সাম্প্রতিক পোস্ট

করোনায় ব্যারাক’বাসীর দিনকাল

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

বিগত ২৫ মে ২০০৯ প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড়ে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর অসংখ্য জনগোষ্ঠী। ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুভিটা বিচ্ছিন্ন প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর তেমনই এক পূনবার্সন কেন্দ্র উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্প। এটি স্থানীয়ভাবে ‘ব্যারাক’ নামে পরিচিত। আইলার পর ব্যারাকে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০টি জেলে, ২০টি আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায়, ২০টি প্রান্তিক হিন্দু ও ৩০টি কাহার-মুসলিম পরিবারকে পূনবার্সন করা হয়। বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্প ব্যারাক-এ অবস্থানরত এ সকল পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এবং খাদ্য চাহিদা নিরসনে পুষ্টিমান বজায় রাখতে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে এলাকা উপযোগী সবজি উৎপাদন বীজ সংরক্ষণ ও স্থায়িত্বশীল কৃষির জন্য বেসরকারী গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক কাজ শুরু করার প্রাক্কালে এখানের পরিবেশ ছিল সম্পুর্ন মরুভুমির মত। কেননা তৎসময়ে এখানে কোন সবজী না সবুজ বৃক্ষ ছিল না। পর্যায়ক্রমে তারা কৃষি কাজ শুরু করে মৌসুমভিত্তিক নানা জাতের সবজি উৎপাদন ও কৃষিকাজ অব্যাহত রেখেছেন।

বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্পের পেশাজীবী মানুষেরা নিজেদের পরিশ্রমে ব্যারাককে সবুজ প্রান্তরে পরিণত করেছেন। ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষত শুকিয়ে না যেতেই আবারো আঘাত হাতে ঘুর্ণিঝড় আম্পান। এরই মাঝে চলছে করোনার চরম প্রার্দুভাব। সব মিলিয়ে মানুষের জীবন জীবিকা একবারে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এখানে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষেরা নানা ধরনের ভোগান্তি ও কষ্টের মধ্যে জীবন পার করছেন। বুলবুল ও আম্পানের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারলেও করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক পরিবারে আয়ের চাকা থেমে গিয়েছিল। লকডাউনে ঘর থেকে বের হতে পারেনি, তেমন কোন কাজকর্ম করতে পারেনি। যে কারণে আয়টা সীমিত হয়ে পড়েছিল। এবিষয়ে ব্যরাকের জগদ্বীশ মুন্ডা বলেন, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। লকডাউনে ঘর থেকে বের হতে পারেনি, ২/৩ মাস অনেক কষ্টে দিন পার করেছি। তবে এখন আবার কাজ শুরু করেছি।’

নানা সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলা করে ঘুরে দাড়াতে অভ্যস্ত এসকল নিম্ন আয়ের মানুষেরা। দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের মত করে চারপাশের পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদন আব্যহত রেখেছেন। গড়ে উঠেছে কৌশল্যা, আশালতা মুন্ডার মত পারিবারিক বীজ ব্যাংক কিংবা বিনোদিনী মুন্ডার মত পুষ্টি ব্যাংক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দেখা মেলে সকল পরিবারে। ঘুর্ণিঝড় আম্পানে গাছপালা ঘরবাড়ি কিংবা ফসলাদি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেগুলো নিজেদের প্রচেষ্টায় সংস্কার ও পুর্নগঠন করেছেন। করোনাকালীন সময়ে নিজেদের মধ্যে ৮০টি পরিবারে ক্ষারযুক্ত সাবান ও মাস্ক বিতরণ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে চাল ডাল ও মসলাদি সহযোগিতা পেয়েছে। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আবেদন ও যোগাযোগের ভিত্তিতে একটি অত্যাধুনিক মানের কমিউনিটি টয়লেট সহযোগিতা পেয়েছে। বর্ষাকালীন বৈচিত্র্যময় কৃষি ফসলে সবুজায়ন হয়েছে পুরো ব্যারাকটি। ইতিমধ্যে বারসিক থেকে সহযোগিতা নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যারাকটি নেট দিয়ে ঘেরা দিয়েছে, একটি সুপেয় পানির পুকুর পুনখনন ও ২টি পিএসএফ সংষ্কার করেছে।

বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্পে ফলজ বৃক্ষ হিসেবে কুল, তেঁতুল, আমলকি, গবেদা, ডালিম, কাঁঠাল, পেঁপে বনজ বৃক্ষ হিসেবে নিম, খদি, বাবলা, আকাশমনি, মেহগনি, সাই বাবলা, সেজি, ঔষধি হিসেবে হেন্না, থানকুনি, হেলাঞ্চ, কলমি, খুদকুড়ি, গাদমনি, গিমেশাক, নোনা গড়গড়ে প্রভৃতি দেখা মেলে। নিজেদের বসবাসের যায়গাটুকু বাদেই সম্পূর্ণ বসতভিটার সর্বত্তম ব্যবহার তারা করেছে। বছরব্যাপী মৌসুম ভিত্তিক কুশি, ঝিঙ্গা, তরুল, সীম, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, ঢেড়ষ, কামরাঙা ঢেড়ষ, বেগুন, ঝাল, পুঁইশাক , ডেমোশাক, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, তরমুজ, ওল, হলুদ, কচুরমূখী, উচ্ছে, লাউ, কলমীশাক,মূলা, ওলকপি, বাঁধাকপি, বীটকপি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি চাষাবাদ করেন। কৃষির পাশাপাশি প্রতিটি বাড়ীতে হাঁস-মুরগি ছাগল ভেড়া ও শুকর পালন করেন। এছাড়া ও তাদের অনেক পরিবারে রয়েছে নৌকা ও মাছ ধরার জ্বাল। প্রয়োজনেই ঝাপিয়ে পড়েন নদীতে। সুন্দরবন সংলগ্ন চুনা নদী থেকে নানা প্রজাতির চিংড়ি, আমাদি, বেলে, পারশে, টেংরা, লুচো, কটকটি, ফেসা প্রভৃতি মাছ ধরে পারিবারিক আমিষের চাহিদা পূরণ করছেন অনেক পরিবার।

আশ্রয়ন কেন্দ্রের সভাপতি রুহিতদাস সরদার বলেন, ‘পরপর নানা ধরনের দুর্যোগ আমাদের ক্ষতি করে দিয়ে যায়, আমরা আবার সবাই মিলে ঘুরে দাঁড়াই। বুলবুল ও আম্পান পরবর্তী সময়ে ব্যারাকের অভ্যন্তরে বারসিক’র সহযোগিতায় ৩৩৭টি গাছের চারা রোপণ করেছি। আমরা সব ধরনের বর্ষাকালীন ফসল লাগিয়েছি।’প্রাকৃতিক দুর্যোগ-বন্যা, জলোচ্ছাস, ঘুর্ণিঝড়, নদী ভাঙন এ উপজেলার মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী। এগুলো মোকাবেলা করেই জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে হয় সকলের। তবে শত প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্পের নি¤œ আয়ের মানুষেরা টিকে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তবে সময়ের সবচেয়ে বড় ধরনের দুর্যোগ মহমারি করোনার মধ্যে ভালো থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে ব্যারাকবাসী।

happy wheels 2
%d bloggers like this: