Posted in

উপকূলে লবণাক্ততার প্রভাবে হ্রাস পাচ্ছে প্রাণীসম্পদ

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে গাজী আল ইমরান

উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে দিনে দিনে কমতে শুরু করেছে প্রাণী সম্পদ, এমনটাই বলছে সাধারন মানুষ। শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাটসহ বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে প্রাণী সম্পদের বর্তমান অবস্থার কথা জানতেই তারা লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রাণী সম্পদ ব্যাপকভাবে হুমকির মূখে রয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে আইলা পরবর্তী কালীন সময়ে এই সম্পদের উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকেই। এলাকার বিভিন্ন বিল অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, উপকূল অঞ্চলে ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হচ্ছে গৃহপালিত গবাদি পশু গরু ছাগল, মহিষ-ভেড়ার চারণভূমি। ঘনবসতির কারণে একদিকে কমছে কৃষি জমি, অন্যদিকে ভূমি খনন করে গড়ে উঠছে নতুন নতুন মাছের ঘের, মিষ্টি আঁধারগুলো ভরে যাচ্ছে লবণ পানিতে। এছাড়া অতিদ্রæত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে এমনটাও বলছেন অনেকেই। এতে একদিকে গবাদি পশুর বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে লবণ পানির আগ্রাসনে বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র।

ধুমঘাট এলাকার গবাদী পশু পালনকারী নারী পুরুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখান থেকে ২০ বছর পূর্বে প্রাণী সম্পদ অর্থাৎ গবাদী পশুতে ভরপুর ছিল এই অঞ্চল। পুকুর ভরা মাছের সাথে ছিলো গোলা ভরা ধান, আর গোলা ভরা গরু মহিষ ছাগল, ভেড়াসহ বিভিন্ন গবাদী প্রাণী। কিন্তু তা আজ বিলুপ্তির পথে। এ অঞ্চলে ছিলো ঘোড়া, যা ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ থাকলেও আজ চোখে পড়ে কদাচিৎ। বর্তমানে কি কি গবাদি পশু আছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘বর্তমান সময়ে গরু ছাগল মহিষ ভেড়া থাকলেও তা না থাকার মতো, এর মধ্যে মহিষ রয়েছে একেবারেই না থাকার মধ্যে। মহিষ চরানোর জন্য এবং মহিষের জন্য যে পুকুরের দরকার তা আজ এলাকায় চোখে মেলে না।’

গবাদি পশু বা প্রাণী সম্পদের উপর বিরূপ প্রভাবের কারণ হিসেবে জানা যায়, আইলা পরবর্তী সময়ে গবাদি পশু হারিয়েছে তার গোচারণ। এছাড়া এলাকার অধিকাংশ খাল বিলে যে পানি রয়েছে তা লবণাক্ততায় ভরপুর। লবণ বেড়ে যাওয়ার কারণে বিলে ঘাস জন্মাতে পারেনা যার ফলে গবাদি পশু পালন এবং বংশবৃদ্ধিতে এটি একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এমনটাই জানিয়েছে ভূক্তভোগী মহল। এলাকার অনেকের ভাষ্যমতে, ‘লবণ পানি খাওয়ার ফলে গরু ছাগল মহিষসহ বিভিন্ন প্রাণীর রোগবালাই বৃদ্ধি পেয়েছে।’

এছাড়া জুরা খুড়া রোগসহ বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটেছে। এলাকার লবণাক্ততা কিভাবে বাড়ছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘বছরের যে সময়ে বর্ষা হওয়ার কথা সে সময়ে বর্ষা হয় না, তারা বলছেন, কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবেশ আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে যা দ্রæত গতিতে পরিবর্তন হতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া এলাকার মানুষেরা লবণ পানির চাষে ঝোকার কারণে এলাকার অধিকাংশ খাল বিল লবণ পানিতে নিমজ্জিত। এলাকার গবাদী পশুর দিকে তাকালে দেখা যায়, হাড়ের গায়ে চামড়া মিশেছে। এলাকায় নেই চারণভূমি। যতটুকু রয়েছে সেখানে নেই খাদ্য। এলাকার বয়বৃদ্ধরা বলছেন, বর্তমান সময়ে ধান ক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যার কারণে সেখান থেকে বেড়ে ওঠা ঘাস খাওয়ার ফলে অনেক ধরনের নতুন নতুন রোগের দেখা মিলছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

উপজেলার শ্রীফলকাঠি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এখানে বহু গবাদি পশুর চারণভূমি রয়েছে। কিন্তু তাদের শারীরিক গঠন তেমন ভালো নেই। কারণ তাদের নেই অবাধ চারণভূমি, নেই তৃষ্ণা মেটানোর ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে পান করছে খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর লবণ পানি। যেটা গবাদি পশুর শরীরের জন্য ক্ষতিকর। যার কারণে বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে গবাদি পশু, যেমনটা বলছিলো ধুমঘাট এলাকার মানুষেরা।

তবে গবাদি পশু বাঁচাতে বহু আঁকুতির শেষ নেই এখানকার স্থানীয় মানুষের। গবাদি পশুগুলো দেখভাল করার বিষয়গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নিজের পরিবারের সদস্যদের মতই গবাদি পশুকে ভালোবেসে চলেছেন তারা। সুতরাং বিধাতা সৃষ্ট দুর্যোগের হাত থেকে রেহাই না পেলেও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের হাত থেকে রেহাই চেয়েছেন এলাকার মানুষেরা।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা উপসহকারি প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা পরিতোষ কুমার মন্ডলের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে কাঁচা ঘাসের পরিমাণ অনেক কম, যার কারণে গবাদি পশু তার প্রয়োজন মতো খাবার পাচ্ছেনা।’ তিনি বলেন, ‘লবণাক্ততা এত পরিমাণে বেড়েছে যে অধিকাংশ এলাকায় গো চারণ ভূমি নেই বললেই চলে। ধানের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে তার প্রভাব গবাদি পশুর উপরেও পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধানের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়ার ফলে ধানের খড় খাওয়ার ফলে গবাদি পশুর ফুড পয়জনিং হচ্ছে, লবণ পানি খাওয়ার ফলে গবাদি পশুর পেট ফুলে যাচ্ছে।’ উপসহকারী প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা বলেন, ‘এসবের কারণে বর্তমানে নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটছে।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.