Posted in

দেশি আম গাছ লাগাই দেশি আম খাই

মানিকগঞ্জ থেকে বিমল চন্দ্র রায়
‘ও মা , ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে’ জাতীয় সংগীতের এই চরণের মধ্য দিয়ে গ্রাম বাংলার প্রতিটি পরতে পরতে ফাগুনের প্রথম দিকের আমের ফুলের সমারোহ ও সৌন্দয্য নিয়ে বিশ্ব কবি আমের ব্যাপকতা ও অস্তিত্বকে তুলে ধরেছেন। ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ’ পল্লি কবির মামার বাড়ি কবিতা বা ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’ ছড়া প্রায় সকলের মুখস্থ। আমতলী, আমঝুপি নামে এলাকার নাম আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ ও স্যালুট অনুষ্ঠান মেহেরপুরের মুজিব নগরের বৈদ্যনাথদের আম বাগানে অনুষ্ঠিত হয়। এখন বৈদ্যনাথ আম বাগানকে বঙ্গবন্ধু আম্রকানন বলা হয়। আমের গুণাগুণ বা আমের স্বাদ গন্ধ নিয়ে কথা হচ্ছে আমের দেশি বৈচিত্র্য নিয়ে।


মানিকগঞ্জ জেলা গ্রামের আনাচে কানাচে এখন আমের মুকুল দেখা যাচ্ছে। আমের এই জাতগুলো দেশি জাতের নাম ছাড়া আম, তবে স্বাদ বা রঙ অনুসারে এই আমের নাম আছে যেমন, রঙ অনুসারে সিন্দুরা, রস অনুসারে রসালো বা কাাঁচ মিষ্টি জাতের বা দুধ ভিজানো বা দুধ ফেটে যাবে জাতের বা টুনি ইত্যাদি স্থানীয় আতন জাতের গাছে এই মুকুল দেখা যাচ্ছে। বরুন্ডি গ্রামের কবিয়াল বৈদ্যনাথ সরকার ও তার স্ত্রী পদ্মাবতী সরকার বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে টুনি/ টুইনা জাতের আম গাছ আছে, ছোট ছোট আম তবে খুবই মিষ্টি জাতের এই আম গাছ আতন জ্বালা। আমরা আগের দিনে আমের চারা কিনে এনে কোন গাছ লাগাই নাই। আম খাওয়ার পর আটি রেখে রান্না ঘরের পিছনে ফেলে দিতাম সেই আটি হতে গাছ হতো সেই গাছ অনেক সময় লাগানো হতো তাছাড়া এমনি এমনি অনেক গাছ খালি জায়গায় গজিয়ে উঠতো, তা না উঠিয়ে ফেলে রেখে দিতাম সেই গাছ বড় হতে অনেকদিন লাগতো। তাই কোন আম গাছের কি নাম তা আমরা বলতে পারি না তবে স্বাদ, বর্ণ , সাইজ, আঁশ বা রসের প্রকার ভেদে নাম দিতাম। এখন বাজার থেকে আ¤্রপালি, রুপালি, ফজলী, হাঁড়িভাংগা, আশ্বিনী নানান জাতের আম কিনে আনা হয় তবে স্বাদ প্রায় সকল আমের কাছাকাছি।’


একই ধরনের কথা বলেন বরুন্ডি গ্রামের কৃষক আলোকি বেগম ও মানিকগঞ্জ শহরের সমাজ কর্মী ইকবাল খান। ইকবাল খান বলেন, ‘আমাদের বাড়ি যাদের নিকট কিনেছি তাদের আমলের অনেক আম গাছ আছে, সেই আম গাছে মাঝে মাঝে আম ধরে। তবে নানান সমস্যার কারণে এই আমগুলোতে পোকা দেখা যায়। তাই বাজার থেকে বেশির ভাগ সময়ে আম কিনে খাই। আগের দিনে পাড়ার সমবয়সী কয়েকজন মিলে কাঁচা আম খাওয়ার আমেজ ছিল। কাসন্দি দিয়ে কাঁচা আম কুচি কুচি করে কেটে খাওয়া হতো। গ্রামের প্রবীণ মা মাসিরা ঝড়ে পড়া কাঁচা আম কেটে রৌদে শুকিয়ে রাখতো। তাকে অনেকে ফলসি বলে।’

গ্রামাঞ্চলে কাঁচা আম দিয়ে আমে আচার তৈরি করা হতো, পাকা আম দিয়ে আমসত্ত্ব তৈরি করা হয়। আমের টক খাওয়ার রেওয়াজ ছিল, আম দিয়ে দুধ ভাত ও মুড়ি খাওয়ার চল ছিল, আত্মীয়স্বজনদের আম কাঠাঁল খাওয়ার নিমন্ত্রণ করা হতো। নিজেরাও আম কাঠাঁল খেতে বাড়ির গাছের আম নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া হতো। এই সব অনেক কিছু এখন অনেকটা অতীত। চারিদিকে অধিক ফলনশীল উন্নত জাতের আমের চারা লাগানোর বিজ্ঞাপন চলছে। বাজারে বাজারে হাটে উন্নত জাতে মিষ্টি একই ধরনের স্বাদের আম পাওয়া যাচ্ছে। এই আমসমূহ আবার মুকুল হতে শুরুর হয় বিষ প্রয়োগের বিষমুক্ত আমের প্রতারণা।

আমকে ফলের রাজা বলা হয়। এই ফলটি কমবেশি সবাই পছন্দ করেন। আমের আদিনিবাস ভারতীয় উপমহাদেশে। ভারতীয় উপমহাদেশে বেশির ভাগ আম উৎপাদিত হয়, তার বাইরে গ্রীস্মমন্ডলীয় দেশসমূহে আমের চাষাবাদ হয়। আমের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা’, সংস্কৃতে আ¤্র, বাংলায় আম, ইরেজিতে ম্যাংগো, মালয় ও জাভা ভাষায় ম্যাঙ্গা, তামিল ভাষায় ম্যাংকে এবং চীনা ভাষায় ম্যাংকাও। আম অর্থ সাধারণ। তাই বলা চলে আম একটি সাধারণ ফল। আমকে মধু ফলও বলা হয়। আম অত্যন্ত সুস্বাদু বিধায় স্থান ও রাজা বাদশার নাম অনুসারে বিভিন্ন জাতের আমের নাম। রানীপসন্দ, সফদরপসন্দ, লক্ষণ ভোগ, গোলাপখাস, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, চৌসা ইত্যাদি। কালের বিবর্তণে চাহিদার ভিত্তিতে শংকরায়নের মাধ্যমে আ¤্রপালি, মল্লিকা, রত্না, রূপালী, হাঁিড়িভাংগা ইত্যাদি জাতের আমের ব্যাপক প্রচলন হয়েছে। উইকিপিডিয়াতে ৩৪৯টি জাতের নাম উল্লেখ আছে। ভারতের জাতীয় ফল আম, বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষের নাম আম বৃক্ষ। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা আমের জন্য বিখ্যাত। তাছাড়া বিভিন্ন জেলায় আমের চাষের প্রচলন শুরু হয়েছে। আমের আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ যা হজমে সহায়তা করে। ক্যান্সারসহ নানান রোগ প্রতিরোধে আম অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখে। হিন্দুধর্মাবলীরা তাদের পুজায় আমের পাঁচ পাতার ব্যবহার আছে। তাছাড়া কাসুন্দি তৈরিতে কাঁচা আম সরিষার সাথে রৌদে দিয়ে শুকিয়ে হাঁড়িতে বেঁধে রাখেন।

আমের বৈচিত্র্যতাকে রক্ষা করতে হলে দেশি আমের চাষের বিকল্প নেই। আমের চারার প্রচারণায় বারবার বলা হচ্ছে এই জাতে আম অধিক ফলন দিবে, অধিক মিষ্টি, অধিক সুস্বাদু, এক/দুই বছর থেকে ফলন পাওয়া যায়, অধিক মুনাফা হবে চাষ করলে ইত্যাদি ইত্যাদি কথাবার্তা। শুধু কথা বার্তা নয়; পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং ও উদ্যোগও চোখে পড়ে। এই সকল উদ্যোগ ও ট্রেনিং সবই একমুখী উন্নয়ন চিন্তাপ্রসুত। স্বাদ ও উৎপাদন বিবেচনায় অনেক দেশীজাত ইতিমধ্যে বিলুপ্তির দিকে। আমের আটি থেকে গাছ না হলে শুধু কলমনির্ভর জাত দিয়ে কিভাবে বৈচিত্র্যতা রক্ষা হবে? সবাইকে ভাবতে হবে আগামী মৌসুমে আম পাকবে আমরা আম খাবো সেই আমের আটি রেখে দিবো পরবর্তী গাছের জন্য তা রোপণ করবো নিজের বাড়িতে বা জমি বা বিভিন্ন স্থানে। যদিও অনেক আটি থেকে গাছ অংকুরোদঙ্গম হবে না। কারণ এই সকল আমের আটি পরিপূষ্ট নয়। এই আমসমূহ ফরমালিন বা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায পাকানো ও হলুদ রঙ করা হয়। তা হলে বুঝার বিষয়, আমরা যে আম খাচ্ছি তা কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। তাই আসুন নিরাপদ আম খাই, , নিরাপদ থাকি, জাতবৈচিত্র্যতা রক্ষা করি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.