সাম্প্রতিক পোস্ট

মানিকগঞ্জে শিক্ষা বিস্তারে তরুণদের উদ্যোগ

হরিরামপুর মানিকগঞ্জ থেকে সত্যরঞ্জন সাহা

বাংলাদেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে এখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের সন্তানেরা এখনও শিক্ষার চেয়ে আয়বর্ধক কাজের দিকেই বেশি মনোযোগী হচ্ছে। কেননা পরিবারের অন্ন যোগাড় করাই যে তাদের প্রাথমিক কাজ! প্রত্যন্ত অঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে এ প্রবণতা সবচে’ বেশি লক্ষ্য করা যায়। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলে মণিঋষি একটি জনগোষ্ঠী যারা বংশপরম্পরায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। মণিঋষিদের শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ময়ারাম মণিদাস (৪৮) বলেন, “মণিঋষি সম্প্রদায়ের লোকজন লেখাপড়া জানে না। আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া না করে বাপ-দাদার সাথে বাঁশ-বেতের কাজে বেশি মনোযোগী। এইভাবে বাঁশবেতের কাজ করে এই পর্যন্ত চলছে।” অন্যদিকে নিত্য সরকার (৩৫) বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখতেছি মণিঋষিদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে না। লেখাপড়ার প্রতি বড়রা কেউ গুরুত্ব দেয় না। এজন্য মণিঋষি প্রতিটি পরিবারে লোকজন লেখা পড়া না করে বাঁশ-বেতের কাজ করে বড় হয়। শিক্ষার আলো না থাকায় অর্থনৈতিক দিক দিয়েও দুর্বল হয়ে পড়ছে।”
edu
মণিঋষিসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে হরিরামপুরের যুবকসহ গ্রামের অন্যান্য পেশাজীবী মানুষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাদের এই উদ্যোগের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন এলাকার সুশীল সমাজ, সমাজ সেবক, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, উপজেলা শিক্ষা অফিস, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ। যুবকরা অন্যদের সহযোগিতায় এলাকার এসব মানুষের জন্য স্কুল চালু করার জন্য স্কুল ঘর নির্মাণ, স্কুল উপকরণ সংগ্রহ, অভিভাবকদের সচেতন করানোসহ নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এই প্রসঙ্গে পাটচর গ্রামের রফিক মাতবর, সেরজন মোল্লা  বলেন, “আগে শিক্ষার প্রয়োজন পড়ত না কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা ছাড়া কিছুই হয় না। আমরা চরের মানুষ ছেলেদের ছোট থেকে ছাগল-গরু রাখার কাজে দেই। পরে কৃষি কাজ করে, লেখা পড়ার খোঁজ-খবর মা-বাবা নেয় না।” তারা বলেন, “এখন আমরা বুঝতে পারি আমাদের ভুল হয়েছে। সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য পরিবারে মা-বাবাকে আগে সচেতন হতে হবে, লেখাপড়ার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে, তাহলেই ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া শিখবে।”

মণিঋষিসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য যুবকরা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। সবার সহযোগিতায় স্কুল স্থাপন করে স্কুলের কার্যক্রম চলছে। প্রি-প্রাথমিক স্কুল হওয়ায় বঞ্চিতরা লেখাপড়ার করার সুযোগ পাচ্ছে। বারসিক প্রি প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র  চালু করণের  উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করেছে, কারিগরি ও শিক্ষা  উপকরণ (ব্লাক বোর্ড, চক ডাষ্টার, রেজিষ্টার খাতা, হাজিরা খাতা, সাইন বোর্ড, ব্যানার, প্রচারের জন্য বিল বোর্ড, পোষ্টার) দিয়ে সহায়তা করেছে, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে জানান ওই গ্রামের মানুষ। এই প্রসঙ্গে উপজেলা সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নায়েব আলী বলেন, “শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এলাকার ঝরে পড়া, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসবে। উপজেলা শিক্ষা অফিস বিনামূল্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর বই ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছে।” এভাবে যুবকদের উদ্যোগে এবং সবার সহযোগিতায় এলাকার পিছিয়ে পড়া, ঝরে পড়া, শিক্ষা বঞ্চিতদের লেখাপড়ার জন্য ইতিমধ্যে হরিরামপুর চারাঞ্চলের পাটগ্রামচর, খড়িয়া ও সুতালড়ি গ্রামে ৫টি শিক্ষা স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হয় যেখানে প্রায় ১৮৩ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত লেখাপড়া করছে। এই প্রসঙ্গে ময়ারাম মণিদাস বলেন, “লেখাপড়া না জানার কষ্ট আমরা উপলব্ধি করছি। এ উপলব্ধি থেকে আমাদের সকলের সহযোগিতায় শিশু শিক্ষা চালু করেছি পাওনান কালি মন্দিরের জায়গা। শিশু শিক্ষা স্কুল করে আমরা অভিভাবকগণ মনের শান্তি পাইতেছি”।
edu-1
এসব শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করার জন্য সর্বস্তরের মানুষ সহযোগিতা করেছেন। কেউ কাঠ, বাঁশ দিয়ে, কেউবা মাটি, টিন, দরজা ও জায়গা দিয়ে আবার কেউ চেয়ার, বেঞ্চ ও স্কুল উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। সবার উদ্যোগ ও সহযোগিতায় শিক্ষা স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হওয়ায় সমাজের লোকজন স্কুলের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সুন্দরভাবে পরিচালনা করছেন। তাছাড়া দলিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীর শিক্ষার উন্নয়নের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিকটে আর্থিক অনুদানের জন্য আবেদন করা হয়। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে হরিরামপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুবিনা ফেরদৌসী নিকট বরাদ্দের জন্য কাজপত্র আসে। হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদেশে একটি টিম মণিঋষি শিক্ষা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিস মণিঋষি শিক্ষা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বরাদ্দ অনুমোদনের জন্য কাজপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করেন।

তরুণ প্রজন্মেরর হাতে নগদ অর্থ না থাকলেও আছে উদ্যম, সাহস ও মনোবল। এ শক্তিকে নিয়েই তারা সমাজে নানান উন্নয়নমূলক কাজ করে সফল হয়েছেন। হরিরাপুর উপজেলায় মণিঋষিসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য শিক্ষা বিস্তারে সমাজের মানুষের সহযোগিতায় তরুণদের এ উদ্যোগ নিশ্চয়ই অন্যান্য এলাকার তরুণদের জন্য উদাহরণ হবে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: