদগুলো বেঁচে থাকলে আমরাও বাচঁবো, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচবে।”

বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ

মাছ চাষ ও অচাষকৃত উদ্ভিদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি আওয়াল পাড়ার বাসিন্দারা বৈচিত্র্যময় শাকসবজি আবাদ করে পরিবারের পুষ্টি ও খাদ্য চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গ্রামবাংলার নারীরা তাদের সংসারের কাজের পাশাপাশি কোন না কোন কাজের সাথে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। তারা বাড়ির উঠানে, বাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা জায়গায় বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করেন। এই সবজি চাষের ফলে তারা নিজেদের সংসারের সবজি চাহিদা পূরণের পাশাপশি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করে করেন। শাকসবজির বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি তারা পরস্পরের সাথে বিনিময় করেন। এভাবে আগের তুলনায় আওয়ালপাড়ায় শাকসবজির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, পরস্পরের সাথে সবজি বিনিময় করায় তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে।

উপসংহার

এভাবে বিভিন্ন মানুষের প্রচেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে আওয়ালপাড়ার বাসিন্দারা আজ ভূমিহীন অবস্থা থেকেই ভূমির মালিকানা লাভসহ গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সম্মিলিতভাবে মাছ চাষ, বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ এবং পরস্পরের সাথে বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হচ্ছে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: