সাম্প্রতিক পোস্ট

বৈচিত্র্যময় ফসলে দোল খাচ্ছে হরিরামপুরের চরাঞ্চল

হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ থেকে মুকতার হোসেন

হরিরামপুর চরাঞ্চল ফসলের মাঠের দিকে তাকালে দেখা যায়, সরিষা, গম, পায়রা, মোটর কালাই, মুসরী কালাই, মাসকালাইসহ বিভিন্ন ফসলের হাসিতে ঝলমল করছে। প্রকৃতি যেন অপরূপ নীলা ভূমি চরের মাটি ও মানুষকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। হরিরামপুর চরে মাঠে ফসলে দোল খাচ্ছে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, নদী ভাঙন, ঘন কুয়াশা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ফসলের সমাহার গড়ে তুলেছেন চরবাসীরা। চরে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, তাদের অভিযোজন কৌশল দক্ষতা দিয়ে প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়তই তাদের চিন্তা চেতনা বদলাতে হয়। কোন বছরে মাটির অবস্থান, পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের ফসল উৎপাদন করতে হয়। পাটগ্রামচরে বাড়ি কৃষক আহম্মদ আলী বলেন, ‘চরে আমরা বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করি। প্রতিবছর বন্যা হয় মাটিতে পলি পড়ে যে ফসল চাষ করি ভালো ফসল হয়। চরাঞ্চলে আমাদের ফসল উৎপাদনে খরচ কম হয়। কারণ আমরা বাজার থেকে কেনা সার ব্যবহার করি না।’


স্থানীয় জাতের ফসল যেমন মাস কালাই, মসুর কালাই, সরিষা, মটরকালাই, গম পায়রা, আউশ, আমন ধান চাষক করে কৃষকরা নিজেরা বীজ রাখেন। বাজার থেকে কিনতে হয় না। স্থানীয় জাতের বীজ হওয়ার কারণে রোগ বালাই ও পোকামাকড় আক্রমণ কম। ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসে। হরিরামপুর চরাঞ্চরে নটাখোলা, ভগবান চর, পাটগ্রামচর, বালিয়াচক, সেলিমপুর, জয়পুর, হালুয়াঘাটা গ্রামে এসব ফসলের সমাহার দেখা যায়। চরাঞ্চলের কৃষকরা নিজেরা তাদের উৎপাদিত ফসলের বীজ সংরক্ষণ করছেন। অপরদিকে তারা নিজেদের মধ্যে বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় জাত টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে এলাকায় ফসল বৈচিত্র্য ভুমিকা রাখছেন। এলাকার কৃষকরা মনে করেন, তাদের হাতের বীজের গুণগতমান, উৎপাদন, বীজের ধরনসহ সবকিছুর বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। যে কারণে তারা তাদের বীজের উপর ভরসা করতে পারেন। তাছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলা টিকে থাকার যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।
গঙ্গাধরদি গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘চরে আমরা সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের ফসল উৎপাদন করি। তবে আমাদের নায্যমূল্যে পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমনঃ চরাঞ্চলে ক্ষুদ্র পাইকরা আসে তাদের কাছে আমাদের কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়। তাছাড়া ঝিটকা, নয়ার হাট, নতুন, ফরিদপুর নিয়ে বিক্রি করতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের ট্রলার ভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন খরচ বেশি পড়ে যায়।’


চরের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল নায্যমূল্যে বিক্রির জন্য সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন। কৃষকদের আরো দক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে তারা মনে করেন। বিশেষ করে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে, ফসলের উপকারী ও ক্ষতিকর পোকা চেনাসহ বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাদের ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বারসিক কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্যে পাওয়ার জন্য তাদের নানাভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করে আসছে। এভাবে চরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে গড়ে উঠে কয়েকটি কৃষক সংগঠন। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য লেছড়াগঞ্জ চরউন্নয়ন কৃষক, আন্ধার মানিক অগ্রগামি কৃষক সংগঠন, হরিহরদিয়া কৃষক সংগঠন।

এ সকল সংগঠন কৃষকদের অধিকার, ন্যায্যমূল্যে, সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারি কৃষি অফিসের সাথে কৃষকদের নায্য মূল্যে পাওয়ার জন্য যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা, জৈব সারের ব্যবহার, বীজ সংরক্ষণ, উৎপাদন ব্যবস্থা, জৈব বালাইনাশক এর ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে। চরাঞ্চলে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষে কৃষকদের উদ্ধুদ্ধকরণ, বীজ বিনিময়, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরের মাধ্যমে বারসিক ভুমিকা রাখছে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: