Posted in

ছুঁয়ে দিতে চাই স্বপ্নের সবটুকু সীমানা

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

বলা হয়ে থাকে পরিবার হলো শিশুর মূল শিক্ষালয়। সে প্রথম শিক্ষা জীবন শুরু করে পরিবার থেকেই। মা এবং অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয় বর্ণমালা। তারপর আস্তে আস্তে আদব কায়দা, অন্যের সাথে ব্যবহার, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবতার গুণাবলী অর্জন করে। কিন্তু সেই পরিবারে যদি এ ধরনের চর্চা না থাকে বা সদস্যরা যদি নিরক্ষর হয় তবে শিশুর শিক্ষা জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রকৃতিতে যেমন বৈচিত্র্যতা আছে, তেমনি আছে জাতিগত বৈচিত্র্যতা। এ দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী প্রভৃতি জাতিস্বত্তার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বাঙালি, অবাঙালিও রয়েছে আবার আছে উচ্চশ্রেণি ও নিম্ন শ্রেণির ভেদাভেদ। বাঙালি নিম্নশ্রেণি/দলিত মানুষের মধ্যে কামার, কুমার, জেলে, চর্মকার বা মুচি সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে।

IMG_20180111_114813
নেত্রকোনা শহরের মালনী রোডে অবস্থিত ঋষিপাড়ায় মুচি সম্প্রদায়ের ১৩৫টি পরিবার বাস করে। এখানে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ‘বারসিক’ একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই গবেষণায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জ্বালানি ইত্যাদি বিষয়ের উপর তথ্য জরিপ করা হয়। এর মধ্যে সবচে’ গুরুত্ব দেয়া হয় শিক্ষাকে। কারণ দেশের একটি বৃহৎ অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৩৫টি পরিবারের মধ্যে শিক্ষার স্তর বিন্যাসে দেখা যায় শিক্ষিতের হার ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ২১.৫%, ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ১৬.৩% এবং ১৪.৮% মানুষ শুধু সাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। অর্থাৎ ৫২.৬ ভাগ মানুষ শিক্ষিত। বাকি ৪৭.৪ ভাগ নিরক্ষর। এঁরা বিভিন্ন কাজে টিপসই ব্যবহার করেন।

গবেষণায় আরো জানা যায়, এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিরক্ষর বা স্বল্প শিক্ষিত থাকার কারণে শিক্ষা বিষয়ে তাঁরা অসচেতন। যে কারণে এ বিষয়ে তাঁদের আগ্রহও কম। তবে এ জন্য তাঁদের সামাজিক অবস্থানও কিছুটা দায়ী। নি¤œ শ্রেণির মানুষ বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তাঁদের সন্তানদের অবহেলার চোখে দেখা হয়। ফলে তারা শিক্ষার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আবার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে শিশুরা একটু বড় হলেই তাদের বিভিন্ন সেলুন বা মুদি দোকানে কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। যে কারণে তারা শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।

IMG_20180124_124744
‘বারসিক’ ২০১৬ সালে যখন ঋষিপাড়ায় গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনা করে তখন শিক্ষা ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত সমস্যা সমূহ চিহ্নিত করা হয়।
১. শিক্ষার প্রতি অসচেতনতা,
২. সামাজিক অবস্থান (শ্রেণিগত) এবং
৩. অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা।

কারণগুলো চিহ্নিত হবার পর ঋষি সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সাথে বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক সভা, একক ও দলগত আলোচনার মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। শিক্ষামূলক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা হয়। অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে যখন শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ তৈরি হয় তখন দেখা দেয় শিক্ষা প্রদান করার জায়গার সমস্যা। জনগোষ্ঠী নিজেরাই এই সমস্যার সমাধান করেন। এই এলাকায় বেসরকারী সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের পরিত্যক্ত একটি ঘর আছে। এই সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে চলে যাবার পর এটি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। সেখানেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। এই কাজে সর্ব প্রথম এগিয়ে আসেন এলাকার প্রবীণ ও আগ্রহী ব্যক্তি রঙ্গু ঋষি। তাঁর সাথে যোগ দেন আরো দুইজন নারী। তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। যার নাম দেয়া হয় ‘শিশু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র’। দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ঋষি সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষা জীবন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০জন। যাদের সকলের বয়স ৪-৬ বছর।

প্রতিদিনের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় প্রার্থনা সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে। তিনজন শিক্ষক প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ান। এখানে মূলত স্কুল পূর্ববর্তী পড়া শেখানো হয়। অর্থাৎ ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগে যখন অক্ষর শেখা, শব্দ তৈরি করা শেখে এখানেও তেমনি করে শেখানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি আচরণ অর্থাৎ প্রবীণ ও বয়োঃজ্যেষ্ঠদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, অন্যদের কিভাবে সম্মান ও সহযোগিতা করতে হয় ইত্যাদি শেখানো হয়। এখানে আরো শেখানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার উপকারিতা, স্বাস্থ্য সম্মত খাবারের পুষ্টিগুণ ইত্যাদি। সপ্তাহে একদিন শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো লক্ষ্য করা হয়। যেমন তাদের নখ কাটা, দাঁত মাজা, পরিষ্কার কাপড় পড়েছে কিনা।

পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে বিনোদনের সাথে শিক্ষা দেওয়া হয়। যেমন ছড়ার মাধ্যমে অক্ষর চেনা, গানের মাধ্যমে গাছ চেনা ইত্যাদি। এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিম-লে পরিচয় করিয়ে দিতে ছড়া, কবিতা আবৃত্তি, দেশের গান, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন খেলাধূলার আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীরা এতে করে আনন্দের মাঝে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পুরষ্কার হিসেবে দেয়া হয় রঙ পেন্সিল, খাতা, কলম ইত্যাদি।

IMG_20180208_113536
সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার মুসলিম ধর্মাবলম্বী অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের এই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। যার ফলশ্রুতিতে দু’জন মুসলিম শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়েছে। অথচ আগে শুধুমাত্র ঋষি পরিবারের ছেলেমেয়েরাই এখানে পড়া লেখা করতো।

এ বছর উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে আটজন শিক্ষার্থী নেত্রকোনা সদরের দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। এবারই প্রথম শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী যৌথ উদ্যোগে সার্বজনীন স্বরস্বতী পূজার আয়োজন করে। সূর্যের হাসি ক্লিনিক ও বারসিক এর সহায়তায় শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনার আয়োজন করা হয়। ৩০জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই বছরের শুরুতে বারসিক’র পক্ষ থেকে বর্ণমালা পরিচয়ের বই প্রদান করা হয়। এছাড়া অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিমাসে অভিভাবক সভা করা হয়। শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক রঙ্গু ঋষি প্রতিদিন সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে তাদের পড়াশুনার খোঁজ খবর সংগ্রহ করেন। কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে বাড়ি গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন।

এভাবেই চলছে মালনী ঋষিপাড়ার ‘শিশু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র’র কার্যক্রম। ছেলে মেয়েদের পড়া লেখা ও বিনোদনমূলক কর্মকা-ের প্রতি আগ্রহ দেখে অভিভাবকগণও খুশি। কারণ তাঁরা এ ধরনের সুযোগ পায়নি বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কিন্তু নিজেদের সন্তানের বেলায় এমনটি চায়না। তাঁরা চায় তাঁদের সন্তানরা যেন পড়ালেখা শিখে ভালো চাকরি করতে পারে, মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। তাহলে কেউ তাঁদের মুচি বলে অবহেলা করবেনা।
সমাজের সকল মানুষকে সমানভাবে দেখতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। এর ফলে সূচিত হবে বর্ণ বৈষম্যহীন নতুন সমাজ। যে সমাজে উঁচু নিচুর ভেদাভেদ থাকবেনা। অস্পৃশ্য বা ছোট জাত বলে কেউ অন্যদের ঘৃণার চোখে দেখবেনা। দেশটা আমাদের এবং সকলের। সেখানে যেমন কোকিলের ডাকে বসন্ত আসে, তেমনি বৃষ্টি এলে ময়ূর তার পেখম মেলে দেয়। প্রকৃতি কখনই কুৎসিত বা সুন্দরকে ভিন্ন চোখে দেখেনা। প্রকৃতিকে রাঙাতে উভয়েরই প্রয়োজন আছে। আমরা যদি শ্রেণি বা জাতের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে সকলকেই সমান ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ দেই তাহলে আমাদের দেশটা প্রকৃত পক্ষেই উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। সকল স্তরের সকল মানুষ মিলে ছুঁয়ে দিতে পারবো স্বপ্নের সবটুকু সীমানা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.