সাম্প্রতিক পোস্ট

ধানবীজ অঙ্কুরোদগমের লোকায়ত পদ্ধতি

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে অর্পণা ঘাগ্রা

কৃষিকে কেন্দ্র করেই গ্রামীণ জনগণের প্রাত্যহিক জীবন আবর্তিত হয়। কৃষি গ্রামের মানুষের জীবিকা ও প্রতিদিনের ধ্যানজ্ঞান ও চর্চার বিষয়। তাই কৃষিকাজের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে কৃষিকেন্দ্রিক বিভিন্ন লোকায়ত জ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রথা। একইভাবে নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার আদিবাসী ও সাধারণ কৃষক জনগোষ্ঠির মধ্যে ধানবীজ অংকুরোগমের জন্য তৈরি হয়েছে নানা ধরণের লোকায়ত জ্ঞান।

বীজ কৃষির প্রাণ। কৃষক তাই পরম মমতায় আগলে রাখেন শস্যবীজ। অনাদিকাল থেকে এদেশের কৃষক নিজের প্রয়োজনে ধানসহ অন্যান্য ফসলের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করেন। আবার বীজ অঙ্কুরোদগমনের জন্য কখনো বা বদলে যাওয়া প্রকৃতির কৃষিব্যবস্থার সাথে  টিকে থাকার জন্য এখনও চর্চা করছেন কৃষি অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান।

Exif_JPEG_420

কৃষিব্যবস্থার সাথে যৌথ পরিবার প্রথার সম্পর্ক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যৌথ পরিবারে সদস্যদের  কৃষিজমি এক সাথে থাকতো। তাই কৃষক পরিবারে সেই সময় জমির পরিমাণও বেশী ছিল। ফলে কৃষকদের ফসল উৎপাদনের জন্য বড় আকারের বীজতলা তৈরি করতে হত যাতে বেশি পরিমাণ বীজ লাগতো। কতখনকার দিনে কৃষকরা ধানবীজ অংকুরোদগমনের জন্য বড় ডুলি বা পায়লা ব্যবহার করতেন। বীজের পরিমাণ বেশি হলে বীজ দ্রুত গরম (ওম) হয় এতে অংকুরোদগম ভালো হয়। বীজে ওম আনার জন্য কলা পাতা, খড় ইত্যাদি পরিবেশ বান্ধব উপকরণ ও ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজার থেকে ছোট ছোট বীজের প্যাকেট এনে প্যাকেটেই বীজ গজান হয় এমনটিই জানালেন নাগঢড়া গ্রামের কৃষক রঞ্জিত সরকার (৫২)। বীজ গজানোর ক্ষেত্রে কলাপাতার উপকারিতা সম্পর্কে তিনি  বলেন, বীজ গজানোর জন্য যে পাত্রই ব্যবহার করা হোক না কেন পাত্রের উপরে কলা পাতা দিলে বীজের উপরের অংশেও নিচের অংশের মত সমান আর্দ্রতা থাকে যা বীজকে শুকিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এর ফলে পাত্রের উপরের ও নিচের অংশের বীজ সমানভাবে অংকুরিত হয়।

বর্তমানে কলমাকান্দা অঞ্চলের কৃষকরা বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাজার থেকে ক্রয় করা বীজের সঠিক অঙ্কুরোদগমের বিষয়ে দুশ্চিন্তাও কৃষকদের বেড়েছে। বীজধান নষ্ট হওয়ার ভয়ে কলমাকান্দার ডুবিয়ারকোনা গ্রামের কৃষক মো: মজিবর রহমান (৫৮) দীর্ঘদিন যাবৎ নিজস্ব পদ্ধতিতে ধানবীজের অঙ্কুরোদগমন পরীক্ষা করেন। তিনি একটি রুমাল আকারের সূতি কাপড়ে কিছু বীজধান পেঁচিয়ে ১-২ রাত পুকুরের পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। এরপর পানি থেকে উঠিয়ে খড়ের ভিতর দুই দিন দুই রাত চাপা দিয়ে রাখেন। দুদিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরোদগমন না হলে তিনি বীজগুলো আবার কাপড়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে নেন। তারপর আধ ফুট মাটি গর্ত করে দুই রাত মাটিতে পুঁতে রাখেন। দু’রাতের পর মাটি থেকে উঠিয়ে দেখেন। এভাবেও  অংকুরোদগমন না হলে তিনি বীজগুলো পুনরায় কাপড়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে নিজের কোমরে ১দিন ১ রাত বেঁেধ রাখেন। এর পরও যদি বীজ অঙ্কুরোদগম না হয় তাহলে তিনি সেগুলো আর বীজধান হিসবে ব্যবহার করেন না। এভাবে পরীক্ষার  ফলে  অধিকাংশ ধান নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁেচ যায়।  এ সম্পর্কে তিনি বলেন “ কোন ধান বীজ দেইখ্যা যখন মনে হয় যে এই ধান ঠিকমত গজাইব না তখন মনের সন্দেহ দূর করার লাইগ্যা আমি এই পরীক্ষা কইরা দেখি”। Exif_JPEG_420

বিশারা গ্রামের কৃষাণী আম্বিয়া খাতুন এখনও ধানবীজ অঙ্কুরোদগমনের জন্য বাঁশের তৈরি পায়লা বা ডুলি ও কলার পাতা ব্যবহার করেন। এর জন্য তিনি  যে পায়লা/ডুলিতে ধান বীজ গজানোর কাজে ব্যবহার করেন তা প্রথমে গোবর দিয়ে লেপে শুকান। এরপর বস্তায় ভরে পুকুরের পানিতে দুই রাত ডুবিয়ে রাখা বীজ পায়লায় ঢালেন এবং কলার পাতা দিয়ে ঢেকে দেন। এরপর ভারী জিনিস দিয়ে চাপ দিয়ে ২ রাত রেখে দেন। দু’রাতের পর বীজগুলো সঠিকভাবে অঙ্কুরোদগমন হয়েছে কিনা তা খুলে দেখেন।

কৃষকদের নিজস্ব উদ্ভাবিত লোকায়ত কৃষি প্রযুক্তিগুলি একদিকে যেমন পরিবেশ বান্ধব তেমনি ব্যয় সাশ্রয়ী। বীজ অংকুররাদগমনের ক্ষেত্রে কৃষকের এই নিজস্ব পদ্ধতিগুলোর প্রসার ঘটলে প্রান্তিক কৃষকরাই উপকৃত হবেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: